তিনি মাথা নাড়তেই ইসাক একটা বাটনে চাপ দিলো। নতুন একটা ছবি চলে এলো মনিটরের একপাশে।
ভয়ে চোখ বড় বড় হয়ে গেল গ্রের।
ব্যালড্রিক বললেন, আমরা আপনার এক সাথীর কথা জানতে চাই। তার আগে বলে রাখি, কোনোপ্রকার ছল-চাতুরি আর কাজ করবে না। আশা করি ইতোমধ্যে সেটা বুঝতে পেরেছেন। নাকি আরেকটা নমুনা দেখাব?
মনিটরের দিকে চোখ রেখেই গ্রে প্রশ্ন করল, কে? কার কথা জানতে চান আপনি?
আপনার বস। পেইন্টার ক্রো।
১২. উকুফা
১২. উকুফা
সকাল ৬টা ১৯ মিনিট।
রিচার্ডর্স বে, সাউথ আফ্রিকা।
ব্রিটিশ টেলিকম ইন্টারন্যাশনালের স্থানীয় অফিসে সিঁড়ির ধাপ দিয়ে উঠতে গিয়ে লিসা খেয়াল করল পেইন্টারের পা কাঁপছে। এখানকার একজন ব্রিটিশ অপারেটিভের সাথে দেখা করতে এসেছে ওরা। ওয়ালেনবার্গ এস্টেটে কোনো আক্রমণ করার প্রয়োজন পড়লে এই ব্রিটিশ অপারেটিভ প্রয়োজনীয় সহায়তা করবে। রিচার্ডস বে এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সিতে করে এই ফার্মে আসতে খুব একটা সময় লাগে না। এখান থেকে ওয়ালেনবার্গ এস্টেট ১ ঘণ্টার পথ।
শক্ত করে সিঁড়ির রেলিং ধরল ক্রো। আর্দ্র হাতের ছাপ পড়ল রেলিঙের উপর। সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছুনোর সময় ওর কনুই ধরে সাহায্য করল লিসা।
লাগবে না, পেইন্টার ক্রো তীক্ষ্ণ কণ্ঠে আপত্তি করল।
লিসা অবশ্য ওর রাগকে পাত্তা দিল না। ও ভাল করেই জানে, দুশ্চিন্তার কারণে ক্রোর মেজাজ এখন একটু খারাপ আছে। তার ওপর বেচারা অসুখে আক্রান্ত। আফিমের নেশায় আসক্ত ব্যক্তির মতো খোঁড়াতে খোঁড়াতে অফিসের দরজার দিকে এগোল ক্রো। লিসা ভেবেছিল প্লেনে বিশ্রাম শেষে নামার পর পেইন্টারের স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে। কিন্তু কীসের কী, দিনের প্রায় অর্ধেক সময় প্লেনে চড়ে আকাশে ছিল ওরা, উন্নতি তত দূরে থাক উল্টো আরও দুর্বল হয়ে গেছে। অ্যানার কথা সত্য হয়ে থাকলে… বিকেন্দ্রীকরণ আরও বেড়েছে ওর।
অ্যানা আর তার ভাই গানথারকে এয়ারপোর্টে গার্ডের তত্ত্বাবধানে রেখে এসেছে ওরা। নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে ভেবে ওদের আনা হয়নি, বিষয়টা তেমন নয়। শেষ কয়েকঘন্টা প্লেনের বাথরুমে বমি করতে করতে আনা অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই তাঁকে আর গানথারকে সাথে করে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। লিসা আর ক্রো যখন রওনা হচ্ছিল, গানথার তার বোনকে কাউচে শুইয়ে দিচ্ছিল তখন। অ্যানার কপালে জলপট্টি দেয়া। বেচারির বাম চোখ টকটকে লাল। বিতৃষ্ণাবোধ লাঘব করার জন্য তাঁকে লিসা অ্যান্টিমেটিক দিয়েছিল, তার সাথে অল্প একটু মরফিন।
