আমি ঠিক আছি। লিসাকে নয় যেন নিজেকে বিড়বিড় করে শোনল ও।
আপাতত আলোচনায় ছেদ পড়ল। ঘরের দরজা খুলে যাওয়ায় বাইরের আলো আর তাপ দুটোই ঢুকল ভেতরে। সেইসাথে পলা কেইনও ঘরে প্রবেশ করলেন। তার পেছন পেছন একজন পূর্ণবয়স্ক জুলু তাদের সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে হাজির হলো। জুলুর বয়স ৬৫ হলেও চেহারায় সেভাবে বলিরেখা পড়েনি, পাথরের মতো শক্ত মুখ তার, মাথায় কোনো চুল নেই, একদম কামানো। পালকযুক্ত একটা কাঠের বস্তু তার হাতে শোভা পাচ্ছে। এছাড়াও একটা প্রাচীন অস্ত্র আছে তার সাথে। তবে অস্ত্রটা দেখে মনে হলো এটা যতটা না কাজের তারচেয়ে বেশি ঐতিহ্যমণ্ডিত।
অস্ত্রটা চিনতে পেরে উঠে দাঁড়াল ক্রো। ব্রাউন বিস, বলল ও। নেপোলিয়নিক যুদ্ধে এই পাথুরে অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল।
জুলুকে পরিচয় করিয়ে দিলেন পলা। ইনি হলেন মশি ডিগানা, জুলু প্রধান।
বয়স্ক জুলু চোস্ত ইংরেজিতে বললেন, সবকিছু তৈরি।
আপনার সহায়তার জন্য ধন্যবাদ, সৌজন্যবোধ থেকে বলল ক্রো।
মশি একটু মাথা নেড়ে ধন্যবাদ গ্রহণ করলেন। তবে এই অস্ত্র আপনাদের জন্য নয়। আপনাদেরকে বর্শা-বল্লম ধার দেব। ব্লাড রিভারের ব্যাপারে ওদের সাথে আমাদের বিশেষ বোঝাপড়া আছে।
জুলুর কথার পুরোটা বুঝতে না পেরে পেইন্টার ভ্রু কুঁচকাল। পলা কেইন বিষয়টাকে খোলাসা করার জন্য মুখ খুললেন, কেপ টাউন থেকে ইংরেজরা যখন ডাচদেরকে বিতারিত করছিল তখন এখানে বিস্তর ঘটনা ঘটেছিল। অভিবাসী আর স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বিবাদ শুরু হয়েছিল তখন। ক্লোসা, পড়ো, সোয়াজি এবং জুলু সম্প্রদায়। ১৮৩৮ সালে, শাসকদের দ্বারা বাফেলো রিভারে জুলুরা বিশ্বাসঘাতকার স্বীকার হয়। হাজার হাজার জুলু প্রাণ হারিয়েছিল। ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছিল ওরা। নির্দয়ভাবে নরহত্যা ছিল ওটা। তারপর থেকে বাফেলো রিভারকে ব্লাড রিভার বলে ডাকা হয়। অর্থাৎ, রক্তাক্ত নদী। আর সেই বিশ্বাসঘাতকতার নেতৃত্বে যিনি ছিলেন তার নাম পাইট ওয়ালেনবার্গ।
প্রাচীন অস্ত্রটা পেইন্টারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মশি বললেন, আমরা সেটা কখনও ভুলিনি।
পেইন্টারের মনে আর কোনো সন্দেহ রইল না সেই যুদ্ধে নিশ্চয়ই এই অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল। অস্ত্রটা গ্রহণ করল ও। খুব ভাল করেই জানে, অস্ত্রের এই হাতবদলের সাথে সাথে ওদের সাথে জুলুদের একটা সন্ধি-চুক্তি হয়ে গেল।
দুই পা আড়াআড়ি রেখে অবলীলায় বসে পড়ল মশি। আমাদেরকে অনেক পরিকল্পনা করে নিতে হবে।
পলা খামিশির দিকে মাথা নেড়ে একটা চাদর উঁচু করে ধরে বললেন, খামিশি, আপনার ট্রাক রেডি। তাউ আর নজঙ্গো ইতোমধ্যে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। হাতঘড়িতে একবার চোখ বুলালেন তিনি। তাড়াতাড়ি করতে হবে।
উঠে দাঁড়াল সাবেক গেম ওয়ার্ডেন। ওদের প্রত্যেককে যার যার দায়িত্ব রাতের মূল মিশনের নামার আগেই পালন করতে হবে।
মনকের সাথে পেইন্টারের চোখাচোখি হয়ে গেল। মনকের চোখে দুশ্চিন্তার ছাপ দেখা যাচ্ছে। অবশ্য এই দুশ্চিন্তা পেইন্টারের জন্য নয়, এটা গ্রের জন্য। সূর্যাস্ত হতে আর ৮ ঘন্টা বাকি। আপাতত অন্ধকার না নামা পর্যন্ত অ্যাকশন নেয়ার কিছু নেই।
ওদিকে গ্রে তো দলছুট হয়ে রয়েছে।
.
