রুটিন মোতাবেক নির্দিষ্ট সময় পর পর সিকিউরিটি হেলিকপ্টার ক্যাম্পের ওপর দিয়ে উড়ে এস্টেটের সীমানায় টহল দিচ্ছে। কিন্তু পলা কেইন ঘাগু মহিলা। হেলিকপ্টার থেকে কেউ যদি এই গ্রামের ওপর দিয়ে টহল দিয়ে যায় তাহলে এটাকে একটা সাধারণ জুলু গ্রাম ছাড়া আর কিছুই ভাববে না। কেউ ভুলেও চিন্তা করবে না জুলুদের একটা কুঁড়েঘরে এতবড় মিটিং হচ্ছে।
এখানে উপস্থিত সবাই বিভিন্ন তথ্য ও পরিকল্পনা জড়ো করেছে।
একসাথে বসে আছে পেইন্টার, অ্যানা ও গানথার। পেইন্টারের কনুইয়ের কাছে রয়েছে লিসা… আফ্রিকায় আসার পর থেকে ক্রোর সাথে লেগে রয়েছে সে। লিসার চেহারায় উদাসীন ভাব থাকলেও চোখে দুশ্চিন্তার ছাপ ঠিকই ফুটে উঠেছে। ওদের পেছনে ছায়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে মেজর ব্রুকস। সে হোলস্টারে থাকা পিস্তলের ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে।
সাবেক গেম ওয়ার্ডেন খামিশি এখন ফাইনাল ডিব্রিফিং করবে। ওরা সবাই তার কথা শোনার জন্য মনোযোগী হয়ে আছে। তার সাথে এখানে চমক হিসেবে আরও একজন যোগ দান করেছে।
মনক।
পেইন্টারকে অবাক করে দিয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত এক তরুণকে সাথে এনেছে মনক। ওদের দুজনকে এই ক্যাম্পে নিয়ে আসার কাজটা খামিশি করেছে। তরুণটিকে পাশের আরেকটি কুঁড়েঘরে রাখা হয়েছে, বিশ্রাম নিচ্ছে সে। তবে মনক বিশ্রাম নিতে যায়নি। মিটিঙে উপস্থিত থেকে পুরো ঘটনা বোঝার চেষ্টা করেছে, প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, অজানা জিনিস জানিয়েছে।
এইমাত্র মনক একসেট প্রতীক আঁকা শেষ করল। সেগুলোর দিকে তাকালেন অ্যানা। তার চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। কাঁপা হাতে কাগজটা তুলে নিয়ে বললেন, হিউগো হিরজফিল্ডের বইতে এগুলো পাওয়া গেছে?
মনক মাথা নাড়ল। এবং সেই বুড়ো ভাম বিশ্বাস করে এগুলো নাকি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার পরবর্তী পরিকল্পনায় নাকি এগুলোর অনেক বড় ভূমিকা আছে।
পেইন্টারের দিকে তাকালেন অ্যানা। মূল ব্ল্যাক সান প্রজেক্টের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন ড. হিউগো হিরজফিল্ড। আপনার মনে আছে, আমি বলেছিলাম, হিউগো বিশ্বাস করতেন বেল-এর রহস্যের সমাধান করে ফেলেছেন তিনি। সেই বিশ্বাসের ওপর ভর করে শেষবারের মতো একটা পরীক্ষা চালিয়ে ছিলেন। একদম গোপনে, পরীক্ষার সময় শুধু নিজে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত সেই পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল এমন একটা শিশুর জন্ম দেয়া, যেটা একদম নিখুঁত হবে। শিশুটির কোনোরকম সমস্যা থাকবে না, বাহ্যিক… অভ্যন্তরীণ… কোনো ধরনের সমস্যাই নয়। সূর্যের এক নিখুঁত বীরকিন্তু তার সেই পদ্ধতি… কীভাবে পরীক্ষাটা করেছিলেন… সেটা কেউ জানে না।
