.
সকাল ৯ টা ৫৫ মিনিট।
আতঙ্ক নিয়ে জেগে উঠল সে।
বজ্রপাতের শব্দ তাকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। না বজ্রপাত নয়। বিস্ফোরণ। নিচু সিলিং থেকে পাস্টারের ধূলি নেমে এলো। উঠে বসল সে। কোথায় আছে সে, বুঝতে পারছে না। ওর সামনে থাকা রুম যেন একটু চক্কর মেরে উঠল। শরীর থেকে পশমি কম্বল ফেলে দিল ও। অদ্ভুত ধরনের খাটে রয়েছে সে, পরনে শুধু লিনেনের একটা ব্রিচক্লাউট। এক হাত উঁচু করল ও। হাত কাঁপছে। গরম পেস্টের মতো স্বাদ পেল মুখের ভেতর। পুরো রুম প্রায় অন্ধকারই বলা চলে, চোখ জ্বালা করলো ওর। আকস্মিক কাঁপুনিতে কেঁপে উঠল শরীর।
এখন কোথায় আছে, আগে কোথায় ছিল সে-সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই তার।
বিছানা থেকে পা নামিয়ে ওঠার চেষ্টা করল সে। উচিত হয়নি। ওর পৃথিবী আবার অন্ধকার হয়ে গেল। ধপ করে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারাতে যাচ্ছিল কিন্তু গুলির আওয়াজ সেটা হতে দিল না। অটোমেটিক ফায়ার। কাছেই হয়েছে। গুলির শব্দ মিলিয়ে গেল।
আবার চেষ্টা করল ও। আগের চেয়ে জোরদারভাবে। কিন্তু ওর স্মৃতিশক্তি এমনভাবে ধরা দিল যেন ও একটা দরজার দিকে এগোচ্ছে। আঘাত করছে দরজায়, হাত দিয়ে টানছে, নব ধরে ঘোরানোর চেষ্টা করছে কিন্তু…
সেটা তালাবন্ধ।
.
সকাল ৯ টা ৫৭ মিনিট।
‘হেলিকপ্টার,’ বললেন আং গেলু। ‘ধ্বংস হয়ে গেছে ওটা।’
উঁচু জানালার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে লিসা। কিছুক্ষণ আগে বিস্ফোরণ হয়েছে। প্রাথমিক ধাক্কা কেটে যাওয়ার পরই জানালা খুলে বাইরে তাকিয়েছে ওরা। সৈনিকটা বলছে, সে হয়তো নিচে উঠোনের ওদিকে কাউকে নড়াচড়া করতে দেখেছিল।
এখান থেকে গুলি ছোঁড়া হলেও জবাবে ওদিক থেকে কোনো গুলি ছোঁড়া হয়নি।
‘কাজটা কী পাইলট করেছে?’ প্রশ্ন করল লিসা। হয়তো ইঞ্জিনে কোনো সমস্যা দেখা দিয়েছিল, ভয়ে কাজটা করেছে সে।
সৈনিকটি এখনও জানালার কাছে নিজের পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একচোখ স্কোপে রেখে নজর রাখছে।
আলু ক্ষেতের ওদিক থেকে উঠে আস: ধোয়ার দিকে নির্দেশ করলেন আং গেলু। হেলিকপ্টার ওখানেই পার্ক করা ছিল। ‘ওটা কোনো যান্ত্রিক দুর্ঘটনা ছিল, আমি বিশ্বাস করি না।’
‘তাহলে আমরা এখন কী করব?’ লিসা জানতে চাইল। আরেকজন পাগল সন্ন্যাসী হেলিকপ্টার উড়িয়ে দিয়েছে নাকি? যদি দিয়ে থাকে তাহলে এই মঠে এরকম কতজন ম্যানিয়াক ঘুরে বেড়াচ্ছে? কাস্তে হাতে থাকা সন্ন্যাসী ও নিজের গলায় ছোরা ঢুকিয়ে দেয়া সন্ন্যাসীর কথা মনে করল ও। হচ্ছেটা কী এখানে?
