রুমের দরজা খুলে গেল। ব্রিটিশ অপারেটিভ এসেছে বোধহয়। তাকে দেখার জন্য ঘুরল লিসা, কিন্তু অবাক হলো। ও মনে মনে ভেবেছিল জেমস বন্ডের মতো ক্লিন সেভ করা, আরমানি স্যুট পরিহিত কেউ আসবে। কিন্তু রুমে যে ঢুকল সে একজন মধ্যবয়স্কা নারী। পরনে খাকি সাফারি স্যুট। তার এক হাতে হ্যাট দেখা যাচ্ছে। লাল ধুলোয় তার চেহারা পুরোটা মাখামাখি হয়েছে। তবে নাকের কিছু অংশে ধুলো লাগেনি। সম্ভবত ওখানে চশমা রাখা ছিল।
আমি ড. পলা কেইন, বললেন তিনি। মেজর ব্রুকসের দিকে একবার মাথা নেড়ে লিসা ও পেইন্টারের দিকে এগোলেন।বোঝাপড়া করার মতো যথেষ্ট সময় আমাদের হাতে নেই।
***
টেবিলের ওপর ঝুঁকে আছে ক্রো। অনেক স্যাটেলাইট ফটো টেবিল জুড়ে বিছানা রয়েছে। কতদিন আগের ছবি এগুলো? প্রশ্ন করল ও।
গতকাল সন্ধ্যার দিকে ভোলা, পলা কেইন জবাব দিলেন।
পলা কেইন ইতোমধ্যে এখানে তার ভূমিকার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। জীববিজ্ঞান নিয়ে পিএইচডি করার পর ব্রিটিশ ইন্টেলিজেলে যোগ দিয়ে সাউথ আফ্রিকায় আসেন তিনি। বান্ধবী মারসিয়াকে সাথে নিয়ে একাধিক রিসার্চ প্রজেক্ট করতে করতে গোপনে ওয়ালেনবার্গ এস্টেটের ওপর বিগত দশ বছর যাবত নজর রেখে আসছিলেন। কিন্তু দুই দিন আগে একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেছে। অদ্ভুতভাবে তার বান্ধবী মারা গেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে সিংহের আক্রমণে মৃত্যু। কিন্তু পলা এই ব্যাখ্যায় সদুষ্ট নন।
মাঝরাতের পর ইনফ্রারেড-এ কিছু একটা পার হয়েছিল, বললেন পলা, কিন্তু যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে আমরা ছবিটা পাইনি।
বিশাল এস্টেটের নকশার দিকে তাকিয়ে রয়েছে পেইন্টার। প্রায় এক লাখ একর নিয়ে এই এস্টেট! প্লেন ওঠানামার জন্য জঙ্গলের মাঝে ছোট একটা ল্যান্ডিং ট্রিপও আছে। জঙ্গলের একদম মধ্যে ওয়ালেনবার্গদের মূল ভবন অবস্থিত। শুধু ভবন বললে ভুল বলা হবে। পাথর ও কাঠ দিয়ে বানানো এক অট্টালিকা ওটা।
ভবনের আশপাশ দেখার জন্য এরচেয়ে আর কোনো ভাল উপায় নেই?
