আর তুমি কী করবে?
গ্রে জবাব দিল। ওর কাছে জবাব নেই।
গ্রে… ফিওনা হয়তো এতক্ষণে মারা গেছে।
আমরা না জেনে সেটা বলতে পারি না।
গ্রের চেহারার দিকে তাকাল মনক। কম্পিউটার মনিটরে সেই দানবটার ছবি দেখেছে ও। মনক জানে গ্রের আর কোনো উপায় নেই।
মাথা নাড়ল ও।
আর কোনো কথা না বলে দুজন দুটো ভিন্ন দিকে রওনা হয়ে গেল।
.
সকাল ৬টা ৩৪ মিনিট।
বিপরীত দিকের একটা গাছ বেয়ে উপরে থাকা হাঁটার রাস্তায় উঠে এলো খামিশি। সাবধানে সন্তর্পণে নড়াচড়া করছে।
নিচে, এখনও উকুফা গাছটির চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফাঁদে পড়া শিকারকে পাহারা দিচ্ছে ওটা। একটু আগে উচ্চ শব্দে কিছু একটা বিস্ফোরিত হওয়ায় উকুফা ভড়কে গেছে। গাছে উঠছিল ওটা ভড়কে গিয়ে পড়ে গেছে গাছ থেকে। সাবধান ও সতর্ক হয়ে গাছের চারদিকে হাঁটছে ওটা। কান খাড়া করে রেখেছে। অ্যালার্মের আওয়াজ ভেসে আসছে মূল ভবন থেকে।
এই আকস্মিক হৈচৈ খামিশিকেও দুশ্চিন্তায় ফেলে দিলো।
তাউ আর নজঙ্গো কী ধরা পড়ে গেছে। কেউ দেখে ফেলেছে ওদের?
নাকি এস্টেটের বাইরের মাঠে ওদের ছদ্মবেশী বেজ ক্যাম্প কারও চোখে পড়েছে? জুলু শিকারিদের মতো করে ওরা ওদের ক্যাম্প সাজিয়েছিল। কেউ কী বুঝতে পেরেছে ওটা কোনো সাধারণ জুলু ক্যাম্প নয়?
অ্যালার্ম যে-কারণেই বেজে থাকুক না কেন, শব্দের দানবীয় হায়না… উকুফা… এখন আরও সতর্ক ও সাবধান হয়ে গেছে। ওটার ভড়কে যাওয়ার সুযোগে উপরে থাকা ব্রিজে উঠে এসেছে খামিশি। ব্রিজের কাঠের তক্তার ওপর গড়িয়ে শুয়ে পড়ল ও, রাইফেলটাকে সামনে আনলো। উদ্বেগ ওকে সতর্ক থাকতে সাহায্য করছে। কীভাবে যেন এখন আর ভয় পাচ্ছে না ও। খামিশি দানবটির আস্তে আস্তে হাঁটার ভঙ্গি, চাপা গর্জন আর একটু আওয়াজ হলেই ভড়কে গিয়ে হাঁক ছাড়া… এসব কিছু লক্ষ করল।
সাধারণ হায়নাদের স্বভাব এগুলো।
আকারে দানবের মতো হলেও এটা পৌরাণিক কিংবা অতিপ্রাকৃত কোনো দানব নয়।
একটু সাহস পেল খামিশি।
খামিশি জলদি ব্রিজের ওপর দিয়ে হেঁটে ছেলেটার গাছের কাছে এলো। নিজের প্যাক থেকে এক গাছা দড়ি বের করল ও।
ব্রিজের হাঁটার রাস্তার পাশে স্টিলের ক্যাবল দেয়া। খামিশি ক্যাবলের ওপর দিয়ে ঝুঁকে ছেলেটাকে দেখে নিলো। শিস দিল ও। শব্দ শুনেও ছেলেটার দৃষ্টি নিচের দিক থেকে সরল। কিন্তু পরমুহূর্তেই সম্বিত ফিরে পেয়ে উপরে তাকাল সে। খামিশিকে দেখতে পেয়েছে।
আমি তোমাকে এখান থেকে বের করব, নিচু স্বরে ইংরেজিতে বলল খামিশি। আশা করল, ছেলেটা ওর ভাষা বুঝতে পেরেছে।
তবে ওর কথা শুধু ছেলেটা-ই নয় আরেকজনও শুনতে পেয়েছে।
ব্রিজের দিকে তাকাল উকুফা। ওটার টকটকে লাল চোখ দুটো খামিশিকে দেখছে। ব্রিজের ওপর খামিশিকে দেখতে দেখতে দাঁত বেরিয়ে পড়ল ওটার। খামিশি টের পেল দানবটা কিছু একটা হিসেব করছে। এই দানবটাই কী মারসিয়াকে আক্রমণ করেছিল?
