গাছটিকে দেখে মনে হলো এর বয়স অনেক বেশি, মুচড়ে গেছে, তামার তার গাছের শরীরে জড়ানো। তবে ফুলের কোনো কমতি নেই। প্রত্যেকটি ডালে, শাখা প্রশাখায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ফুল ফুটে আছে। একদম সাজানো গোছানো ঠিকঠাকভাবে ফুটেছে ওগুলো।
গাছের বয়স ২২০ বছর, বললেন ভদ্রলোক। শুধু ভদ্রলোক বললে ভুল বলা হবে। বলা উচিত বয়স্ক ভদ্রলোক। সম্রাট হিরোহিতো নিজ হাতে ১৯৪১ সালে গাছটা আমাকে দিয়ে ছিলেন। আমার হাতে যখন আসে তখনই গাছটার বয়স অনেক ছিল।
হাতের যন্ত্রপাতি রেখে এদিকে ঘুরলেন তিনি। তার পরনে সাদা অ্যাপ্রোন আছে। অ্যাপোনের নিচে আছে নেভি স্যুট আর লাল টাই। নাতির দিকে এক হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি। ইসাক, tevreden…।
দ্রুত এগিয়ে এসে দাদার হাত ধরে দ্বিতীয় তাক থেকে নামল সে। খুশি হয়ে তিনি নাতির কাঁধ চাপড়ে দিলেন। অ্যাপ্রোন খুলে কালো রঙের একটি ছড়ি নিয়ে তাতে বেশ ভাল করে চাপ দিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। গ্রে খেয়াল করে দেখল সেই সিলমোহর ছড়ির রুপোলি ক্রাউনের ওপরে শোভা পাচ্ছে। এই একই প্রতীক যমজ ভাই-বোন ইসাক ও ইসকির হাতেও আছে।
আমি স্যার ব্যালড্রিক ওয়ালেনবার্গ, গ্রে ও মনকের দিকে তাকিয়ে নরমস্বরে বললেন তিনি। আপনারা যদি ভেতরের রুমে আসেন তাহলে আরও অনেক কথা বলতে পারব।
সোলারিয়ামের পেছনের দিকে এগোলেন তিনি।
এই বয়স্ক বৃদ্ধ লোকটির বয়স প্রায় নব্বই ছুঁই ছুঁই করছে। তবে তাঁর হাতে ছড়ি থাকলে শক্ত-পোক্ত মানুষ বলেই মনে হতো। তার মাথায় এখনও রুপোলি-সাদা রঙের ঘন চুল আছে। চুলগুলোর মাঝখানে সিঁথি করেছেন। চুলগুলো কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছেছে। গলার রুপোলি চেইন থেকে একটি চশমা ঝুলছে। চশমার একটি লেন্স দেখতে অন্যরকম। জহুরিদের চোখে যেরকম ম্যাগনিফাইং (ছোট বস্তুকে বড় করে দেখা) গ্লাস থাকে, ওটা দেখতে অনেকটা ওরকম।
স্লেট পাথরের মেঝের ওপর দিয়ে এগোতে এগোতে গ্রে লক্ষ্য করল, কনজারভেটরিকে বিভিন্ন সেকশনে সাজানো হয়েছে। বনসাই গাছ, ঝোঁপ, ফার্ন বাগান এবং সর্বশেষ সেকশন যেখানে অর্কিডে ভরপুর।
ভদ্রলোক গ্রের আগ্রহ দেখে বললেন, আমি বিগত ৬০ বছর ধরে ফুলের চাষ করছি। লম্বা একটি ফুল গাছের সামনে একটু থামলেন তিনি। ওতে রক্তবর্ণের ফুল ফুটেছে। একদম টকটকে রংটা।
খুউব সুন্দর! বলল মনক। আদতে প্রশংসা মনে হলেও তাতে স্পষ্ট খোঁচা আছে।
ইসাক তাকাল মনকের দিকে।
বৃদ্ধ লোকটির অবশ্য এদিকে খেয়াল নেই। তবে আমি এখনও ব্ল্যাক অর্কিড চাষ করতে পারিনি। দ্য হলি গ্রেইল অফ অর্কিড ব্রিডিং। প্রায় সফল হয়েই যাচ্ছিলাম কিন্তু এখানে বিবর্তন প্রক্রিয়ার ফলে হয় অর্কিডগুলো বাঁকা হয়ে যাচ্ছিল নাহয় রংটা কালোর বদলে কেমন যেন রক্তবর্ণের হচ্ছিল।
