নিচু হয়ে কান পাতল গ্রে। গার্ডের এই আছড়ে পড়ার শব্দ কেউ কি শুনে ফেলেছে?
বাম দিক থেকে হঠাৎ করে এক নারী কন্ঠের চিৎকার শোনা গেল। ইংরেজিতে চিৎকার করছে সে। বারে লাথি মারা বন্ধ কর! নইলে কিন্তু তোকে ফেলে দেব।
কণ্ঠটা গ্রের পরিচিত। ইসকি। ইসাকের যমজ বোন।
তারচেয়েও পরিচিত কণ্ঠস্বর ইসকির কথার জবাব দিলো। দূরে গিয়ে মর,, মাগী!
ফিওনা।
মেয়েটা এখনও বেঁচে আছে।
বিপদের মধ্যেও স্বস্তিতে গ্রে হেসে ফেলল।
ধীরে ধীরে রাস্তার শেষপ্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছুল গ্রে। জঙ্গলের ভেতরে একটা ফাঁকা জায়গায় বৃত্ত রচনা করে রাস্তা শেষ হয়েছে। ব্রিজ থেকে ক্যাবলের সাহায্যে খাঁচাকে ঝুলানো হয়েছে। পা দিয়ে খাঁচার বারে লাথি দিচ্ছে ফিওনা। ৩টা দ্রুত, ৩টা ধীরে। দৃঢ় প্রতিজ্ঞ দেখা যাচ্ছে ওর চেহারায়। এখন নিজের পায়ের নিচে কাঁপুনি অনুভব করতে পারছে গ্রে। ব্রিজ থেকে খাঁচাকে যে ক্যাবলের সাহায্যে ঝোলানো হয়েছে সেই ক্যাবলের মাধ্যমেই কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ছে।
চালু মেয়ে।
মূল ভবনের অ্যালার্ম নিশ্চয়ই মেয়েটা শুনতে পেয়েছিল। হয়তো ধরে নিয়েছিল এভাবে লাথি মেরে গ্রেকে সিগন্যাল দিলে কাজ হবে। আর যদি তা না হয়… তাহলে এটা স্রেফ ওর পাগলামো{ মোর্স কোডের প্যাটার্নটা হয়তো নিতান্তই কাকতালীয়।
ঘড়ির কাঁটার ২, ৩ ও ৯ টায়; অর্থাৎ ভিন্ন তিনটি পজিশনে তিনজন গার্ডকে আবিষ্কার করল গ্রে। ইসকি সাদা-কালো পোশাক পরে ১২টার অবস্থানে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার দুই হাত রেলিঙের ওপর রাখা, দৃষ্টি–নিচের খাঁচায় থাকা ফিওনার ওপর।
তোর হাঁটুর ভেতরে একটা বুলেট ঢুকিয়ে দিলে তখন এমনিতেই থেমে যাবি, পাশে থাকা পিস্তলের ওপর হাত রেখে বলল সে।
লাথি মারার মাঝপথে ফিওনা থেমে গেল। কী যেন বলল বিড়বিড় করে। পা চালানো থামিয়ে দিলো বেচারি।
গ্রে পরিস্থিতি হিসেব করতে শুরু করল। ওর কাছে একটা রাইফেল আছে। ওদিকে বিপক্ষে রয়েছে তিনজন গার্ড, প্রত্যেকে সশস্ত্র। এমনকি ইসকির কাছেও একটা পিস্তল আছে। পরিস্থিতি সুবিধের নয়।
কোথা থেকে যেন যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
নিজের রেডিও তুলে মুখের কাছে ধরল ইসকি। la?
আধ-মিনিট ধরে ওপাশের বক্তব্য শোনার পর একটা প্রশ্ন করল ও। কিন্তু গ্রে প্রশ্নটা বুঝে উঠতে পারল না। তারপর রেডিও সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
নতুন নির্দেশ পাওয়া গেছে! রেডিও নামিয়ে গার্ডদেরকে ডাচ ভাষায় নির্দেশ দিলো সে। আমরা মেয়েটাকে এক্ষুনি মেরে ফেলব!
.
