ব্রিজের উপরে থাকা মহিলাটা খামিশির রাইফেল তুলে নিয়ে ওর দিকে তাক করে রেখেছে। ফায়ার করতেই গ্রেনেড ফাটার মতো আওয়াজ হলো। খামিশির পায়ের কাছের ঝোপে গিয়ে মুখ খুঁজল বুলেট। পিছু হটল খামিশি। ওর সাথে তাল মিলিয়ে মহিলা তার রাইফেলের টার্গেটে পরিবর্তন আনল। এবার গুলি ছুঁড়লে নির্ঘাত লক্ষ্যভেদ করে ছাড়বে।
ফায়ার করার আওয়াজ হলো, তবে শব্দটা আগের মতো বিকট নয়, বেশ তীক্ষ্ণ।
গড়িয়ে পড়ল খামিশি… কিন্তু নিজেকে অক্ষত অবস্থায় আবিষ্কার করল সে।
উপরে তাকিয়ে দেখল ক্যাবলের ওপর দিয়ে মহিলা নিচের দিকে পড়ি পড়ি করছে, রক্তে লাল হয়ে গেছে তার বুক।
ব্রিজের রাস্তায় নতুন একজনের উদয় হলো।
পেশিবহুল শরীর, মাথাটা চকচকে করে কামানো। তার এক হাতে পিস্তল ধরা রয়েছে, অন্যহাতটির অংশবিশেষ দিয়ে পিস্তলকে স্থির করে এগোচ্ছে সে। কাছে এসে ছেলেটাকে দেখল সে।
রায়ান…
স্বস্তিতে ফুঁপিয়ে উঠল ছেলেটা। আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করুন।
প্ল্যান তো সেরকমই… হঠাৎ খামিশিকে দেখল আগন্তক। কিন্তু কথা হলো, ওই লোক যদি এখান থেকে বের হওয়ার পথ জানে তাহলে সুবিধে হবে। আমি তো রাস্তা গুলিয়ে ফেলেছি!
.
সকাল ৬টা ৪৪ মিনিট।
দুটো গুলি ছোঁড়ার আওয়াজ জঙ্গলে প্রতিধ্বনিত হলো।
শব্দে চমকে উঠে পাখা মেলে উড়ে গেল এক ঝাক টিয়া পাখি।
নিচ হলো গ্রে।
মনক কী ধরা পড়ে গেছে?
ইসকিও হয়তো সে-রকম কিছু ভেবেছে। শব্দ দুটো যেদিক থেকে এসেছে সেদিকে তাকাল ও। গার্ডদের উদ্দেশ্য করে বলল, দেখ তো কী হয়েছে!
আবার রেডিও তুলে নিল ইসকি।
বৃত্তাকৃতির ঝুলন্ত রাস্তার ওপর দিয়ে রাইফেল হাতে নড়াচড়া শুরু করল গার্ডরা। গ্রের দিকে আসছে সবাই। গার্ড থেকে বাঁচতে শুয়ে পড়ল গ্রে, বুকে নিজের রাইফেলটাকে জড়িয়ে নিলো। আগের বারের মতো এবারো কাঠের তক্তা ধরে ঝুলে পড়ল ও। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সবচেয়ে কাছের গার্ড উদয় হবে। কিন্তু এবার ভারসাম্যে গোলমাল হয়ে যাওয়ায় ওর শরীর বেশি দুলে উঠল। রাইফেল ফসকে গেল কাঁধ থেকে। নিচে পড়ে যাচ্ছে ওটা।
এক হাতে নিজেকে ঝুলিয়ে রেখে আরেক হাত বাড়িয়ে এক আঙুল দিয়ে কোনমতো রাইফেলের স্ট্রাপটা ধরল গ্রে। রাইফেলের পতন ঠেকাতে পেরে ও চুপচাপ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
হঠাৎ ওর মাথার উপরে শব্দ শোনা গেল। বুটের আওয়াজ। কাঠের তক্তা দুলছে এখন।
দুলুনিতে গ্রের আঙুল থেকে রাইফেলের স্ট্রাপটা ফসকে গেল। মাধ্যাকর্ষণ ওটাকে টেনে নিয়ে ফেলল নিচের ঝোঁপের ভেতর। এবার দুই হাত দিয়ে নিজেকে শক্ত করে ঝুলিয়ে রাখল গ্রে। ভাগ্য ভাল, রাইফেল নিচে আছড়ে পড়ে তেমন বড় কোনো শব্দ করেনি।
গার্ডদের বুটের আওয়াজ প্রতিধ্বনি তুলতে তুলতে দূরে চলে গেছে।
রেডিওতে কথা বলছি ইসকি।
এবার?
