নিজের দাঁত ব্যবহার করে সিরিঞ্জের উঁচ উনাক্ত করল লিসা। তাড়াতাড়ি হাত চালাল।
আং গেলু এখনও লোকটাকে ধরে রেখেছেন। কিন্তু পাগল সন্ন্যাসী তার হাত থেকে ছোটার জন্য ছটফট করছে। ঠোঁট ফেটে গেছে আং গেলুর। তিনি গলার একপাশে কাস্তে ধরে রেখেছেন।
‘ওকে শক্ত করে ধরে রাখুন!” চিৎকার করে বলল লিসা।
আং গেলু তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেন। কিন্তু সে-সময়, সম্ভবত ডাক্তারের মতি গতি বুঝতে পেরে পাগল সন্ন্যাসী খেপে গেল। আং গেলুর গালে গভীরভাবে কামড় বসাল সে। আং গেলু আর্তনাদ করে উঠলেন। তাঁর গালের মাংস উঠে হাড় বেরিয়ে পড়েছে।
কিন্তু পাগলকে এখনও ছাড়েননি। শক্ত করে ধরে রেখেছেন।
লিসা তার সিরিঞ্জের উঁচ ঢুকিয়ে দিল পাগলের গলায়। ঠেলে দিল প্লঞ্জার। ‘ছেড়ে দিন ওকে!’
পাগলকে দরজার কাঠামোর সাথে শক্ত করে ঠেসে ধরলেন আং গেলু। পাগলের মাথার খুলি কাঠের সাথে বাড়ি লেগে আওয়াজ করে উঠল। ধাক্কা দিয়ে পেছনে সরল ওরা।
‘এক মিনিটের মধ্যে সিডেটিভ ওর শরীরে কাজ করবে।‘ ইনজেকশনটা পাগলের শিরদাঁড়ায় দিতে পারলে বেশি ভাল হতো। কিন্তু যেরকম আক্রমণ চলছিল তাতে গলায় না দিয়ে কোনো উপায় ছিল না। আশা করা যায়, এতেই কাজ হয়ে যাবে। একবার শান্ত হয়ে গেলে তারপর সেবা করা যাবে। হয়তো কিছু প্রশ্নের জবাবও মিলবে তখন।
যন্ত্রণায় গুঙিয়ে উঠল নগ্ন সন্ন্যাসী, গলায় হাত দিয়ে রেখেছে। সিডেটিভ পুশ করা হয়েছে ওখানে। আবার ওদের দিকে ফিরল সে। মেঝে থেকে সেই কাস্তেটা তুলে দাঁড়াল সোজা হয়ে।
আং গেলুকে হেঁচকা টান দিয়ে সরাল লিসা।‘ থামো…
ধ্রাস!
সরু হল কাঁপিয়ে রাইফেল গর্জে উঠল। রক্তের ফোয়ারা বইয়ে ফেটে গেল পাগল সন্ন্যাসীর মাথা। নিজের মাথার টুকরো টুকরো অংশের ওপর ধপাস করে পড়ে গেল সে।
গুলি নিক্ষেপকারীর দিকে তাকাল লিসা ও আং গেলু।
নেপালিজ সৈনিকের কাঁধে অস্ত্র ঝুলানো রয়েছে। ধীরে ধীরে নিচে নামিয়ে আনল ওটা। সৈনিকের সাথে আবার আঞ্চলিক ভাষায় ভর্ৎসনা করতে শুরু করলে আং গেলু। সৈনিকের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে নিলেন।
লাশের কাছে গিয়ে পালস চেক করল লিসা। নেই। লাশের দিকে তাকিয়ে কিছু উত্তর খোঁজার চেষ্টা করল ও। পাগলামোর মূল কারণ বের করার জন্য একটা মর্গ ও সাথে ফরেনসিক সংক্রান্ত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন। তবে সেই লোকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এখানে যা কিছু হয়ে থাকুক না কেন সেটা কেবল মাত্র একজনকে আক্রান্ত করেনি। বিভিন্ন মাত্রায় ভুগিয়েছে সবাইকে।
