দরজায় হাত রাখলেন আং গেলু।
‘সাবধান!’ ফিসফিস করে বলল লিসা। নিজের হাতে থাকা সিরিঞ্জকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। এটাই ওর একমাত্র অস্ত্র।
ওর পাশে থাকা সৈনিকটিও একই আচরণ করল তার অস্ত্রের সাথে।
আং গেলু দরজা পুরোপুরি খুলে ফেললেন। সরু গলির সাইজের রুম দেখা গেল। মেঝেতে পাতা বিছানা রয়েছে রুমের এক কোণায়। একটা ছোট্ট সাইড টেবিলের পাশে জায়গা করে নিয়েছে তেলবাতি। প্রসাবের তীব্র কটু গন্ধ আর বিছানার নিচে রাখা ভোলা পট থেকে আসা মলের গন্ধে রুমের বাতাস পুরোপুরি দুর্গন্ধ হয়ে আছে। এখানে যে-ই থাকুক না কেন, এরকম ব্যক্তি আজকের দিনে বিরল!
এক কোণায় এক লোক ওদের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আং গেলুর মতো তার পরনেও লাল গাউন কিন্তু গাউনটা নোংরা, ছিঁড়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। লোকটা গাউনের নিচের অংশ উরুর ওপরে বেঁধে রেখেছে। তার নগ্ন পা দুটো দেখা যাচ্ছে। দেয়ালে লেখার কাজ করছে সে। আঙুল দিয়ে আঁকছে।
রং হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে তার নিজের রক্ত!
আগেরটার চেয়েও বেশি পাগলামোয়
তার অন্য হাতে একটা ছোরা ধরা আছে। নগ্ন পা দুটোর বিভিন্ন জায়গায় গভীর ক্ষত। তার রঙের উৎস ওগুলো। আং গেলু রুমে ভেতরে ঢোকার পরও তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সে আপনমনে নিজের কাজ করে যাচ্ছে।
‘লামা খেমসার,’ বললেন আং গেলু, তার কণ্ঠে উদ্বেগ।
তার পেছন পেছন ঢুকল লিসা, ওর হাতে সিরিঞ্জ একদম তৈরি। আং গেলু ওর দিকে তাকাতেই মাথা নাড়ল ও। সৈনিকের দিকে ফিরে ইশারা করল লিসা। নিচে যেটা ঘটেছে এখানেও সেটা পুনরাবৃত্তি হোক এটা চায় না ও।
ঘুরল লামা খেমসার। তার চেহারা নির্জীব, চোখগুলো কাঁচের মতো এবং একটু দুধ সাদা ধাঁচের। কিন্তু মোমের আলো তার চোখ থেকে খুব উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হলো, খুবই উজ্জ্বলভাবে।
‘আং গেলু’, বিড়বিড় করল বুড়ো সন্ন্যাসী, মাথা ঘুরিয়ে চার দেয়ালে আঁকা হাজার হাজার রেখার দিকে তাকাল। রক্তমাখা আঙুল তুলল সে, আবার কাজ শুরু করবে।
একদম স্বাভাবিকভাবে সন্ন্যাসীর দিকে এগোলেন আং গেলু। এই সন্ন্যাসী হলো মঠের প্রধান ব্যক্তি। এর অবস্থা এখনও অত খারাপ হয়নি। হয়তো তার কাছ থেকে কিছু উত্তর পাওয়া যাবে। স্থানীয় ভাষায় কথা বলতে শুরু করলেন আং গেলু।
মাথা নাড়ল লামা খেমসার, যদিও তার রক্ত শিল্পকর্ম এখনও বন্ধ হয়নি। বুড়ো
সন্ন্যাসীর সাথে কথা বলার চেষ্টা করছেন আং গেলু, এই ফাঁকে লিসা দেয়ালের দিকে নজর দিল। এই ধরনের লেখার সাথে লিসার কোনো পরিচিতি নেই, তবে ও লক্ষ করল দেয়ালে প্রায় একই ধরনের চিহ্ন বারবার লেখা হয়েছে, প্রায় কাছাকাছি দেখতে ওগুলো।