ইসকির পিস্তলের বিপক্ষে ওর কাছে একটা ছুরি আছে। প্রয়োজন পড়লে ইসকি গুলি ছুঁড়তে একটুও দ্বিধা করবে না আর তার হাতের নিশানা নিয়েও গ্রের মনে কোনো সন্দেহ নেই।
গ্রের হাতে সম্বল একটাই, সেটা হলো ওকে চমকে দিতে হবে।
তবুও চমকে দিয়ে কতটা সফলতা পাওয়া যাবে সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে।
কাঠের তক্তা ধরে ঝুলে ঝুলে এগোল গ্রে। বৃত্তাকার অংশে পৌঁছে গেল। একটু বাইরের অংশ ধরে এগোচ্ছে ও, যাতে ইসকির চোখে না পড়ে যায়। সাবধানতার সাথে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে গ্রে। অতিরিক্ত দুলুনি ইসকিকে সতর্ক করে দিতে পারে। একটু পর পর বাতাস এসে ব্রিজকে দুলিয়ে যাচ্ছে, সেই দুলুনির সাথে মিল রেখে গ্রে এগোল।
কিন্তু এর এই আগমন লুকোনো সম্ভব হলো না।
ফিওনা খাঁচার ভেতরে নিচু হয়ে বসেছে। ইসকি আর ওর মধ্যে যত বেশি সম্ভব বার রাখতে চাইছে সে। একটু আগে ইসকি ডাচ ভাষায় যে নির্দেশ দিয়েছিল সেটার অর্থ ফিওনা ঠিকই বুঝতে পেরেছে। আমরা মেয়েটাকে এক্ষুনি মেরে ফেলব! তবে গুলির শব্দ হওয়ায় আপাতত সেদিকে মনোযোগ সরে গেছে ইসকির। তবে ওটা তো সাময়িক, একসময় ঠিকই ফিওনার দিকে মনোযোগ সে দেবেই।
খাঁচায় নিচু অবস্থানে থেকে গ্রেকে দেখতে পেল ফিওনা। সাদা রঙের জাম্পস্যুট পরিহিত গরিলা ব্রিজের হাঁটার রাস্তার তক্তা ধরে ঝুলে সামনে এগিয়ে আসছে। গাছের পাতার জন্য তার শরীরের অর্ধেক দেখা যাচ্ছে না। বিস্ময়ে চমকে উঠল ফিওনা। আর একটু হলে দাঁড়িয়ে পড়েছিল, নিজেকে জোর করে বসিয়ে রাখল। চোখ গরিলাটাকে অনুসরণ করতে করতে দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল।
ফিওনা যতই সাহসী হোক কিংবা সাহস দেখাক গ্ৰে দেখল এখন ওর চেহারায় ভয় ফুটে উঠেছে। খাঁচার ভেতরে আরও বেশি ছোট দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। দুহাত দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে ফিওনা। ফুটপাতে ঠোকর খেয়ে বড় হওয়া এই মেয়েটিও এখন ভয়ে সেটিয়ে গেছে।
ওই অবস্থায় থেকে নিচের দিকে নির্দেশ করল ফিওনা, তারপর মাথা নেড়ে না বোধক ভঙ্গি করল। ওর চোখ দুটো ভয়ে বড় বড় হয়ে গেছে। গ্রেকে সতর্ক করার চেষ্টা করছে ও।
নিচে পড়লে খবর আছে।
গ্রে নিচের ঘন ঘাস আর ঝোঁপের ওপর দিয়ে চোখ বুলাল। পুরু ছায়া ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না। তবুও ফিওনার সতর্কতাকে ও গুরুত্বের সাথে নিলো।
নিচে পড়া যাবে না।
কতদূর চলে এসেছে হিসেব কষল গ্রে। বৃত্তাকার পথে ঘড়ির কাঁটার হিসেবে আটটা বাজলে ঘন্টার কাটা যেখানে থাকবে ওর অবস্থান এখন সেখানে। ইসকির অবস্থান বারোটায়। এখনও বেশ খানিকটা যেতে হবে ওকে। কিন্তু ওর হাত টনটন করছে, ব্যথা করছে আঙ্গুলগুলো। দ্রুত এগোতে হবে। বারবার থেমে গিয়ে শুরু করার ফলে ওর বেশি শক্তি অপচয় হচ্ছে। কিন্তু দ্রুত এগোতে গেলে ইসকির নজরে পড়ে যেতে হবে, সেটাও একটা সমস্যা।