কিন্তু কী সেটা? ওদের পানিতে কোনো ভারী ধাতু ছিল, ভূগর্ভস্থ বিষাক্ত গ্যাস কিংবা কোনো বিষাক্ত ছত্রাক, খাদ্যশস্য? নাকি তারচেয়েও বড় কিছু, যেমন ইবোলা? নাকি নতুন কোনো ধরনের রোগ? গরুর পাগলামো সংক্রান্ত কিছু? ইয়াকগুলোর কথা মনে করল লিসা। পেট ফোলা মৃত গবাদি পশুগুলোর কথা ভাবল ও। কিছুই বুঝতে পারছে না।
আং গেল ওর কাছে এগিয়ে এলেন। তাঁর গাল রক্তে ভেসে যাচ্ছে তবে তিনি সেটাকে পাত্তাই দিচ্ছেন না। তাঁর যত কষ্ট এই মৃত দেহটাকে নিয়ে।
“ওর নাম রেলু নাআ হাভারসি।’
‘আপনি ওকে চিনতেন।
সম্মতি সূচক মাথা নাড়লেন সন্ন্যাসী। ‘আমার বোনের বরের চাচাতো ভাই ছিল ও। বড় হয়েছিল এক অজোপাড়ায়। মাওবাদী বিদ্রোহীদের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল ও। কিন্তু ওদের ওরকম সহিংস আচরণ ওর পছন্দ হয়নি। ওখান থেকে পালিয়ে গেল। আর মাওবাদীদের দল থেকে কারও পালানো মানে হলো মৃত্যুর টিকেট কেটে নেয়া। ওকে লুকানোর জন্য আমি মঠের একটা পদে বসিয়েছিলাম। মাওবাদীরা ওকে কোনোদিনও খুঁজে পেত না। এখানে ও বেশ শান্তিতেই ছিল… আর ওর জন্য এরকমই প্রার্থনা করেছিলাম আমি। আর এখন তো ও নিজের শান্তির পথ খুঁজে পেয়েছে।’
‘আমি দুঃখিত।
দাঁড়াল লিসা। পাশের রুমে থাকা বিচ্ছিন্ন হাত-পায়ের দৃশ্য আবার কল্পনা করল। কোনো আঘাতের ফলে কী ওরকম পাগলামোর সূচনা হয়েছিল? ওসবের ভয়েই এমন পাগলামো করছিল সন্ন্যাসী?
আরেকবার শব্দ হলো মাথার ওপরে।
সব চোখ ওপর দিকে তাকাল।
ওরা সবাই কীসের জন্য ওপরে এসেছিল, ব্যাপারটা লিসা ভুলেই গিয়েছিল। সরু ঢালু একটা সিঁড়ি দিকে নির্দেশ করলেন আং গেলু। ওটা লিসার চোখে পড়েনি। তবে ওটাকে সিঁড়ি না বলে মই বলাই ভাল।
“আমি যাব,’ বললেন তিনি।
‘একসাথে থাকব আমরা,’ আপত্তি তুলল লিসা। ব্যাগের কাছে গিয়ে আরেকটা সিরিঞ্জ তুলে নিল ও। এটাতেও সিডেটিভ লোড করা আছে। সিরিঞ্জটা হাতে রাখল। ‘আপনার তুষোড় সৈনিককে বলুন, সে যেন অস্ত্রের ট্রিগার থেকে আঙুল দূরে সরিয়ে রাখে।’
মইয়ে সবার আগে পা রাখল সৈনিক। দ্রুত ওপরে উঠে গিয়ে ওদেরকে ইশারা করল সে। লিসা মই বেয়ে উপরে উঠে দেখল এটা একটা ফাঁকা রুম। এক কোণায় পাতলা বালিশের তূপ দেখা গেল। রজন আর নিচ থেকে ভেসে আসা ধূপের গন্ধ পাওয়া গেল রুমে।
সৈনিকটি দূর প্রান্তে থাকা কাঠের দরজার দিকে অস্ত্র তাক করে রেখেছে। দরজার নিচ দিয়ে আলো আসছে। কেউ কাছে এগোবার আগেই একটা ছায়া আলোর ওপর দিয়ে চলে গেল।
কেউ আছে ওখানে।
আং গেলু সামনে এগিয়ে গিয়ে দরজায় নক করলেন।
শব্দ থামল।
দরজার এপাশ থেকে ডাকলেন তিনি। লিসা তার কথাগুলো বুঝতে না পারলেও কেউ একজন বুঝতে পারল। শব্দ হলো কাঠের সাথে ঘষা খাওয়ার। খিড়কি ভোলা হয়েছে। একটু ফাঁক হলো দরজা… ওই পর্যন্তই।
