যেদিক থেকে কান্নার আওয়াজ এসেছে সেদিকে ঘুরল খামিশি। দানবের কাছে মারসিয়াকে হারিয়েছে, ওর এখনও মনে আছে ভয়ের চোটে জলধারায় গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে ভোরের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু এবার আর ও-কাজ করবে না।
জঙ্গলে ঘুরে তৈরি করা ম্যাপটা তার হাতে দিল ও। ক্যাম্পে ফিরে যাও। ড. কেইনকে এটা দেবে।
খামিশি… ভাইয়া… না, যেয়ো না। চলে এসো। ভয়ে তার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। ওর দাদা নিশ্চয়ই উকুফার গল্প শুনিয়েছে ওকে। গালগল্প এখন জীবন্ত হয়ে দেখা দিয়েছে। তাই আর ওর বন্ধুকে বাহবা দিতেই হবে। খামিশির সাথে এস্টেটের ভেতরে অন্য কেউ ঢুকতে রাজি হতো না। কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস খুব কঠিন জিনিস।
তবে এখন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তাউর আর এখানে থাকার কোনো ইচ্ছে নেই।
এজন্য খামিশি অবশ্য ওদেরকে দোষও দিতে পারে না। মারসিয়ার ক্ষেত্রে সে নিজে কীরকম ভয় পেয়েছিল! নিজের দায়িত্ব ভুলে ডাক্তারকে মরতে দিয়ে কাপুরুষের মতো পালিয়েছিল ও।
যাও, নির্দেশ দিলো খামিশি। সামনে নদী আছে। ওটার ওপর দিয়ে এস্টেটের বেড়া দেয়া। ওদিকে নির্দেশ করল ও। ম্যাপটাকে বাইরে পৌঁছুতে হবে।
তাউ ও নজঙ্গো এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা করল। অবশেষে মাথা নাড়ল তাউ। দুই বন্ধু নিচু হয়ে এগিয়ে চলল জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। ওরা এত সতর্কভাবে এগোচ্ছে যে খামিশি ওদের কোনো শব্দ পর্যন্ত শুনতে পেল না।
পুরো জঙ্গল জুড়ে এখন অস্বস্তিকর নীরবতা। একদম সুনসান। নীরবতার গভীরতা যেন ঠিক এই জঙ্গলের মতো। দানবের গর্জন আর মানুষের কান্নার আওয়াজ এসেছিল বাঁ দিক থেকে। খামিশি সে-দিকে পা বাড়াল।
ঠিক এক মিনিটের মাথায় নেকড়ের গর্জনের মতো আওয়াজে কেঁপে উঠল পুরো জঙ্গল। গর্জন শেষ হতে এক ঝাঁক পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ শোনা গেল। খামিশি দাঁড়িয়ে পড়েছে। রহস্যময় কিন্তু পরিচিত কিছু একটা ওর দাঁড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী।
কিন্তু সেটা সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবার আগেই ফোপানোর আওয়াজ ওর দৃষ্টিআকর্ষণ করল।
ঠিক সামনে থেকে এসেছে আওয়াজটা।
দুইনলা রাইফেল ব্যবহার করে সামনে থাকা পাতার বাধা দূর করার চেষ্টা করল খামিশি। গুলির ফলে সামনে যতটুকু দৃষ্টি গেল তাতে ও দেখল… একটা গাছ শুয়ে আছে। খুব সম্প্রতি ঘটেছে বিষয়টা। গাছ পড়ে যাওয়ার কারণে জঙ্গলের এই অংশের ডালপালার সামিয়ানার একটি অংশে ফাঁক তৈরি হয়েছে। সূর্যের আলো আসছে সেই ফাঁক দিয়ে। মজার ব্যাপার হলো, সীমিত অংশ দিয়ে সূর্যের আলো আসায় জঙ্গলের অন্যান্য অংশ দেখতে আরও বেশি ভোগান্তি হচ্ছে। ছায়া পড়ে আরও বেশি অন্ধকার হয়ে গেছে সব।