সেটা জানার কোনো প্রয়োজন নেই খামিশির। তারচেয়ে বরং ওটার দাঁত বের করা বিদঘুঁটে হাসিমাখা মুখের ওপর ডাবল ব্যারেল রাইফেলের গুলি খুঁজে দিতে পারলে ভাল হবে। কিন্তু বড় বোরের রাইফেল থেকে অনেক আওয়াজ হয়। এমনিতেই এস্টেটের সবাই এখন সতর্ক অবস্থায় আছে। তার ওপর এখন রাইফেল থেকে গুলি ছুঁড়লে বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না। তাই খামিশি পায়ের কাছে রাইফেল রেখে দিলো। দুই হাত আর কাধকে এখন কাজে লাগাতে হবে।
এই ছেলে! বলল খামিশি। আমি তোমার দিকে রশি ছুঁড়ে দেব। রশিটাকে তুমি কোমরে জড়িয়ে নিয়ে। বলতে বলতে ইশারা করেও দেখিয়ে দিলো ও। তারপর আমি তোমাকে টেনে তুলব।
ছেলেটা বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল। ওর চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেছে। কান্না আর ভয়ের কারণে মুখ ফুলে গেছে বেচারার। খামিশি সামনে ঝুঁকে ছেলেটার দিকে রশি ছুঁড়ে দিলো। ঘন পাতায় বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার ফলে রশিটা ছেলের কাছে পৌঁছুতে পারল না। ছেলেটার মাথার ওপরে থাকা একটা ডালে আঁটকে রইল।
তোমাকে ওপরের ডালে উঠতে হবে
ছেলেটাকে আর বাড়তি কোনো তাগাদা দেয়ার প্রয়োজন নেই। এই বিপদ থেকে পালানোর উপায় পেয়ে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল সে। হ্যাঁচড়ে পাঁচড়ে উঠল উপরের ডালে। রশিকে ডাল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের কোমরে জড়িয়ে নিলো। বেশ দক্ষতার সাথে কাজটা করল সে। ভাল।
ব্রিজের একটা স্টিলের ক্যাবলের পোলে রশিটা প্যাচিয়ে নিলো খামিশি। তোমাকে। টেনে তুলতে যাচ্ছি। তোমাকে কিছুক্ষণ ঝুলতে হবে!
তাড়াতাড়ি! খুব তীক্ষ্ণস্বরে ও চিৎকার করে বলল ছেলেটাকে।
খামিশি খেয়াল করল উকুফা ছেলেটার এই নতুন অবস্থান খুব ভাল করে দেখছে। মনে হচ্ছে দানবটা হলো বিড়াল আর ছেলেটা হলো ইঁদুর! ইঁদুরের পেছনে বিড়াল লেগেছে! থাবার নখগুলোকে কাজে লাগিয়ে গাছে উঠতে শুরু করল ওটা।
আর কোনো সময় নষ্ট না করে খামিশি রশি টানতে শুরু করল। রশি টানতে গিয়ে টের পেল ছেলেটার ওজন নেহাত কম নয়। একটু টানার পর হাতে রশি রেখে নিচের দিকে তাকাল ও। ছেলেটা পেণ্ডুলামের মতো এদিক-ওদিক দুলছে।
উকুফাও দুলছে। ছেলেটার সাথে সাথে ওটারও দৃষ্টি এদিক-ওদিক সরে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে গাছে উঠছে ওটা। খামিশি বুঝতে পারল, গাছ থেকে লাফ দিয়ে ছেলেটাকে ধরার মতলব করেছে উকুফা।