সকাল ৬টা ৪০ মিনিট।
উত্তেজনার প্রকাশ স্বরূপ গর্জন ছেড়ে ঝুলন্ত ছেলেটার দিকে লাফ দিলো উকুফা। ওদিকে খামিশি টের পেল ওর পেছন দিক থেকে মহিলাটি এগিয়ে আসছে। দুই হাতে রশি ধরে থাকায় ওর পক্ষে কোনো অস্ত্র বের করা সম্ভব নয়।
কে তুমি? আবার প্রশ্ন করল সে, হাতে উদ্যতভঙ্গিতে ছুরি ধরা আছে।
খামিশির পক্ষে একটা কাজই করা সম্ভব ছিল, সেটাই করল ও।
হাঁটু ভাঁজ করে রেলিং ক্যাবলের ওপর দিয়ে লাফ দিলো খামিশি। লাফ দিয়ে নামার সময় হাতের রশিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেছিল ও। মাথার উপরে থাকা স্টিলের পপালের ওপর দিয়ে রশি ঘষা খাওয়ার সময় শিস বাজার মতো আওয়াজ শোনা গেল। নিচের দিকে পড়তে পড়তে ছেলেটার দিকে তাকাল খামিশি। ছেলেটা সোজা আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে, ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে উঠে বিকট চিৎকার দিয়েছে বেচারা।
উড়ন্ত শিকারের দিকে ঝাঁপ দিলে উকুফা। কিন্তু খামিশির হেঁচকা লাফ ছেলেটাকে ব্রিজের রাস্তার ওপর নিয়ে আছড়ে ফেলে দিয়েছে।
এদিকে হাতে রশিতে হঠাৎ করে টান লাগায় খামিশির মুঠোর বাঁধন ভেঙ্গে গেল।
ঘাসের ওপর পিঠ দিয়ে পড়ল ও। নিচে ঝুঁকে খামিশির দিকে তাকাল মহিলা, তার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে।
খামিশির কাছ থেকে কয়েক মিটার দূরে বড় কিছু একটা আছড়ে পড়েছে।
উঠে বসল খামিশি।
উকুফা-ও উঠে দাঁড়িয়েছে, রাশি রাশি লাল ছিটল ওটার মুখ থেকে, ভয়ঙ্করভাবে গর্জন করছে।
সামনে থাকা একমাত্র শিকারের দিকে লাল চোখ মেলে তাকিয়ে আছে ওটা।
খামিশি।
ওর হাতে এখন কিছুই নেই। রাইফেলটা ব্রিজের কাঠের তক্তার ওপর রয়ে গেছে। রক্তের নেশা ও রাগে হুঙ্কার ছাড়ল দানবটা। ঝাঁপিয়ে পড়ল খামিশির ওপর। ওর গলার রগ ছিঁড়ে নেবে।
শুয়ে পড়ল খামিশি, সাথে থাকা একমাত্র অস্ত্রকে বের করল। জুলু অ্যাসেগাই। ছোট আকৃতির এই বর্শা ওর উরুতে বাধা ছিল। উকুফা ওর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়তেই বর্শার ফলাকে কাজে লাগাল খামিশি। এই অস্ত্র কীভাবে ব্যবহার করতে হয় সেটা ওর বাবা ওকে শিখিয়েছিলেন। জুলু সম্প্রদায়ের ছেলেরা সবাই এই বর্শা চালাতে জানে। বাবার কাছ থেকে শেখা বিদ্যাকে খামিশি আজ জায়গামতো কাজে লাগাল। বর্শার ফলাটুকু উকুফার পাজরের ভেতরে সেঁধিয়ে দিলো ও। এটা আর কোনো রূপকথা নয়, একদম বাস্তবেই উকুফা ঢলে পড়ল খামিশির ওপর।
আর্তনাদ ছাড়ল উকুফা। ব্যথা আর যন্ত্রণায় সরে গেল খামিশির ওপর থেকে। একটা গড়ান দিয়ে খামিশি উঠে পড়ল, ওর কাছে এখন আর কোনো অস্ত্র নেই। ঘাসের ওপর পড়ে আছে উকুফা, বর্শার ফলা সেঁধিয়ে আছে ওটার পাজরের ভেতর। শেষবারের মতো গর্জন করে শরীর ঝাঁকি দিলো ওটা, তারপর সব শেষ।
মারা গেছে।
রাগে চিৎকার করে উঠল কে যেন, উপরে তাকাল খামিশি।
