আমার নাম ড. মারশিয়া ফেয়ারফিল্ড।
.
দুপুর ১২ টা ২৫ মিনিট।
ফাঁকা লেনে নামল জিপটা।
হুইলের পেছনে বসা ওয়ার্ডেন জেরাল্ড কেলজ তার ড্র-তে জমা ঘাম মুছলেন। তার দুই পায়ের মাঝে একটা ড্রিংক্সের বোতল রাখা আছে।
সকালে যথেষ্ট ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও রুটিন ভাঙতে তিনি নারাজ। অবশ্য এখন তার করার মতো তেমন কিছু ছিল না। ওয়ালেনবার্গ এস্টেটদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পার্ক রেঞ্জারদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন কেলজ। প্রত্যেকটা গেটে গার্ড বসিয়েছেন। ওয়ালেনবার্গ এস্টেটের ভেতর থেকে তার কাছে বিভিন্ন ছবি ফ্যাক্স করে পাঠানো হয়েছে।
আপাতত কেলজের অফিসে ফিরতি খবর না আসা পর্যন্ত বাসায় গিয়ে দুই ঘণ্টার লাঞ্চ সেরে নেয়া ছাড়া তার কোনো কাজ নেই। আজ মঙ্গলবার, অর্থাৎ লাঞ্চের মেনুতে থাকবে রোস্ট করা মুরগি আর মিষ্টি আলু। পুরো এক একর জমির ওপর নির্মিত দোতলা ভবনের সামনে এসে জিপ থামালেন। এত বড় ভবনটা শুধু তার জন্য। বয়স হয়েছে ঠিকই কিন্তু বিয়ে করার কোনো তাড়া নেই তার।
বাসায় নতুন একটা মেয়ে কাজ করছে। নাম : আইনা, বয়স : মাত্র ১১ বছর। নাইজেরিয়ার মেয়ে, একদম কুচকুচে কালো। জেরাল্ড অবশ্য এরকম আলকাতরা রঙের মেয়েদেরই পছন্দ করেন। কালো চামড়ায় আঘাতের দাগ সেভাবে ফুটে ওঠে না, তাই। এখানে কেলজকে কোনো কিছুতে মানা করার কেউ নেই।
পুরুষ কাজের মানুষও আছে এখানে। নাম : ম্যাক্সালি। জেল থেকে ধরে এনে কেলজ ওকে এখানে কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন। ম্যাক্সালির কাজ হলো বাড়িতে ভীতি বজায় রেখে পুরো বাড়ি পরিচালনা করা। বাড়ির ভেতরের কোনো সমস্যা দূর করতে সে যেমন দক্ষ তেমনি বাইরের সমস্যা দূর করতেও তার জুড়ি নেই। ওয়ালেনবার্গদের জন্য কেউ সমস্যা হয়ে দাঁড়ালে সেটাকে যদি কেউ গায়েব করে দিতে সাহায্য করে তাহলে যারপরনাই খুশি হয় বার্গরা। হেলিকপ্টারে করে ওয়ালেনবার্গ এস্টেটে এসে নামার পর কী হয়েছে না হয়েছে সেটা জানার কোনো অধিকার নেই জেরাল্ডের। কিন্তু গুজব তার কানে এসেছে।
মধ্যদুপুরের তপ্ত আবহাওয়ার ভেতরেও তার শরীরে কাঁপুনি ধরে গেল।
জানার দরকারই নেই, প্রশ্ন যত কম করা যায় ততই মঙ্গল।
গাছের ছায়ার নিচে গাড়ি পার্ক করে বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন তিনি। পাশের দরজা দিয়ে রান্নাঘরে গেলেন। দুইজন মালি বাগানের ফুল পরিচর্চা করছে। জেরাল্ডকে দেখে দুইজন চোখ নিচু করে রাখল। মনিবকে দেখে চোখ নিচু করে রাখতে হবে–এটাই শিখানো হয়েছে তাদের।
মুরগির রোস্টের ঘ্রাণ নাকে আসতেই কেলজের খিদে আরও বেড়ে গেল। রান্নাঘরে ঢুকলেন তিনি। পেটের ভেতরে যেন খাবারের জন্য আন্দোলন চলছে।
রান্নাঘরে ঢুকে তিনি দেখলেন, কুক (যে রান্না করে কাঠের তক্তার ওপর পড়ে রয়েছে, মাথাটা ওভেনে ঢোকানো। এরকম আজব পরিস্থিতি দেখে ভ্রু কুঁচকালেন জেরাল্ড। কয়েক মুহূর্ত পর তিনি বুঝতে পারলেন এটা কুক নয়।