নিশ্চয়ই কোনো অর্থ আছে ওগুলোর। ব্যাগ থেকে এক হাত দিয়ে ক্যামেরা বের করল লিসা। কোমরের কাছে ক্যামেরা রেখে দেয়ালের দিকে তাক করে ছবি তুলল ও। কিন্তু ফ্ল্যাশলাইটের কথা ওর খেয়াল ছিল না।
ফ্ল্যাশের আলোয় ঝলসে উঠল পুরো রুম।
চিৎকার করে উঠল বুড়ো সন্ন্যাসী। হাতে ছোরা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। বাতাসে চালাল ছোরাটাকে। চমকে উঠে পিছু হটলেন আং গেলু। কিন্তু তাকে লক্ষ্য করে ছোরা চালানো হয়নি। অস্পষ্ট শব্দ করে ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল লামা খেমসার, ছোরা চালিয়ে দিল নিজের গলায়। টকটকে লাল রক্তের ধারা গড়াতে শুরু করল। শ্বাসনালী কেটে গেছে। রক্তে বুদবুদ তৈরি করে শেষ নিঃশ্বাস শ্রাগ করল বুড়ো সন্ন্যাসী।
শরীর ঘুরিয়ে ছোরার খোঁচা এড়িয়ে ছিলেন আং গেলু। লামা খেমসারকে ধরে মেঝে শুইয়ে দিলেন তিনি। রক্তে আং গেলুর গাউন, হাত ও কোল ভিজে গেল। আঘাতপ্রাপ্ত স্থান থেকে রক্ত ঝরা বন্ধ করার চেষ্টা করলেন আং গেলু কিন্তু সে চেষ্টা বৃথা।
‘ওকে নিচে নিয়ে যেতে হবে, আমাকে সাহায্য করুন।’ বলল লিসা। ‘ওনার শ্বাসকার্য চালানোর ব্যবস্থা করতে হবে।’
মাথা নাড়লেন আং গেলু। তিনি জানেন, আর কোনো লাভ হবে না। বুড়ো সন্ন্যাসীর দেহকে একটু নড়ালেন তিনি। রক্তের সাথে বের হওয়া বুদবুদগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছিল বুড়ো সন্ন্যাসী শ্বাস নিচ্ছে। ইতোমধ্যে সেই বুদবুদগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। বয়স, রক্তক্ষরণ ও পানিশূন্যতার কারণে লামা খেমসার এমনিতেই দুর্বল ছিল।
‘আমি দুঃখিত,’ বলল লিসা। ‘আমি ভেবেছিলাম…’ দেয়ালের দিকে দেখাল ও। ‘আমি ভেবেছিলাম ওগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
আং গেলু মাথা নাড়লেন। ‘কিছুই না। স্রেফ পাগলের পাগলামো।’
আর কী বলবে ভেবে পেল না লিসা। স্টেথোস্কোপ বের করে বুড়ো সন্ন্যাসীর বুক পরীক্ষা করতে শুরু করল। ব্যস্ততার মুখোশ পড়ে নিজের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করল ও। ভাল করে কানপাতল ও। কোনো হার্টবিট নেই। কিন্তু সন্ন্যাসীর পাজরে অদ্ভুত ক্ষত আবিষ্কার করল। আস্তে করে গাউন সরিয়ে বুকের ক্ষতগুলো উন্মুক্ত করল লিসা।
নিচের দিকে তাকালেন আং গেলু, দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
দেখা গেল শুধু দেয়ালে লিখেই ক্ষান্ত হয়নি লামা খেমসার। সন্ন্যাসীর বুকে একটা চূড়ান্ত চিহ্ন আঁকা রয়েছে। ওই একই ছোরা দিয়ে এবং সম্ভবত সন্ন্যাসী তার নিজ হাতেই কাজটা করেছে। তবে দেয়ালে আঁকা চিহ্নগুলোর মতো ভাঙ্গা ক্রসের এই চিহ্নটা অপরিচিত নয়।
একটা স্বস্তিকা।
হঠাৎ ওরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রথম বিস্ফোরণের ধাক্কায় ভবন কেঁপে উঠল।