মাথা নাড়লেন পলা। ওই এলাকাটা হচ্ছে আফনোমন্টেইন ফরেস্ট, প্রাচীন জঙ্গল। সাউথ আফ্রিকায় এরকম জঙ্গল খুব কমই আছে। নিজেদের সুবিধের জন্য ওয়ালেনবার্গরা এস্টেটের তৈরির ক্ষেত্রে এরকম জায়গা বেছে নিয়েছে। তাদের এস্টেটের সুরক্ষায় বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে এই সুবিশাল জঙ্গল। ওখানকার গাছগুলোর উচ্চতা ৪০ মিটার, ডালপালার স্তরে ভরপুর, অনেকটা সামিয়ানার মতো অবস্থা। যেকোনো রেইন ফরেস্ট কিংবা কঙ্গো জঙ্গলের চেয়ে ওটার ঘনত্ব ও বৈচিত্র্য অনেক বেশি।
এবং গা ঢাকা দেয়ার জন্যও এই জঙ্গল খুবই কার্যকরী, বলল ক্রো।
জঙ্গলের সামিয়ানার নিচে কী হচ্ছে সেটা একমাত্র ওয়ালেনবার্গরা ছাড়া আর কেউ জানে না। তবে আমরা এটুকু জানি, মূল ভবনটা হলো পাহাড়ের চূড়োর মতো ছোট। ভূগর্ভস্থ বিশাল কমপ্লেক্স আছে এস্টেটের নিচে।
কতখানি গভীর? পেইন্টার প্রশ্ন করল। তাকাল লিসার দিকে। যদি ওয়ালেনবার্গরা এখানে বেল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকে তাহলে নিশ্চয়ই ওটাকে মাটির নিচে রাখতে চাইবে।
আমরা জানি না। নিশ্চিতভাবে কিছুই বলা সম্ভব নয়। তবে হ্যাঁ, ওয়ালেনবার্গরা সোনার খনিতে কাজ করে এত বিত্তের অধিকারী হয়েছে।
উইটওয়াটারসর্যান্ড রিফ-এ।
ওর দিকে তাকালেন পলা। একদম ঠিক। হোমওয়ার্ক বেশ ভালভাবে সেরে এসেছেন দেখছি। আবার স্যাটেলাইট ফটোগুলোর দিকে ফিরলেন তিনি। খনিতে যেধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞদের দিয়ে কাজ করানো হয় তাদেরকে দিয়েই ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্সেও কাজ করিয়ে নেয়া হয়েছিল। আমরা জেনেছি, খনি ইঞ্জিনিয়ার, বার্টর্যান্ড কালবার্টকে ভবনের ফাউন্ডেশনের কাজে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তখন। যদিও কিছু দিন পরই তিনি মারা যান।
আন্দাজ করছি… উনি রহস্যময় কোনো ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন।
একটা মোষ তাকে মাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ওয়ালেনবার্গদের কাজ করতে এসে শুধু তিনিই মারা যাননি। পলা কেইনের চোখে বেদনার ছাপ ফুটে উঠছে, বান্ধবীর কথা মনে পড়ে গেছে নিশ্চয়ই। গুজব আছে এখান থেকে আরও অনেক লোক গায়েব হয়েছিল।
এখনও পর্যন্ত এস্টেটের বিরুদ্ধে কোনো সার্চ ওয়ারেন্ট পাওয়া যায়নি?
আপনাকে সাউথ আফ্রিকার রাজনীতির হালচাল বুঝতে হবে। সরকার বদল হতে পারে কিন্তু সোনার কোনো হেরফের হয় না। সোনা যার মুল্লুক তার। ওয়ালেনবার্গরা সবসময় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। গভীর পরিখা কিংবা ব্যক্তিগত সেনাবাহিনীর চেয়ে সোনা তাদেরকে বেশি নিরাপত্তা দেয়।
আচ্ছা। তো আপনার কী খবর? জানতে চাইল ক্রো। এমআই-৫ এখানে কেন আগ্রহী হলো?
আমাদের আগ্রহের কারণ অনেক পুরোনো। ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স ওয়ালেনবার্গদের ওপর ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নজর রেখে আসছে।
নিজের চেয়ারে বসে পড়ল ক্রো, ক্লান্ত। ওর এক চোখ ঠিকভাবে কাজ করছে না। চোখ ডলল ও। খুব ভাল করেই জানে লিসা ওকে পর্যবেক্ষণ করছে। তাই চোখ ডলা বাদ দিয়ে পলার দিকে মনোযোগ দিল পেইন্টার ওয়ালেনবার্গদের পারিবারিক প্রতীকে নাৎসিদের চিহ্ন দেয়া আছে এটা ও এখনও বলেনি। কিন্তু নাৎসিদের সাথে ওয়ালেনবার্গদের যোগসূত্রের বিষয়টা এমআই-৫ ইতোমধ্যে বুঝতে পেরেছে।