কিছু একটার নড়াচড়া খামিশির চোখে পড়ল। একজন তরুণ… কৈশোর পেরিয়ে সবে তরুণ হয়েছে… একটা গাছের নিচু অংশে রয়েছে সে। আরেকটা ডালে পৌঁছে আরও উঁচুতে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করছে বেচারা, কিন্তু পারছে না। কারণ, ডান হাত দিয়ে শক্ত করে কিছু আঁকড়ে ধরতে পারছে না সে। এতদূর থেকেও খামিশি দেখতে পেল, ছেলেটার হাতা রক্তে ভিজে আছে।
তারপর হঠাৎ ছেলেটা নিজের পা গুটিয়ে নিলো, গাছের গুঁড়ি ধরে লুকোনোর চেষ্টা করল।
পরমুহূর্তেই হঠাৎ করে তার এরকম ভয় পাওয়ার কারণটা বোঝা গেল।
দৃশপটে দানবটির আগমন দেখে বরফের মতো জমে গেল খামিশি। ঠিক সেই গাছের নিচেই এসেছে ওটা। আকারে বিশাল, কিন্তু কোনো আওয়াজ না করে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে এসেছে। একটি পূর্ণ-বয়স্ক পুরুষ সিংহের চেয়েও আকারে বড় এটা। কিন্তু এটা সিংহ নয়। এর মোটা লোমগুলো সাদা রঙের, চোখগুলো অতিমাত্রায় লাল, জ্বলজ্বল করছে। কান দুটো বাদুড়ের মতো চওড়া। কাঁধের উঁচু অংশ থেকে এর পিঠ ঢালু হয়ে শরীরের শেষ অংশ পর্যন্ত চলে গেছে। পেশিবহুল গ্রীবার ওপর রয়েছে একটা বড়সড় মাথা। কান দুটো বাদুড়ের মতো চওড়া। দানবটা গাছের দিকে তাকিয়ে আছে।
মাথা উঁচু করে ওপরের গন্ধ শুঁকছে, রক্তের গন্ধ।
ঠোঁট উল্টে রাখায় ওটার ভয়ঙ্কর দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছে।
আরেকবার গর্জন করে গাছে উঠতে শুরু করল দানবটা।
খামিশি জানে নিজে কী দেখছে।
উকুফা।
মৃত্যু।
বিকটদর্শন এই দানবের আসল নামটাও জানা আছে ওর।
.
সকাল ৬টা ৩০ মিনিট।
প্রজাতির নাম–ক্রোকুটা ক্রোকুটা এলসিডি মনিটরের দিকে এগোতে এগোতে বললেন ব্যালড্রিক ওয়ালেনবার্গ। ফিওনার খাঁচার ভিডিওর ওপরে দানবটির ভিডিও ফুটেজ দেখা যাচ্ছে মনিটরে। ব্যালড্রিক লক্ষ করেছেন, গ্রে দানবটিকে হা করে দেখছে।
বিশাল ভালুকের মতো বড় সাইজের দানবটিকে পর্যবেক্ষণ করছে গ্রে। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে ওরা। মুখ হাঁ করে গর্জন করছে। ওটার মাঢ়ি সাদা, তীক্ষ্ণ দাঁতগুলোর রঙ হলুদ। প্রায় ৩শ পাউন্ড ওজন হবে দানবটির। কোনো হরিণ জাতীয় প্রাণীর দেহাবশেষের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ওটা।
এটা হচ্ছে হায়না, বললেন ব্যালড্রিক। অফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহৎ মাংসাশী প্রাণী। বড়সড় বুনো যাড়কে একাই কাবু করার ক্ষমতা রাখে।
ভ্রু কুঁচকালো গ্রে। মনিটরে থাকা দানবটি কোনো সাধারণ হায়না নয়। সাধারণ হায়নার চেয়ে এর আকার প্রায় ৩ থেকে ৪ গুণ বড়। লোমগুলোও অনেক বেশি ফ্যাকাসে। আকারে বিশাল ও গায়ের রঙ সাদাটে; দুটোর সম্মিলিত রূপান্তর। দানবীয় মিউটেশন।
