গ্রে উঠে দাঁড়াবার আগেই ইসকি ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। হাতের কব্জিতে গেঁথে থাকা ছুরির ফলা দিয়ে গ্রের মুখে আঘাত করার চেষ্টা করছে। উদ্দেশ্য : গ্রের চোখ অন্ধ করে দেয়া। কোনোমতে গ্রে তার কনুইটা ধরল, ধরেই মুচড়ে দিল ও। দুজন একসাথে ব্রিজের কিনারার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
গ্রে থামল না।
দুজন একে অপরের সাথে লেপ্টে থাকা অবস্থায় ব্রিজ থেকে ছিটকে পড়ল।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাম হাঁটু একটা পোস্টের সাথে বাঁধিয়ে নিজের পতনরোধ করল গ্রে। আচমকা টান লেগে ওর শরীর ঝাঁকি খেল। পায়ের ওপর ভর করে ঝুলছে এখন। ইসকি ওর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছে।
উল্টো হয়ে ঝুলে থাকা অবস্থায় গ্ৰে দেখল, কিছু ডালপালার ফাঁক-ফোকর দিয়ে ইসকির শরীরটা বশ জোরেশোরে আছড়ে পড়ল নিচের ঘাসযুক্ত জমির ওপর।
নিজেকে ব্রিজের উপর তুলে নিলো গ্রে।
উপরে উঠে অবিশ্বাসের সাথে দেখল ইসকি নিজের পায়ের ওপর উঠে দাঁড়িয়েছে। নিজেকে সামলে নিতে একটু খোঁড়াল সে, পায়ের গোড়ালিটা মচকে গেছে।
গ্রের পাশে শব্দ হলো।
গ্রে আর ইসকির মারামারির সময়ে খাঁচার ক্যাবল বেয়ে উঠে এসে কাঠের তক্তার ওপর ফিওনা অবতরণ করেছে। গ্রের দিকে দ্রুত এগোল ও ইসকি বেচারির হাতের যেখানটা কেটে দিয়েছে রক্ত বেরোচ্ছে সেখান থেকে।
নিচে তাকাল গ্রে।
ইসকি উপরে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে খুনের নেশা।
কিন্তু নিচে মহিলা একা নয়।
পেছনে তারদিকে স্কাল্ড এগিয়ে আসছে। শরীর নিচু করে শিকার করার ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে দানবটা। এ যেন ডাঙ্গার হাঙর। রক্তের তৃষ্ণা পেয়ে বসেছে ওটাকে।
এবার বেশ হয়েছে, ভাবল গ্রে।
কিন্তু ইসকি তার সুস্থ হাতটা দানবটার দিকে বাড়িয়ে দিলো। থেমে গেল হায়নাটা। নাক বাড়িয়ে শুকল কী যেন। কাছে এসে ইসকির হাতের তালুতে এসে গাল ঘষল। মনে হলো ওটা কোনো পোষা বিড়াল। মনিবের কাছ থেকে আদর নিচ্ছে। নিচুস্বরে আওয়াজ করে বসে পড়ল দানবটা।
এরমধ্যে ইসকি কিন্তু একবার গ্রের দিক থেকে চোখ সরায়নি।
খুঁড়িয়ে সামনে এগোলো সে।
গ্রে নিচ দিকে তাকিয়ে আছে।
মহিলার পায়ের কাছে নিরীহভঙ্গিতে চুপচাপ পড়ে রয়েছে পিস্তলটা।
গ্রে উঠে দাঁড়াল। ফিওনার কাধ ধরে ঝাঁকিয়ে বলল, দৌড়াও!
