অবশ্যই নড়বে! লিসা আক্রমণকারীর পেটে কনুই চালিয়ে দিল।
উফ শব্দ করে মালিক তার বাহু সরিয়ে নিল। কারুকার্য খচিত পর্দার ওপর গিয়ে পড়ল সে। ওজন সইতে না পেরে পর্দা খসে পড়ল। পাছার ওপর ভর করে আছড়ে পড়ল সে।
ঘুরে দাঁড়িয়েছে লিসা, দৌড় দেয়ার জন্য একদম তৈরি।
লোকটার পরনে জাঙ্গিয়া ছাড়া কিছুই নেই। তার চামড়ার রং তামাটে তবে এখানে সেখানে পুরোনো কাটা-ছেঁড়ার দাগ আছে। কালো লম্বা চুলগুলো এলোমেলো, চেহারার প্রায় অর্ধেক ঢেকে দিয়েছে। আকার আকৃতিতে লোকটা বেশ পেশিবহুল, চওড়া কাঁধের অধিকারী। তাকে দেখতে তিব্বতিয়ান সন্ন্যাসী নয়, আমেরিকান মনে হচ্ছে।
কিংবা পরনে থাকা জাঙ্গিয়ার জন্যও এরকম মনে হতে পারে।
গুঙিয়ে লিসার দিকে তাকাল সে। তার নীল চোখ দুটোতে বাতির আলো প্রতিফলিত হলো।
‘কে তুমি?’ প্রশ্ন করল লিসা।
‘পেইন্টার,’ গোঙানির সাথে জবাব দিল সে। ‘পেইন্টার ক্রো।’
০২. ডারউইন’স বাইবেল
০২.
ডারউইন’স বাইবেল
১৬ মে, সকাল ৬ টা ৫ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।
বইয়ের দোকানের সাথে বিড়ালের কীসের সম্পর্ক?
হোটেল ন্যাভন থেকে বের হওয়ার পর আরও একটি চুষে খাওয়ার ক্লেরিটিন ট্যাবলেটকে কচকচ করে গুড়ো করে ফেলল কমান্ডার গ্রেসন পিয়ার্স। গতকাল কোপেনহ্যাগেনের বইপড়য়া কমিউনিটিতে গবেষণা করার পর আজ শহরের আধ ডজন বই সংক্রান্ত স্থানে ঢু মারতে হয়েছে তাকে। প্রতিটি বইয়ের দোকানে বিড়াল নিজেদের থাকার ব্যবস্থা করে নিয়েছে। কাউন্টারগুলোতে ঘুরোঘুরি, বুকশেলফে রাখা বইয়ের ওপরে জমে থাকা ধূলোর ওপর দিয়েও তাদের অবাধ যাতায়াত।
বিড়ালগুলোর জন্য এখন ওকে ভুগতে হচ্ছে। একটা হাঁচি দিল ও। তবে এই হাঁচি ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করার কারণেও হতে পারে। কোপেনহ্যাগেনের বসন্ত কাল নিউ ইংল্যান্ডের শীতকাল একই কথা। পিয়ার্স যথেষ্ট গরম কাপড় সাথে আনেনি।
হোটেলের পাশে থাকা এক বুটিকের দোকান থেকে কেনা একটি সোয়েটার পরে আছে ও। গলা কাটা দাম রেখেছে দোকানে। সোয়েটারের উঁচু কলারটা ভেড়ার পশমে মোড়ানো। কোনো রং করা নেই। পশমগুলো চুলকালেও ভোরের ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা করছে বেশ ভালভাবেই। অবশ্য ভোর হয়েছে আরও ঘণ্টাখানেক আগে। কালচে-ধূসর আকাশে সূর্যের যেরকম নোনা তেজ দেখা যাচ্ছে তাতে আজ তাপমাত্রা বাড়ার কোনো আশা নেই। কলারের ওখানটায় একটু চুলকে নিল পিয়ার্স। সেন্ট্রাল রেল স্টেশনের দিকে এগোচ্ছে ও।