ম্যাক্সালি…? রোস্টের ঘ্রাণ ছাড়াও নতুন একটা গন্ধ তার নাকে এলো। বিষাক্ত ক্ষতের গন্ধ। ম্যাক্সালির হাতে ক্ষতটা হয়েছে। একটা পালকঅলা ডার্ট। ম্যাক্সালির পছন্দের অস্ত্র এটা। সাধারণত এটায় বিষ মাখানো থাকে।
মারাত্মক গোলমাল হয়েছে কোথাও।
পিছু হটলেন কেলজ।
বাগানে থাকা দুই মালি তাদের কাজ বাদ দিয়ে এখন দুটো রাইফেল কেলজের চওড়া ভুড়ির দিকে তাক করে রেখেছে। হাত উঁচু করলেন তিনি, ভয়ে তাঁর চামড়া ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।
কাঠের শব্দ শুনে ঘুরে তাকালেন তিনি।
পাশের রুমের ছায়া থেকে একটি কালো অবয়ব বেরিয়ে এলো।
আগন্তুককে চিনতে পেরে ঢোঁক গিলল কেলজ… আগন্তকের চোখে তীব্র ঘৃণা।
সে কোনো সাধারণ ডাকাত নয়। তারচেয়েও জঘন্য কিছু।
জ্বলজ্যান্ত ভূত।
খামিশি…
.
দুপুর ১২ টা ৩০ মিনিট।
আসলে ওর হয়েছেটা কী? মনক জিজ্ঞেস করল। এইমাত্র ৬, পলার স্যাটেলাইট ফোন নিয়ে পাশের কুঁড়েঘরে গেছে ক্রো। লোগ্যান গ্রেগরির সাথে কথা বলে যোগাযোগ করবে।
লিসা জবাব দিলো। অ্যানার ভাষ্যমতে, ওর কোষগুলো অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে, গলে যাচ্ছে ভেতর থেকে। অ্যানা অতীতে বেল-এর রেডিয়েশনের প্রভাব স্বচক্ষে দেখেছেন। তার ভাই গানথার এই রোগের দীর্ঘস্থায়ী ভার্সনে আক্রান্ত হয়ে রয়েছে। কিন্তু গানথারের অতিরিক্ত রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকায় তার শারীরিক অবনতি তুলনামূলকভাবে ধীরে ধীরে হচ্ছে। অ্যানা ও পেইন্টার একদম রেডিয়েশনের খপ্পরে পড়েছিল, কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকায় ওরা অনেক বেশি আক্রান্ত হয়েছে।
বিস্তারিত আরও কিছু জানাল লিসা। কারণ ও জানে মেডিসিন সম্পর্কে মনকের বেশ পড়াশোনা করা আছে।
সব শোনার পর একটা প্রশ্নই উত্থাপিত হলো।
কতদিন সময় পাচ্ছে ওরা? বলল মনক।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেইন্টার যে কুঁড়েঘরে ঢুকেছে সেদিকে তাকাল লিসা। একদিনের বেশি নয়। যদি আজকেও চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয় তারপরও হয়তো কিছু স্থায়ী ক্ষতি সারানো সম্ভব হবে না।
আপনি ওর কথা বলার ধরন লক্ষ্য করেছেন… শব্দগুলো কীরকম ছাড়া ছাড়া? এটা কী ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নাকি…. নাকি অন্যকিছু…?
মনকের দিকে ফিরল লিসা। এটা ওষুধের চেয়েও বেশি কিছু।
ভয় ও হতাশার বিষয়। মনক দেখল লিসাও এটা নিয়ে অনেক ভুগেছে। লিসার দুশ্চিন্তা দেখে বোঝা যায় সে পেইন্টারের ব্যাপারে স্রেফ একজন ডাক্তার কিংবা সাধারণ বন্ধু হিসেবেই দুশ্চিন্তা করছে না… আরও বেশি কিছু আছে এতে। লিসা পেইন্টারকে যত্ন নিয়ে দেখভাল করে, অন্যদিকে নিজের আবেগকেও বাইরে বের হতে দেয় না। হৃদয়কে খুব সংযমে রেখেছে বেচারি।