আনমনে চশমার চেইনে হাত বুলোচ্ছিল ভদ্রলোক।
জঙ্গলের উন্মুক্ত পরিবেশ আর এই কাঁচঘেরা হটহাউজের মধ্যেকার পার্থক্যটা এবার গ্রে বুঝতে পারল। এখানে বাইরের প্রাকৃতিক জিনিসকে আপন করে উপভোগ করা হয় না। প্রাকৃতিক সম্পদকে আরও উন্নতি করা হয় এখানে। মানুষ এখানে প্রকৃতির ওপর মাতব্বরি করে নিজ হাতে রংচং করে।
সোলারিয়ামের পেছন দিকে এসেছে ওরা। রং দেয়া একটি কাঁচের দরজা পার হয়ে রত্তন ও মেহগনি গাছের কাঠ দিয়ে নির্মিত বসার জায়গায় এসে পৌঁছুল। এ অংশে একটি স্যালুন আছে। অপরপ্রান্তে রয়েছে দুটো সুইং ডোর। দরজা দুটো দিয়ে ভবনের ভেতরে যাওয়া যাবে।
একটি উইংব্যাক চেয়ারে বসলেন ব্যালড্রিক ওয়ালেনবার্গ। একটা ডেস্কের ওপর এইচপি কম্পিউটার ও এলসিডি মনিটর লাগানো আছে। ডেস্ক পার হলো ইসাক। মনিটরের পাশেই আছে ব্ল্যাকবোর্ড। বোর্ডে কয়েকটা প্রতীক আঁকা আছে। গ্রে দেখল শেষ প্রতীকটি ডারউইন বাইবেলের সেই Mensch বর্ণ।
প্রতীকগুলো শুনে নিয়ে মুখস্থ করল গ্রে। ৫টা প্রতীক, তার মানে ৫টা বই।
হিউগো হিরজফিল্ডের বইয়ের সেট থেকে বর্ণগুলো তাহলে পাওয়া গেল। কিন্তু অর্থ কী এগুলোর কী সেই গোপন বিষয় যেটা একই সাথে সুন্দর আবার দানবীয়?
বৃদ্ধ লোকটি নিজের কোলের ওপর হাত রেখে ইসাকের দিকে মাথা নেড়ে ইশারা। করলেন।
ইসাক একটা বাটন চাপতেই এলসিডি মনিটরে একটি এইচডি ছবি ভেসে উঠল।
লম্বা একটা খাঁচা জঙ্গলের ভেতরে ঝুলছে। খাঁচাটি দুই অংশে বিভক্ত। একটি করে ছোট অবয়ব দেখা যাচ্ছে দুটো অংশে।
সামনে এগোতে গেল গ্রে কিন্তু গার্ড রাইফেল তাক করে ওকে থামিয়ে দিলো। মনিটরে দেখা যাচ্ছে, একটা অবয়ব ওপরের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মুখ চকচক করছে স্পটলাইটের আলোতে।
ফিওনা।
খাঁচার অন্য অংশে আছে রায়ান। ফিওনার বাম হাতে ব্যান্ডেজ করা, হাত প্যাচিয়ে রেখেছে শার্ট দিয়ে। শার্ট কালচে হয়ে গেছে। অন্যদিকে ডান হাত নিচের বগলের নিচে চাপ দিয়ে রেখেছে রায়ান। ওদেরকেই আগে রক্তে রঞ্জিত করা হোক। হারামজাদাগুলো নিশ্চয়ই ওদের দুজনের হাত কেটে দিয়েছে। গ্রে মনে মনে প্রার্থনা করল, এতটুকুই যেন হয়। এরচেয়ে জঘন্য যেন না হয়। বুকের ভেতরে প্রচণ্ড ক্রোধ অনুভব করল গ্রে। ওর হৃদয় কেঁপে উঠলেও দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে গেল।
দাঁত বের করে হাসল বৃদ্ধ। এবার আমরা কথা বলব, ঠিক আছে? একদম ভদ্রলোকের মতো।
বৃদ্ধের দিকে ঘুরল গ্রে কিন্তু মনিটরের দিকেও নজর রাখল। তা বেশি হয়ে যাচ্ছে। কী জানতে চান? ঠাণ্ডা স্বরে বলল ও।