মুখে কিছু না বললেও লিসা মনে মনে আন্দাজ করল স্বাস্থ্যের চরম অবনতি হওয়ার আগে এটাই ক্রো আর অ্যানার সর্বশেষ ভাল দিন। এরপর হয়তো এদের স্বাস্থ্যের এমন অবনতি হবে, তখন চিকিৎসা করেও হয়তো আর উন্নতি করা সম্ভব হবে না।
ওদের দুজনের সামনে এগোচ্ছে মেজর ব্রুকস। লিসা ও পেইন্টারের জন্য দরজা খুলে দিল সে। নিচের রাস্তায় সতর্ক নজর রেখেছে, যদিও সকালের এসময়ে খুব একটা মানুষের আনাগোনা নেই।
নিজের খোঁড়ানো ভঙ্গিকে যতটুকু সম্ভব সুকোনোর চেষ্টা করল পেইন্টার ক্রো, কিন্তু পুরোপুরি আড়াল করতে পারল না।
ওর পিছু পিছু এগোল লিসা। কয়েক মিনিটের মধ্যে ওরা রিসিপশন এরিয়া পেরিয়ে অফিস ও কিউবিকলের ধূসর সারি পেরিয়ে একটা কনফারেন্স রুমে পৌঁছুল।
রুমটা খালি। এর জানালাগুলো দিয়ে রিচার্ডস বে-এর উপহ্রদ দেখা যাচ্ছে। উত্তরে আছে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত ক্রেনের পোর্ট আর কনটেইনার জাহাজ। দক্ষিণে দেয়াল তুলে মূল হ্রদ থেকে এক অংশকে বিচ্ছিন্ন করে সংরক্ষিত এলাকা ও পার্ক তৈরি করা হয়েছে। ওখানে কুমীর, হাওর, জলহস্তী, পেলিকান, কোমর্যান্ট এবং কলহংসদের অভয়ারণ্য।
সকালের সূর্য হ্রদের পানিকে অগ্নিময় আয়নায় পরিণত করেছে।
ওদের অপেক্ষা করার সময়টুকুতে টেবিলে চা আর কেক চলে এলো। দেরি না করে বসে পড়ল ক্রো। লিসাও যোগ দিলো ওর সাথে। তবে মেজর ব্রুকস বসল না। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল সে।
লিসা কিছু জিজ্ঞেস করেনি, তারপরও পেইন্টার ওর চেহারা দেখে কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরে বলল, আমি ঠিক আছি।
না, তুমি ঠিক নেই, নরম স্বরে আপত্তি তুলল লিসা। এই ফাঁকা রুম দেখে ওর কেমন যেন ভয় ভয় করছে।
লিসার দিকে তাকিয়ে হাসল পেইন্টার, ওর চোখ চকচক করছে। শারীরিকভাবে অবনতি হলেও মানসিকভাবে যথেষ্ট ভাল আছে ক্রো। তবে লিসা খেয়াল করে দেখল, ওর কথাগুলো একটু জড়িয়ে যাচ্ছে, একটু অস্পষ্ট। ওষুধের কারণে এরকমটা হতে পারে। কিন্তু এরপর যদি ওর মানসিক বিকৃতি ঘটে। ক্রো আর কতক্ষণ টিকবে?
টেবিলের নিচ দিয়ে হাত বাড়িয়ে ক্রোর দিকে হাত বাড়াল লিসা।
পেইন্টার ওর হাত ধরল।
লিসা চায় না পেইন্টারের কিছু হয়ে যাক। পেইন্টারের প্রতি আবেগ দেখে নিজেই অভিভূত হয়ে গেল লিসা। ক্রোকে ও এখনও সেভাবে চেনে না, তারপরও এত আবেগ। ওর সম্পর্কে আরও জানতে চায় লিসা। ওর পছন্দের খাবার, পছন্দের কৌতুক, ওর নাচের ধরন, রাতে ফিসফিস করে গুড নাইট জানানোর সময় কীভাবে জানায়… লিসা এসব জানতে চায়। আর তাই ও পেইন্টারকে হারাতে চায় না।
পেইন্টারের হাত শক্ত করে ধরল ও, যেন এভাবে ধরে রাখলে ওকে আটকে রাখতে পারবে।
