খামিশি দ্রুত রশি টানতে শুরু করল।
Wie zijn u? হঠাৎ একটা কণ্ঠ ঘেউ করে উঠল খামিশির পেছন থেকে।
চমকে উঠে আর একটু হলে রশিটা খামিশি ছেড়েই দিচ্ছিল! ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ও।
একজন লম্বা নারী ব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে, পরনের পোশাক কালো। নারী হলেও তার চোখ দেখে মনে হলো এর ভেতরে কোনো দয়া-মায়া নেই। চুলগুলো সাদা তবে একদম কদমছাট দেয়া। ওয়ালেনবার্গ পরিবারের সন্তান। এই সেকশনে হাঁটতে বেরিয়েই হয়তো খামিশিকে দেখে ফেলেছে সে। তার হাতে ইতোমধ্যে একটা ছুরি দেখা যাচ্ছে। খামিশির ভয় হলো, হাত থেকে রশিটা যেন ছুটে না যায়।
অবস্থা ভাল নয়।
নিচ থেকে চিৎকার করে উঠল ছেলেটা।
খামিশি ও নারী দুজনই নিচ দিকে তাকাল।
ছেলেটা প্রথমে যে ডালে ছিল উকুফা এখন সেই ডালে পৌঁছে গেছে। এবার লাফ দেয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে ওটা। খামিশির পেছনে থাকা নারী হেসে উঠল। নিচ থেকে দানবটাও কেমন এক আওয়াজ করল। দুটো আওয়াজ প্রায় একই রকম। ছুরি হাতে নিয়ে খামিশির পিঠের দিকে এগোচ্ছে কদমছাটধারী।
ছেলে ও খামিশি দুজনই এবার ফাঁদে পড়েছে।
.
সকাল ৬টা ৩৮ মিনিট।
রাস্তার সংযোগস্থলে এসে হাঁটু গেড়ে বসল গ্রে। ব্রিজের উপরে হাঁটার রাস্তা তিনভাগে ভাগ হয়ে গেছে। বাম পাশের রাস্তা ফিরে গেছে মূল ভবনে। মাঝেরটা জঙ্গলের কোল ঘেঁষে এগিয়েছে বাগানের দিকে। ডান পাশের রাস্তা সোজা চলে গেছে জঙ্গলের গভীরে।
এবার কোনদিকে এগোনো যায়?
গ্রে নিচু হয়ে বসল। এলসিডি মনিটরে জঙ্গলের ভেতরে সূর্যের আলো আর গাছপালার মিশেলে যে ছায়া দেখেছিল সেটার সাথে জঙ্গলের বর্তমান অবস্থার তুলনা করল ও। ছায়ার দৈর্ঘ্য আর দিক ভাল করে হিসেব করলে ফিওনাকে ঠিক কোথায় আটকে রাখা হয়েছে সেটার হদিস পাওয়া সম্ভব।
অনেক পায়ের চাপে হাঁটার রাস্তা খানিকটা দুলে উঠল।
আরও গার্ড আসছে।
ইতোমধ্যে দুটো দলের সাথে ওর মোকাবেলা হয়ে গেছে।
কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে ব্রিজের কিনারায় চলে গেল গ্রে। নিজের হাত ও ব্রিজের ক্যাবলের সাহায্যে পাশে থাকা গাছের ঘন পাতাঅলা ডালে আশ্রয় নিলো। কিছুক্ষণ পর তিনজন গার্ডকে দেখা গেল, হাঁটার রাস্তা দুলিয়ে এগোচ্ছে ওরা। গাছের সাথে নিজেকে দৃঢ়ভাবে লেপ্টে রাখল গ্রে, পারলে গাছের ভেতরে সেঁধিয়ে যায় এমন অবস্থা!
গার্ডরা চলে যাওয়ার পর গ্রে আবার ব্রিজে উঠল। ওঠার সময় হাতে ধরে থাকা ক্যাবলে এক ধরনের ছন্দময় কাপুনি অনুভব করল ও। আরও গার্ড আসছে নাকি?
কাঠের তক্তার ওপর উপুড় হয়ে ক্যাবলে কান পাতল গ্রে। ইন্ডিয়ান ট্র্যাকাররা এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে থাকে। স্পষ্ট ছন্দময় কাঁপুনি শোনা যাচ্ছে, পরিষ্কার আওয়াজ অনেকটা গিটারের ছিঁড়ে যাওয়া তারের মতো। ৩টা দ্রুত টুং-টাং, ৩ টা ধীরে, আবার ৩ টা দ্রুত… এভাবে চলছে।
মোর্স কোড।
S.0.S.
