কিং কোবরা।
একজন সাদা চামড়াধারী একটা নলখাগড়া ভেঙ্গে এনে ওটাকে বিড়ালের মতো তাড়িয়ে দিল। ফণা তুলে হিসহিস করে প্রতিবাদ জানালেও ব্রিজ থেকে নেমে কালো পানিতে ডুব দিল কিং কোবরা।
এখানকার নির্মাণশৈলির আরেকটা ব্যতিক্রমী দিক ওর চোখে পড়েছে। ভবনের ওপর তলা থেকে জঙ্গলের ওপর দিয়ে পথ চলে গেছে। কাঠের তৈরি পথ ওটা, ওখানেও আলোর ব্যবস্থা আছে। ভবনে আগত অতিথিগণ যাতে ওপর থেকে জঙ্গলের দৃশ্য উপভোগ করতে পারে তাই এই ব্যবস্থা।
মাথা বাড়লো, মাথা দিয়ে বাম দিক দেখিয়ে বিড়বিড় করল মনক। কাঁধে রাইফেল নিয়ে হেলে দুলে একজন গার্ড জঙ্গলের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে। যেহেতু একজন আসছে, তার মানে জঙ্গলের ভেতরে এরকম আরও গার্ড আছে। পালিয়ে পার পাবার সম্ভাবনা কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় চলে আসছে এখন।
অবশেষে ওরা যখন ম্যানর ভবনের কাছে গিয়ে যখন পৌঁছুল তখন দেখল সামনে একজন নারী দাঁড়িয়ে আছে। নিলাম অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া সেই ক্রেতার যমজ বোন। লোকটি এগিয়ে গিয়ে বোনের দুই গালে চুমো খেল।
ডাচ ভাষায় বোনের সাথে কথা শুরু করল সে। ভাষাটা সে এখনও অত ভালভাবে রপ্ত করতে পারেনি। তার আমতা আমতা করার ধরন দেখে গ্রে বিষয়টা বুঝে ফেলল।
ইসকি, বাকিরা তৈরি তো? জিজ্ঞেস করল সে।
হ্যাঁ, আমরা grootvader-এর জন্য অপেক্ষা করছি। মাথা নেড়ে সেই আলো বিচ্ছুরিত হওয়া কাঁচের কনজারভেটরি দেখাল বোন। তারপর শিকার শুরু হবে।
এই কথার মানে উদ্ধার করার চেষ্টা করল গ্রে। কিন্তু পারল না।
বড় করে শ্বাস নিয়ে লোকটি ওদের দিকে ফিরল। আঙুল চালিয়ে মাথার চুলগুলো ঠিক করে বলল, সোলারিয়ামে আমার দাদু আপনাদের সাথে দেখা করবেন। আপনারা তার সাথে ভদ্রভাবে সম্মান দিয়ে কথা বলবেন। আর যদি সেটা না করবেন প্রত্যেকটা বেয়াদবিমূলক শব্দের শাস্তি আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনাদেরকে পরিশোধ করব।
ইসাক…ভাইকে ডাকল ইসকি।
ঘুরল সে। বলো…
আবার ডাচ ভাষা ব্যবহার করল ইসকি। De jongen en net meisje? ওদেরকে কী এখন বের করব?
মাথা নেড়ে সায় দিল ইসাক। ডাচ ভাষায় কী যেন বলল।
কথা শেষে ভবনের ভেতরে চলে গেল ইসকি।
ইসকির বলা বাক্যটি অনুবাদ করল গ্রে।
De jongen en net meisje.
অর্থাৎ, ছেলেটা আর মেয়েটা।
রায়ান ও ফিওনার কথা বলেছে।
ওরা দুজন এখনও বেঁচে আছে তাহলে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাচ্ছিল গ্রে। কিন্তু ইসাকের বলা শেষ বাক্যটি ওর স্বস্তি কেড়ে নিয়ে ভয় ধরিয়ে দিলো।
ওদেরকেই আগে রক্তে রঞ্জিত করা হোক।
.
