ইসকির কার্ডটা গ্রে আবার ব্যবহার করল। ইনডিকেটর সবুজ হয়ে খুলে গেল ম্যাগনেটিক লক। দরজা ধাক্কা দিলো ও। রাইফেলটাকে কাঁধে ঝুলিয়ে এবার পিস্তল হাতে নিয়েছে।
মাথার ওপরে থাকা লাইটগুলো একটু দপদপ করে স্থির হলো।
রুম না বলে এটাকে বড় একটা হল বলাই ভাল। প্রায় ৪০ মিটার লম্বা। গ্রে খেয়াল করল এখানকার বাতাস বেশ ঠাণ্ডা। দেয়ালের একপাশ জুড়ে মেঝে থেকে ওপরের ছাদপর্যন্ত লম্বা স্টিলের ফ্রিজার দেখা যাচ্ছে। গুঞ্জন করছে কমপ্রেসরগুলো। অন্যপাশে আছে দুচাকার কার্ট, তরল নাইট্রোজেন বোঝাই ট্যাঙ্ক আর বড়সড় মাইক্রোস্কোপ টেবিল।
দেখে মনে হচ্ছে এটা এক ধরনের ক্রাইয়োনিক ল্যাব।
মাঝখানে ওয়ার্কস্টেশনে একটা কম্পিউটার বসানো আছে। স্ক্রিনসেভার ঘুরছে এলসিডি মনিটরে। কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের সামনে একটা রুপোলি প্রতীক। প্রতীকটা পরিচিত। উইউইলসবার্গ ক্যাসলে গ্রে এই প্রতীক দেখে এসেছে।
দ্য ব্ল্যাক সান। কালো সূর্য। বিড়বিড় করল গ্রে।
মারশিয়া ওর দিকে তাকালেন।
ঘুরতে থাকা সূর্যের দিকে নির্দেশ করে গ্রে বলল। এই প্রতীক হিমল্যারের ব্ল্যাক অর্ডারের পরিচয় বহন করে। ঠুলি সোসাইটি নামের এক গুপ্ত সংঘ… যাদের সদস্য ও বিজ্ঞানীরা সুপারম্যান দর্শনে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতো। ব্যালড্রিকও নিশ্চয়ই সেখানকার সদস্য।
গ্রে অনুভব করল ওরা একটা পূর্ণ বৃত্ত রচনা করে ফেলেছে। রায়ানের প্রপিতামহ থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত। কম্পিউটারের দিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, মৃল তালিকা খোঁজা যাক। দেখুন প্রয়োজনীয় কিছু পান কি-না।
মারশিয়া ওয়ার্কস্টেশনের দিকে এগোতেই গ্রে একটা ফ্রিজারের দিকে পা বাড়াল। ফ্রিজ খুলল ও। ঠাণ্ডা বাতাস বেরিয়ে এলো ফ্রিজ থেকে। ভেতরে অনেক ড্রয়ার দেখা যাচ্ছে। সবকটি নির্দেশক ও নাম্বার দেয়া। ওর পেছনে কম্পিউটারে খটাখট শব্দ তুলে কাজ শুরু করেছেন মারশিয়া। গ্রে একটা ড্রয়ার টান দিয়ে বের করল। ভেতরে সুন্দর সারি সারি কাঁচের ছোট স্ট্র-তে হলুদ তরল পদার্থ দেখা গেল।
হিমায়িত ভ্রূণ, ওর পেছন থেকে মারশিয়া বললেন।
ড্রয়ার বন্ধ করে হলে থাকা অন্যান্য ফ্রিজার গুনতে শুরু করল গ্রে। যদি মারশিয়ার কথা সত্য হয়ে থাকে তাহলে এখানে হাজার হাজার ভ্রণ সংরক্ষণ করা আছে।
মারশিয়া বললেন, এই কম্পিউটার হলো একটা ডেটাবেজ। জেনোম ও জিন্যেলজি সম্পর্কে তথ্য আছে এতে। মানুষ ও প্রাণী.. দুটোরই। স্তন্যপায়ী প্রজাতিও আছে। এটা দেখুন।
মনিটরে অদ্ভুত সব লেখা উঠে রয়েছে।
মিউটেশন করার পর কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে এটা হলো তার তালিকা, মারশিয়া বললেন।
উপরের দিকে থাকা একটা নামের ওপর টোকা দিলো গ্রে। ক্রোকুটা ক্রোকুটা, পড়ল ও। ছোপঅলা হায়না। কিন্তু রিসার্চের পর ওটার কী হাল হয়েছে সেটা দেখেছি আমি। ব্যালড্রিক ওয়ালেনবার্গ বলেছিলেন তিনি কীভাবে প্রজাতিগুলোকে নিখুঁত করছেন। এমনকি জানোয়ারগুলোর মগজে মানুষের কোষ পর্যন্ত ঢুকিয়েছেন তিনি!