ফিওনার জন্য ওই একটা শব্দই যথেষ্ট। ব্রিজের ওপর দিয়ে ছুটল ওরা। ভয়ের চোটে ফিওনা প্রায় উড়ে যাচ্ছে। এই বৃত্তাকার পথ থেকে বেরোনোর প্রান্তে পৌঁছে গেছে ওরা।
ওরা যেই সোজা রাস্তায় উঠতে যাবে ওমনি পেছন দিক থেকে গুলির আওয়াজ শোনা গেল।
ইসকি পিস্তলটা তুলে নিয়েছে।
দ্রুত দৌড়ে খোঁড়া পিস্তলধারী আর নিজেদের মধ্যে যতদূর সম্ভব দূরত্ব তৈরি করতে চাচ্ছে ওরা। এক মিনিটের মাথায় ওরা দুজন রাস্তার সংযোগস্থলে পৌঁছে গেল। গ্রে ভাবল ওরা এখন নিরাপদ।
এই সংযোগস্থলের যেখানটায় গ্রে এর আগে থেমেছিল ফিওনাকে ঠিক ওখানেই থামাল ও। এই সংযোগস্থল থেকে সবদিকে পথ চলে গেছে। কিন্তু ওরা এখন কোনদিকে এগোবে? এরমধ্যে ইসকি নিশ্চয়ই সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছে, অবশ্যই যদি তার রেডিও ঠিক থাকে তাহলে। কিন্তু সেটার ওপর তো আর গ্রে ভরসা করতে পারে না। ওকে ধরে নিতে হবে গার্ডরা ইতোমধ্যে ভেতরে-বাইরে সার্চ শুরু করে দিয়েছে।
আর মনকের কী খবর? তখন গুলির আওয়াজটা কীসের ছিল? মনক কি মারা গেছে? বেঁচে আছে? নাকি ধরা পড়েছে আবার? অনেক সম্ভাবনা। নাহ, গ্রের এখন কোথাও গিয়ে লুকোতে হবে। ঠাণ্ডা হতে হবে ওকে।
কিন্তু লুকোবে কোথায়?
একটা রাস্তা মূল ভবনের দিকে চলে গেছে।
ওটা দিয়ে এখোনো যেতে পারে। কেউ ভাববে না ওরা আবার মূল ভবনের দিকে গেছে। তার ওপর ওখানে ফোনও আছে। যদি বাইরের পৃথিবীর সাথে সংযোগ স্থাপন করা যায়… তাহলে হয়তো এখানকার কার্যবিধি সম্পর্কে বিস্তারিত অনেক কিছু জানা যাবে…
কিন্তু এগুলো আপাতত আকাশ-কুসুম কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়। পুরো জায়গাটা কঠিন নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা।
ফিওনা খেয়াল করে দেখল, গ্রে কিছু একটা ভাবছে।
ওর হাতে টোকা দিয়ে নিজের পকেট থেকে কী যেন বের করল মেয়েটা। একটা চেইনে থাকা দুটো তাসের কার্ডের মতো দেখতে ওটা।
না তাস খেলার কার্ড নয়।
কি (চাবি) কার্ড।
আমি ওই কুত্তী মহিলার কাছ থেকে এটা ঝেড়ে দিয়েছি, থুতু ফেলে বলল ফিওনা। আমার গায়ে আঁচড় দেয়ার প্রতিশোধ।
গ্রে কার্ড দুটো নিয়ে পরীক্ষা করে দেখল। মনকের খোঁচা মনে পড়ে গেল ওর। জাদুঘরে আটকা পড়ার পর ফিওনাকে মনক খোঁচা মেরে বলেছিল জাদুঘরের পরিচালকের পকেট থেকে চাবির গোছা চুরি না করে কি কার্ড চুরি করলেই বেশি কাজে দিতো। দেখা যাচ্ছে, মেয়েটা মনকের কথাটাকে বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়েছে।
চোখ সরু করে আবার মূল ভবনের দিকে তাকাল গ্রে।
ওর সাথে থাকা পকেটমারকে বিশেষ ধন্যবাদ দিতেই হয়। ক্যাসলে ঢোকার কি। কার্ড এখন হাতের মুঠোয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীভাবে কী করবে?
১৩. জেরাম-৫২৫
১৩. জেরাম-৫২৫
সকাল ১০টা ৩৪ মিনিট।
হুলুহুলুই-আমলোজি প্রিজার্ভ
জুলুল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা।
কাদা-মাটি দিয়ে বানানো কুঁড়েঘরে বসে আছে পেইন্টার ক্রো। ওর চারপাশে বিভিন্ন রকম ম্যাপ আর নকশা ছড়িয়ে আছে। পশুর মলের দুর্গন্ধ আর ধুলো ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। কিন্তু সুবিধে হলো জুলুদের এই ক্যাম্প থেকে ওয়ালেনবার্গ এস্টেটের দূরত্ব মাত্র দশ মিনিট।
