এক মিনিট ধরে উঠোন পরীক্ষা করল সৈনিক। সন্তুষ্ট হয়ে ওদের ইশারা করল। এগিয়ে গেল লিসা ও আং গেলু।
উঠোনে পা দিয়েই ওখানকার অন্ধকারাচ্ছন্ন কোণাগুলোর দিকে তাকাল লিসা। আশা করছিল, কাউকে হয়তো নড়াচড়া করতে দেখবে। কিন্তু সব চুপচাপ, সুনসান। কিন্তু বেশিক্ষণের জন্য নয়…
ও আরেকটু সামনে এগোতেই দ্বিতীয় বিস্ফোরণ ঘটল। ভবন বিস্ফোরিত হলো এবার। তার ধাক্কা পৌঁছে গেল উঠোন পর্যন্ত। বিস্ফোরণের ধাক্কায় হাত-পা ছড়িয়ে ছিটকে পড়ল লিসা। কাঁধের ওপর ভর করে গড়িয়ে পড়ল, ওর দৃষ্টি পেছন দিকে।
আগুনের লেলিহান শিখাকে সাথে নিয়ে আকাশের দিকে যাত্রা করেছে লাল টাইলগুলো। জানালাগুলোকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে বেরিয়ে এল বিস্ফোরণের আগুন। দরজাগুলো টুকরো-টুকরো হয়ে গেল। আরও ধোয়া ও আগুনের জন্ম হলো। এক পশলা গরম বাতাস বয়ে গেল লিসার ওপর দিয়ে।
কয়েক পা সামনে এগিয়ে থাকা সৈনিকটির পেছনে এসে ধাক্কা দিয়েছিল শকওয়েভ। অস্ত্রের সাথে তার আঙুলগুলো জড়িয়ে ছিল আষ্টেপৃষ্ঠে। হামাগুড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে আকাশ থেকে ফিরতি পথ ধরে নেমে আসা টাইলগুলোর কবলে পড়ল সে।
ধাক্কা কাটিয়ে আং গেলু উঠে দাঁড়িয়ে লিসার দিকে এক হাত বাড়িয়ে দিলেন।
এটাই ছিল তার শেষ কাজ।
আগুনের গর্জন ও টাইল ভাঙ্গার আওয়াজকে ছাপিয়ে আরেকটা আওয়াজ শোনা গেল। একটা গুলির আওয়াজ। সন্ন্যাসীর চেহারার ওপরের অংশ রক্তে ভেসে গেল।
কিন্তু এবার ওই সৈনিকটি গুলি করেনি।
সৈনিকের কাধ থেকে স্ট্রীপের সাহায্যে অস্ত্রটি ঝুলে আছে। টাইলগুলোর কবল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল সৈনিক। গুলির আওয়াজ হয়তো ওর কানে যায়নি, কিন্তু আং গেলুকে লুটিয়ে পড়তে দেখে ওর চোখ বড়বড় হয়ে গেল। খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাল সে। ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে পার্শ্ববর্তী ভবনের ছায়ায় আশ্রয় নিল। লিসার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল ও, আতঙ্কিত হওয়ায় ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারল না।
মন্দিরের দরজার দিকে হামাগুড়ি দিয়ে পিছিয়ে গেল লিসা। পাথুরে উঠোনে আরেকটা গুলির আওয়াজ হলো। লিসার পায়ের আঙুলের কাছে এসে মুখ থুবড়ে পড়ল বুলেট। নিজেকে রীতিমতো উড়িয়ে নিয়ে গেল লিসা। দরজা পেরিয়ে অন্ধকারে প্রবেশ করল।
কোণায় দাঁড়িয়ে ও খেয়াল করল, সৈনিকটি দেয়াল ঘেঁষে এগোচ্ছে। এখানেই কোথাও স্নাইপার দিয়ে গুলি চালাচ্ছে কেউ। তাই স্নাইপারের দৃষ্টি বাঁচাতে সতর্কতা অবলম্বন করছে সে।
লিসা জানে না কীভাবে শ্বাস নিচ্ছে ও। ওর চোখ দুটো বড় হয়ে গেছে। ছাদের প্রান্ত আর জানালাগুলোয় সন্ধানী দৃষ্টি বুলাল ও। আং গেলু’কে গুলি করল কে?