ভোর ৫টা ১৮ মিনিট।
উড়োজাহাজে, আফ্রিকার ওপর।
হাতে একটি কলম নিয়ে বসে আছে পেইন্টার ক্রো। প্লেনের ভেতর একমাত্র গানরের নাক একটু পর পর ডেকে যাচ্ছে। ওরা যে জায়গার উদ্দেশ্যে উড়াল দিয়েছে সেখানে এই ব্যক্তি একটি হুমকিস্বরূপ। তবে অ্যানা ও পেইন্টারের মতো গানরের আয়ু অত দ্রুত ফুরাচ্ছে না। যদিও ওদের তিনজনের শেষ পরিণতি একই… তবে অসুখটা… বিকেন্দ্রীকরণ… গানথারকে তুলনামূলক ধীরে ধীরে কাবু করছে। ভুক্তভোগী হিসেবে সামনের কাতারে আছে অ্যানা ও পেইন্টারের নাম।
ঘুমোতে না পেরে পেইন্টার এই সময়টুকু ওয়ালেনবার্গ পরিবার রিভিউ করে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলো। এই পরিবার সম্পর্কে যত জেনে নেয়া যায় তত ভাল।
শত্রু সম্পর্কে জ্ঞান থাকা উচিত।
সময়টা ১৬১৭ সাল, আলজিয়ারস-এর পথ হয়ে ওয়ালেনবার্গরা প্রথমবারের মতো আফ্রিকা এসেছিল। তাদের বংশের শেকড় রয়েছে কুখ্যাত বারবেরি দলদস্যুদের ভেতর এবং এটা নিয়ে তারা গর্বও করে। ওয়ালেনবার্গ বংশের প্রথম পুরুষের নাম তিনি একটি পুরো ডাচ ফ্লিট (এক দল জাহাজ)-এর ভারপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বলাই বাহুল্য সেই ফ্লিটটা জলদস্যুদের ফ্লিট ছিল।
ধীরে ধীরে পয়সার মালিক হওয়ার পর তারা দক্ষিণের কেইপ প্রদেশে চলে এলো। তবে এখানে এসেও তাদের লুটপাট থামলো না, চেহারা পরিবর্তন করল মাত্র। ডাচ অভিবাসীদেরকে নিয়ে শক্ত দল তৈরি করেছিল তারা। খনি থেকে তোলা সোনার মূল দায়িত্বে ছিল ওয়ালেনবার্গরা। আর ডাচরা খনিতে কাজ করতো। খনি থেকে ভোলা সোনার পরিমাণ নেহাত কম ছিল না। সেসব দিয়ে ওয়ালেনবার্গরা ফুলে ফেঁপে উঠল। জোহানবার্গের উইটওয়াটারসর্যান্ড রিফ নামের পাহাড়ি এলাকা থেকে পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ সোনা উত্তোলন করা হয়েছিল। তবে De Beerses-এর মতো বিখ্যাত হীরার খনি না হলেও এখনও পর্যন্ত রিফ পৃথিবীর অন্যতম মূল্যবান এলাকা হিসেবে পরিচিত।
প্রচুর সম্পত্তির ওপর ভর করে ওয়ালেনবার্গরা প্রথম ও দ্বিতীয় বোয়ার যুদ্ধকে ছাপিয়ে একটি রাজবংশ চালু করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র করে তারাই দক্ষিণ আফ্রিকার জন্ম দিয়েছিল। এখানকার ইতিহাসের সবচেয়ে বিশাল ধনী ছিল এই ওয়ালেনবার্গরা। তারপর থেকে এরা নানান পৃষ্ঠপোষকতায় নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করতে শুরু করল। এদের সেই জীবনের হাতেখড়ি হয়েছিল স্যার ব্যালড্রিক ওয়ালেনবার্গের মাধ্যমে। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন গুজব ছড়াতে লাগল তাদের নামে। নৃশংসতা, অন্যায়, মাদকাসক্ত, আন্তর্জনন ইত্যাদি। তবে গুজব তাদের আর্থিক ক্ষতি করতে পারল না। হীরা, দেল, পেট্রোকেমিক্যাল, ফার্মাসিউটিক্যাল… বিভিন্ন দিক থেকে উপার্জিত অর্থ ওয়ালেনবার্গদেরকে আরও বিত্তশালী করে তুলল। বহুজাতিক ব্যবসাকে বহুগুণ বড় করেছিল এরা।