‘আমাদের যেতে হবে?’ বললেন আং গেলু।
‘কোথায়?
‘এখান থেকে হাঁটা পথে একদিন লাগবে, ছোট্ট একটা গ্রাম আছে। এখানে যা-ই হয়ে থাকুক না কেন সেটা আমাদের তিনজন ছাড়াও আরও লোকজনের জানা দরকার।’
‘এখানে থাকা বাকিরা কোথায়? সবাই আপনার আত্মীয়ের মতো অতটা অসুস্থ নাও হয়ে থাকতে পারে। আমাদের তো তাদেরকে সাহায্য করা উচিত, তাই না?
‘ডা, কামিংস, আমার প্রথম কাজ হলো আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তারপর এই ঘটনাকে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে জানানো।
‘কিন্তু যদি এখানে সংক্রামক জীবাণু থেকে থাকে? ভ্রমণের ফলে আমরা তো তাহলে ওগুলোকে ছড়িয়ে দেব।
জখম হওয়া গালে আঙুল বুলালেন সন্ন্যাসী! ‘হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়ে গেছে, যার মানে দাঁড়াচ্ছে আমাদের যোগাযোগ মাধ্যম নেই। যদি এখানে থেকে যাই তাহলে আমরাও মারা যাব। বাইরের দুনিয়া এই ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানতে পারবে না।’
আং গেলু উচিত কথা বলেছেন।
‘যতক্ষণ না আরও বিস্তারিত না জানতে পারছি ততক্ষণ বাইরের মানুষদের কাছে আমরা আমাদের উপস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।’ বললেন তিনি। সাহায্য চাইব ঠিকই কিন্তু সেটা করব নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে।
‘কোনো শারীরিক সংযোগ নয়’ বিড়বিড় করল লিসা।
মাথা নাড়লেন সন্ন্যাসী। ‘আমরা যে তথ্য বহন করছি, সেটার জন্য এতটুকু ॥ নেয়া যেতেই পারে।’
লিসা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। নীল আকাশের দিকে যাত্রা করা কালো ধোঁয়ার দিকে তাকাল ও। এখানে যে কতজন আক্রান্ত হয়েছে সেটা এখনও অজানা। ওরা নিশ্চয়ই বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেয়েছে। যদি ওদের তিনজনকে পালাতেই হয় তাহলে খুব দ্রুত পালানো উচিত।
‘চলুন।’ বলল লিসা।
তীক্ষভাবে সৈনিককে কিছু বললেন আং গেলু। মাথা নেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। জানালার কাছ থেকে পজিশন বদলে নিজের অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হলো।
রুম ও সন্ন্যাসীর দিকে শেষবারের মতো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দৃষ্টিতে তাকাল লিসা। ধরে নিল, সম্ভাব্য সংক্রামক জীবাণু আছে। ওরা কী ইতোমধ্যে ওতে আক্রান্ত হয়ে গেছে। নিজেকে বিচার বিশ্লেষণ করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে মই বেয়ে নামল লিসা। ওর মুখ শুকিয়ে গেল, শক্ত হয়ে গেল চোয়ালের মাংস, হৃদপিণ্ড যেন উঠে এল গলার কাছে। কিন্তু এগুলো তো হচ্ছে ভয়ের কারণে, তাই না? উড়ে এসে এরকম পরিস্থিতিতে পড়ার ফলে এরকম প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। নিজের কপালে হাত দিল ও। একটু ভেজা, তবে জ্বরের কোনো লক্ষণ নেই। নিজেকে সামলে নেয়ার জন্য গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিল ও। বোকামীর কথা চিন্তা করল। যদি সংক্রামক জীবাণুগুলো আক্রমণ করে থাকে তাহলে ওটার প্রভাব এক ঘণ্টার মধ্যেই দেখা দেবে।
মন্দিরে থাকা বুদ্ধ ও তার পার্শ্ববর্তী দেবতাদের অতিক্রম করে এগোল ওরা। দরজার ওখানে দিনের আলো একদম জ্বলজ্বল করছে।