বিস্মিত হয়ে মারশিয়া মূল ডিরেকটরিতে ফিরলেন। পুরো ডেটাবেজের নামকরণের সার্থকতা এবার বুঝলাম। Hersenschim, যাকে অনুবাদ করলে দাঁড়ায় কিইমিরা; সিংহের মাথা, ছাগলের দেহ ও সাপের লেজঅলা এক দানব। অর্থাৎ, এখানে বিভিন্ন প্রাণীর কোষ এনে একটা প্রণে প্রবেশ করানো হচ্ছে। কিন্তু এর শেষ কোথায়?
গ্রে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দ্রুণ ল্যাবের বিশাল পরিসরের ওপর চোখ বুলাল। এখানকার সবকিছুতে তাহলে সেই অর্কিড আর বনসাই গাছের মতো পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার আরেকটা উপায় এটা? নিজের মনগড়া নিখুঁত ডিজাইন করার চেষ্টা।
হুম… বিড়বিড় করলেন মারশিয়া। অভুত।
তার দিকে ফিরল গ্রে। কী?
আমি তো বলেছিলাম এখানে মানুষের দ্রুণ আছে। জিন্যেলজির ক্রস রেফারেন্স অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে এখানকার সব দ্রুণ জিনগত দিক থেকে ওয়ালেনবার্গদের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অবাক হওয়ার খবর সামনে আছে।
মারশিয়া বললেন, ওয়ালেনবার্গদের প্রত্যেকটা ভ্রুণের একটা স্টিম কোষের সাথে সম্পর্ক আছে যেটা ধরে এগোলে আমরা ক্রোকুটা ক্রোকুটাকে পাচ্ছি।
হায়না?
মাথা নাড়লেন মারশিয়া। হ্যাঁ।
বিষয়টা বুঝতে পেরে আতঙ্ক বেড়ে গেল। তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন নিজের সন্তানদের স্টিম কোষ ওই দানবগুলোর ভেতরে প্রবেশ করানো হয়েছে? ধাক্কাটা সুকোতে পারল না গ্রে।
এই ব্যালড্রিকের জঘন্য কাজ-কারবার, নিজেকে বেশি বুদ্ধিমান ভাবার কী কোনো শেষ নেই?
শুধু তা-ই নয়, মারশিয়ার কথা এখনও শেষ হয়নি।
অসুস্থবোধ করল গ্রে। কারণ মারশিয়া এখন যেটা বলতে চাচ্ছেন সেটা ও ইতোমধ্যে আন্দাজ করতে পেরেছে।
মনিটরে ভেসে ওটা জটিল চার্ট দেখালেন তিনি। এই চার্ট বলছে, হায়নাদের স্টিম কোষগুলো আবার পরবর্তী প্রজন্মের মানব ভ্রুণের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
হে খোদা…
গ্রের মনে পড়ে গেল খেপে যাওয়া হায়নাকে স্রেফ একটা হাত উঁচু করে ইসকি থামিয়ে দিয়েছিল। ওটা শুধু মনিব আর পোষা প্রাণীর সম্পর্ক ছিল না। ওটা ছিল পারিবারিক সম্পর্ক। ব্যালড্রিক সাহেব তার নিজের সন্তানদের কোষ হায়নাদের ভেতরে ঢোকানোর পর হায়নাদের কোষ আবার নাতি-নাতনীদের ভেতরে ঢুকিয়েছেন।