তারপর একজনকে দেখতে পেল লিসা।
অন্য ভবনের ধোয়ার চাদর থেকে একটা ছায়া বেরিয়ে এলো। লোকটা দৌড় দেয়ায় আগুনের ঝলসানিতে তার হাতে থাকা ধাতব কিছু একটা ঝকমক করে উঠল। অস্ত্র। স্নাইপার তাহলে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে নতুন জায়গায় যাচ্ছে।
পিছু হটল লিসা। প্রার্থনা করল ছায়া যেন ওকে পুরোপুরি লুকিয়ে রাখে। ইশারা করে সৈনিককে ডাকল ও। দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে, আস্তে আস্তে লিসার দিকে এগিয়ে আসছে, মন্দিরের দিকে। তার দৃষ্টি ও অস্ত্র দুটোই ছাদের দিকে তাক করা। স্নাইপারের দৌড় ওর চোখে পড়েনি।
চিৎকার করল লিসা। গেট আউট! সৈনিকটি হয়তো ওর ভাষা বুঝতে পারবে না কিন্তু কী বোঝাতে চাচ্ছে সেটা তো বুঝতে পারবে। সৈনিকের চোখে চোখ পড়ল ওর। নিজের লুকোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেই ইশারা করল লিসা। স্নাইপার কোন পথ দিয়ে গেছে সেটার একটা রাস্তা ইশারায় বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ওই লোক গেল কোথায়? এতক্ষণে কী নিজের পজিশন নিয়ে নিয়েছে?
‘দৌড়াও!’ চিৎকার করল লিসা।
লিসার দিকে এক পা এগোল সৈনিক। তার কাঁধের পেছনে ঝলসে উঠল কী যেন। ভুল প্রমাণিত হলো লিসার ধারণা। পাশের ভবনের একটা জানালার পেছনে আগুন নৃত্য শুরু করে দিয়েছে। আরেকটা বোম।
হায় ঈশ্বর…
সৈনিকটি এগোনোর মাঝপথে বিস্ফোরিত হলো ওটা। তার পেছনে থাকা দরজা হাজার টুকরো হয়ে ছিটকে গেল, সৈনিকটিকেও ছাড়ল না। তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলল উঠোনের ওপর। মুখের ওপর ভর করে আছড়ে গড়াতে শুরু করল সে।
গড়ানো থেমে গেলেও সৈনিকটি আর নড়ল না। ওর পোশাকে আগুন ধরে যাওয়ার পর নিথর হয়ে পড়ে রইল সে।
মূল মন্দিরের আরও ভেতরে চলে গেল লিসা, দরজা খুঁজছে। পেছনের পথের দিকে গিয়ে সরু হলে পা রাখল ও। ওর কোনো পরিকল্পনা নেই। সত্যি বলতে, কী করছে কী ভাবছে সেটার উপরে ওর নিজেরই কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
তবে ও একটা ব্যাপারে নিশ্চিত। আং গেলু আর ওদের সৈনিককে যে খুন করেছে সে কোনো পাগল সন্ন্যাসী নয়। প্রতিটা বিস্ফোরণ খুব হিসেব করে ঘটানো হয়েছে, পুরো ব্যাপারটা দক্ষ হাতের কাজ।
লিসা এখন একা।
সরু হলওয়ে দেখল ও। রেলু নাআ’র রক্তাক্ত লাশ চোখে পড়ল ওর। ওটা ছাড়া হলওয়ের বাকিটুকু একদম পরিষ্কার। মৃত সন্ন্যাসীর কাস্তেটা যদি ও নিতে পারতো,.. তাহলে অন্তত একটা অস্ত্র হতো হাতে…
হলের দিকে পা বাড়াল লিসা।
এক পা ফেলে দ্বিতীয় পা ফেলতে যাবে এমন সময় পেছন থেকে বাধাগ্রস্ত হলো ও। একটা নগ্ন বাহু ওর গলা প্যাচিয়ে ধরল। কর্কশ কণ্ঠে ওর কানের কাছে ঘেউ করে উঠল সে। ‘নড়বে না।’