শহরের একটি খালের পাশে ছিল ওর হোটেল। সুন্দর করে রং করা এক সারি ঘর ছিল ওটা। পানির দু’ধারে বিভিন্ন ধরনের দোকান, ছাত্রাবাস ও ব্যক্তিগত বাড়ি ছিল। এরকম দৃশ্য দেখে আমসটার্ডামের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল ওর। দুই পাড়ে নোঙর করা ছিল হরেক রকম জলযান। কম আকর্ষণীয় নিচু ছাদের পাল তোলা নৌকা থেকে শুরু করে চমৎকার প্রমোদতরী, কাঠের তৈরি স্কুনার, ঝলমলে ইয়ট; সবই ছিল ওখানে। মাথা নেড়ে একটি ইয়টের পাশ দিয়ে চলে এলো গ্রে। ওটাকে দেখতে ভাসমান ওয়েডিং কেকের মতো লাগছিল। এত সকালেও ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে কিছু দর্শনার্থী এখানে হাজির হয়ে গেছে। এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে কিংবা ব্রিজের রেইলের ওখানে গিয়ে ছবি তুলছে মনের সুখে।
পাথরের খাম পেরিয়ে খালের তীর ধরে হাফ ব্লক পর্যন্ত এগোল গ্রে। ইটের পাচিলের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে পানির দিকে তাকাল ও। স্থির পানিতে ওর প্রতিবিম্ব আছে, একটু বাঁকা অংশ দু’ভাগে আলাদা করেছে থুতনিকে। চেহারার মসৃণতা ও তীক্ষ্ণ ধাকগুলো বলে দিচ্ছে ও যুক্তরাজ্যে ওয়েলস প্রদেশের অধিবাসী। বাবার মতোই হয়েছে গ্রে। একটা ব্যাপার গ্রেসনের মাথায় প্রায়ই ঘুরপাক খায়, রাতে ঘুম হয় না ওর।
বাবার কাছ থেকে আর কী কী পেয়েছে ও?
এক জোড়া ব্ল্যাক সোয়ান ওর পাশ দিয়ে আঁতরে গেল। পানিতে আলোড়ন তৈরি না হওয়ায় প্রতিবিম্ব আর ঠিক থাকল না। হাঁস দুটো ব্রিজের দিকে এগোচ্ছে। গলা নড়িয়ে নির্লিপ্তভঙ্গিতে সাঁতরাচ্ছে ওরা।
গ্রে ওদের দেখে শিখল। সোজা হয়ে নোঙর করে রাখা নৌকাগুলোর ছবি তোলার ভান করল ও। তবে ওর মূল উদ্দেশ্য হলো এইমাত্র পেরিয়ে আসা ব্রিজ পর্যবেক্ষণ করা। কোনো একাকী ব্যক্তি, পরিচিত মুখ কিংবা সন্দেহজনক কাউকে দেখা যায় কি না দেখল ও। খালের পাশে অবস্থান নেয়ার একটা সুবিধা আছে। কেউ পিছু নিয়েছে কি-না সেটা ব্রিজ থেকে সহজেই খেয়াল করা যায়। কারণ, ক্রস করে রাখা পাথরের খামের পর পিছু নেয়া ব্যক্তিকে নিজের অস্তিতের জানান দিতেই হবে। কোনো উপায় নেই। এক মিনিট ধরে পর্যবেক্ষণ করার পর সন্তুষ্ট হলো গ্রে। যাদেরকে দেখল তাদের সবার চেহারা আর হাঁটার ভঙ্গি মাথায় গেঁথে নিল। এগোল নিজের পথে।
এরকম ছোটো অ্যাসাইনমেন্টে এত সতর্কতার তেমন কোনো প্রয়োজন নেই কিন্তু ওর গলায় দায়িত্বের বোঝা আছে। জিনিসটি হলো একটি চেইন। রূপোর ছোট একটি ড্রাগন ঝুলছে ওতে। আড়ালে থাকা এক খেলোয়ারের কাছ থেকে উপহার পেয়েছে এটা। মনে রাখার জন্য গলায় পরে ও। সতর্ক থাকার জন্য কাজে দেবে।
সামনে এগিয়েছে এমন সময় পকেটে পরিচিত কম্পন অনুভব করল গ্রেসন পিয়ার্স। সেল ফোন বের করল ও। এত সকাল সকাল কে ফোন করল ওকে?