আর তিনি তাঁর মেয়েকে উদ্দেশ্য করে যে চিঠিটা লিখেছিলেন, বলল ক্রো, তাতে উল্লেখ ছিল, এমন কিছু একটা তিনি আবিষ্কার করেছেন যেটা তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে। একটা সত্য… যেটা এতটাই সুন্দর যে মেরে ফেলা যাচ্ছে না… আবার এতটাই দানবীয় যে মুক্তও করা যাচ্ছে না। যার ফলে তিনি সেই গোপন জিনিসটাকে প্রাচীন বর্ণমালার প্রতীক দিয়ে কোডে লুকিয়ে ফেলেন।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন অ্যানা। ব্যালড্রিক ওয়ালেনবার্গ খুবই আত্মবিশ্বাসী যে তিনি সেই কোড ভাঙতে সক্ষম। আর সেজন্যই তিনি আমাদের বেল ধ্বংস করে দিয়েছেন।
আমার মনে হয় বিষয়টা এত ছোট নয়, ক্রো বলল। আপনি এর আগে হয়তো ঠিকই বলেছিলেন। আপনার ওখানে থাকা বিজ্ঞানীরা বাইরের পৃথিবীর বিজ্ঞানযাত্রায় সামিল হতে চাচ্ছিল। সেটা রুখে দিতেই আপনাদের হিমালয়ের ক্যাসলে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল ব্যালড্রিক। সফলতার এত কাছে এসে তিনি বাড়তি কোনো ঝামেলা কিংবা ঝুঁকি নিতে চাননি।
মনকের আঁকা ছবির দিকে তাকিয়ে অ্যানা বললেন, যদি হিউগো সাহেবের কথা সত্য ধরে নিই তাহলে তার কোডগুলো আমাদের এই অসুখের বিরুদ্ধে কাজে আসলেও আসতে পারে। বেল এখনও আমাদের এই দুরারোগ্য ব্যাধি সারিয়ে দিতে পারবে যদি আমরা এই কোড ভাঙতে পারি।
আলোচনাটা বেশি কল্পনাপ্রবণ হয়ে যাওয়ায় লিসা বাস্তবসম্মত একটা কথা বলল। কিন্তু তার আগে আমাদেরকে তো ওয়ালেনবার্গদের বেল-এ ঢাকার ব্যবস্থা করতে হবে। তারপর নাহয় অসুখ সারার ব্যাপারটা ভাবা যাবে।
ভাল কথা, গ্রের কী খবর? মনক প্রশ্ন করল। আর সেই মেয়েটা?
চোখ-মুখ শক্ত করে রাখল ক্রো। গ্রে কী লুকিয়ে আছে নাকি ধরা পড়েছে, নাকি মারা গেছে সে-সম্পর্কে আমাদের কাছে কোনো তথ্যই নেই। এইমুহূর্তে কমান্ডার পিয়ার্স এখন দলছুট অবস্থায় আছে।
মনক মুখ হাঁড়ি করে বলল, আমি তাহলে আবার ফিরে যাই। খামিশির তৈরি করা ম্যাপ ধরে এগোলে ভেতরে ঢুকে যেতে পারব।
না। এখন আমাদের আর আলাদা হওয়া চলবে না। ডান কানের পেছনে মাথাব্যথা হওয়ায় সেখানে হাত দিয়ে ডলতে ডলতে বলল পেইন্টার।
মনক ওর দিকে তাকাল।
হাত নাড়িয়ে মনককে আশ্বস্ত করল গ্রে। কিন্তু মনক আশ্বস্ত হতে পারল না। বসের শারীরিক অবস্থা নিয়ে এখন মাথা ঘামাচ্ছে না ও। মনক ভাবছে, পেইন্টার কী সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? তার মানসিক অবস্থা কেমন? সন্দেহটা ওকে নাড়া দিল। পেইন্টার প্রকৃতপক্ষে এখন কতটা পরিষ্কারভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে পারছে?
অবস্থা বুঝে ক্রোর হাঁটুর ওপর হাত রাখল লিসা।