কেউ ক্যাবলের মাধ্যমে সিগন্যাল দিচ্ছে।
নিচু হয়ে অন্য পাশের ক্যাবল ধরে অনুভব করল গ্রে। নাহ, শুধু একটা ক্যাবলই কাঁপছে। সেই ক্যাবল ধরে এগোলে ডান পাশের রাস্তা নিতে হবে। সোজা জঙ্গলের ভেতরে চলে গেছে রাস্তাটা।
তাহলে এটা কী…?
আর কোনো সূত্র না পেয়েও গ্রে ডানদিকের পথ ধরল। রাস্তার একপাশ দিয়ে এগোল ও, চেষ্টা করল ওর হাঁটার ফলে ব্রিজ যাতে না দোলে কিংবা কোনো শব্দ না হয়। পথ ধরে এগোতে এগোতে আরও অনেক পার্শ্বরাস্তা পেল গ্রে। প্রতি রাস্তার সংযোগস্থলে পৌঁছে ক্যাবলের কাঁপুনি পরীক্ষা করে সঠিক পথ নিলো।
গ্রে রাস্তার দিকে খুব মনোযোগ দিয়ে এগোচ্ছিল, বড় একটা তালপাতার নিচ দিয়ে এগোনোর সময় হঠাৎ খেয়াল করে দেখল ওর কাছ থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে একটা গার্ড দাঁড়িয়ে আছে। বাদামি চুল, বয়স ২৫ হবে হয়তো, হিটলারি করার জন্য একদম উপযুক্ত বয়স। ক্যাবলের রেলিঙের ওপর ঝুঁকে একদম গ্রের দিকে তাকিয়ে আছে সে। তালপাতা নড়তে দেখে অস্ত্র উঠে এসেছে তার হাতে।
গ্রের হাতে নিজের রাইফেল নেয়ার মতো যথেষ্ট সময় নেই। সামনে এগোতে থাকা অবস্থাতেই পাশের ক্যাবলের দিকে ঝাঁপ দিল ও। না, ব্রিজ থেকে লাফিয়ে পড়ার কোনো ইচ্ছেই ওর নেই। কারণ এখান থেকে লাফিয়ে নিচে পড়লেও এত অল্প রেঞ্জে গার্ডের বুলেট লক্ষ্যভেদ করতে ব্যর্থ হবে না। ক্যাবলের ওপর নিজের শরীরের ওজন চাপিয়ে দিয়ে ঝাঁকি দিল গ্রে।
গার্ড নিজে ক্যাবলের উপর শরীরের ভার দিয়ে থাকায় গ্রের দেয়া ঝাঁকিতে দুলে উঠল সে। ঝাঁকিতে এলোমেলো হয়ে গেল অস্ত্রের টার্গেট। দুই বার পা ফেলে গার্ড আর নিজের মধ্যকার ব্যবধান ঘুচিয়ে ফেলল গ্রে। গার্ডের কাছে পৌঁছুতে পৌঁছুতে ওর হাতে ছোরা চলে এসেছে।
গার্ডের এই ভারসাম্যহীনতার সুযোগ নিয়ে কণ্ঠনালীতে ছোরা ঢুকিয়ে দিয়ে গ্রে তাকে চিরতরে চুপ করিয়ে দিল। ছোরাটা একদম কণ্ঠের স্বরযন্ত্রে আঘাত হেনেছে। রক্তবাহিত ধমনী দিয়ে রক্ত ছিটকে বেরোল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গার্ডের প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবে। গার্ডের শরীর ব্রিজের কাঠের তক্তার ওপর ঢলে পড়ার আগেই ধরে ফেলল গ্রে। খুন করেও গ্রের ভেতরে কোনো অনুশোচনাবোধ হলো না। রায়ানকে খাঁচা থেকে ফেলে দেয়ার সময় গার্ডরা কীভাবে হেসেছিল সেটা মনে পড়ে গেল ওর। এভাবে কতজনকে মেরেছে ওরা? গার্ডের শরীর তুলে নিয়ে ব্রিজের বাইরে ছুঁড়ে দিল গ্রে। ঘন ঝোঁপের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ল গার্ডের লাশ।