দুপুর ১২ টা ০৫ মিনিট।
মাথা নিচু করে রাখো, ফিসফিস করে ফিওনাকে বলল গ্রে।
হলের শেষপ্রান্তে থাকা গার্ডের দিকে এগোচ্ছে ওরা। গ্রের পরনে একটা ইউনিফর্ম, সাথে জ্যাকবুট আর কালো ক্যাপ, ক্যাপের ব্রিম চোখের ওপর নামানো। একটু আগে এক গার্ডকে অজ্ঞান করে গ্রে পোশাকটা বাগিয়ে নিয়েছে। উপরতলার এক বেডরুমের ক্লোজিটে গার্ডকে আটকে রেখে এসেছে ওরা।
শুধু ইউনিফর্মই নয় গার্ডের রেডিওটাও নিয়ে এসেছে গ্রে। কোমরের বেল্টের সাথে রেডিও রেখে একটা ইয়ারপিস ঢুকিয়েছে কানে। রেডিওতে যা কথা হচ্ছে সব ডাচ ভাষায়। অর্থ উদ্ধার করতে বেশ বেগ পেতে হলেও কোনমতে কাজ চলে যাচ্ছে আরকি। নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল।
গ্রের হায়ার আড়ালে থেকে এগোচ্ছে ফিওনা। ওর পরনে কাজের মেয়ের (মেইড) পোশাক। ক্লোজিটে গার্ডের শরীর রেখে আসার সময় পোশাকটা সংগ্রহ করেছে ওরা। মেইডের পোশাকটা একটু বড় হলেও তাতে শাপে বর হয়েছে। ফিওনার শরীরের আকার ও বয়স ঢাকা পড়ে গেছে ওতে। এস্টেটের ভেতরে যারা কাজ করে তাদের অধিকাংশই স্থানীয় এবং তাদের গায়ের রং বিভিন্ন রকমের কালো। আফ্রিকায় যেমনটা হয়ে থাকে। ফিওনার ত্বকের রং বাদামি-কফির মতো, মেয়েটা পাকিস্তানি, এখানকার জন্য বেশ মানিয়ে গেছে। মাথায় থাকা চ্যাপ্টা টুপির নিচে সোজা চুলগুলোকে লুকিয়ে রেখেছে ও। খুব কাছ থেকে না দেখলে ওকে যে কেউ স্থানীয় মেয়ে হিসেবে মেনে নেবে। ছদ্মবেশের মোলআনা পূর্ণ করতে মেয়েটা একটু বশ্যতামূলক ভঙ্গিতে হাঁটছে। হাঁটার ভঙ্গিতে একধরনের জ্বী হুজুর ভাব স্পষ্ট। কাঁধ নামিয়ে, মাথা নিচু করে হাঁটছে ফিওনা।
তবে ওদের ছদ্মবেশকে কোনো পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হলো না।
খবর ছড়িয়ে পড়েছে ফিওনা আর গ্রেকে জঙ্গলে দেখা গেছে। তাই সব গার্ড জঙ্গল, ভবনের বাইরে আর সীমান্তে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। মূল ভবনের এখানে একটা প্যাট্রল ছাড়া কেউ নেই।
