কথাটির সত্যতা নিশ্চিত করতে হলের শেষ প্রান্তের দরজা দড়াম করে খুলে গেল।
তাদের দেখা যাচ্ছে না তবে পায়ের শব্দ শুনে বোঝা যাচ্ছে অনেকজন আসছে। দৃষ্টি সীমার ভেতরে আসার পর দেখা গেল; কালো-সবুজ ইউনিফর্ম পরিহিত একদল গার্ড এগিয়ে আসছে। একজন ফ্যাকাসে সাদা চামড়ার ব্যক্তি তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে। নিলাম অনুষ্ঠানের সেই ক্রেতা। বরাবরের মতো আজও তার পোশাক পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি। কালো টুইল প্যান্ট আর লিলেন শার্টের সাথে কলারবিহীন আস্তি নঅলা স্যুট রয়েছে পরনে। দেখে মনে হচ্ছে সে কোনো গার্ডেন পার্টিতে যোগ দিতে যাচ্ছে।
দশ জন গার্ড আছে তার সাথে। দুই দলে বিভক্ত হয়ে দুটো সেলের দিকে এগোল তারা। নগ্ন পায়ে গ্রে ও মনককে সেল থেকে বের করে আনা হলো। দুজনের হাত প্লাস্টিক স্ট্র্যাপ দিয়ে পেছন মুড়ে বাধা হয়েছে।
নেতা ওদের সামনে এসে দাঁড়াল।
নীল চোখ দিয়ে বরফ শীতল দৃষ্টি ফেলল গ্রের ওপর।
গুড মর্নিং, কৃত্রিম ভদ্রতা দেখিয়ে বলল সে। এই হলে ক্যামেরা লাগানো আছে বলে হয়তো নিজের আচরণ সংযত রাখল। আমার দাদু আপনাদের সাথে দেখা করতে চেয়েছেন।
যতই ভদ্রতা দেখাক তার প্রত্যেক শব্দের পেছনে চাপা রাগ লুকিয়ে আছে। ছাই চাপা আগুনের মতো ঢেকে আছে সেটা। এই লোক তো ওদেরকে খুনই করে ফেলেছিল ক্যাসলে… কিন্তু বাধ্য হয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। আবার এখন বাড়তি সময়ও দিতে হচ্ছে। কিন্তু এর এত রাগের কারণ কী? তার ভাইয়ের মৃত্যু… নাকি ক্যাসলে গ্রের চালাকিটা সহ্য করতে পারছে না? তবে যা-ই হোক, এই ব্যক্তির সভ্য-ভব্য পোশাকের নিচে একটা পাশবিক, হিংস্র চরিত্র লুকিয়ে আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এদিকে আসুন, বলে গটগট করে সামনে এগোল সে।
তার পেছন পেছন এগোচ্ছে মনক ও গ্রে। সাথে গার্ডরা তো আছেই। সামনে এগোতে এগোতে দুপাশে থাকা সেলের দিকে তাকাল গ্রে। সব ফাঁকা। ফিওনা ও রায়ানের কোনো চিহ্ন নেই। ওরা কী এখনও বেঁচে আছে?
তিন ধাপ বিশিষ্ট সিঁড়ির কাছে গিয়ে হল শেষ হয়েছে। সামনে পুরু স্টিলের একটা বিশাল দরজা।
খোলা আছে, তবে গার্ডের পাহারায়।
বদ্ধ সেলব্লকের হল থেকে এবার কিছুটা অন্ধকার শ্যামল ভূমিতে পা রাখল ঘে। চারিদিকে জঙ্গলের সামিয়ানা টাঙ্গানো। চারিদিকে লতা-পাতা আর অর্কিড ফুলের সমাহার। গাছপালার পাতা এত ঘন যে আকাশ ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। তবে গ্রে আন্দাজ করল দিনের কেবল শুরু। হয়তো সূর্যও এখনও ওঠেনি। ভিক্টোরিয়া আমলের লোহার ল্যাম্পপোস্ট দেখা গেল সামনে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পথ দেখিয়ে চলেছে। পাখির কিচির-মিচির আর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে পোকাদের। উপরে গাছের ডালে লুকিয়ে থাকা এক বানর ওদেরকে দেখে চিৎকার করে ডাক ছাড়ল। তার চিৎকারে উজ্জ্বল রঙের এক ঝাঁক পাখি উড়ে গেল নিচু ডালপালার ভেতর দিয়ে।
আফ্রিকা, বিড়বিড় করে বলল মনক। অন্তত সাব-সাহারান তো হবে। বিষুব রেখা সংলগ্ন অঞ্চলও হতে পারে।
গ্রে একমত হলো। এটা হয়তো পরের দিন সকাল হবে। মাঝখান থেকে ১৮ কিংবা ২০ ঘণ্টা গায়েব হয়ে গেছে। এসময়ের মধ্যে তাদেরকে আফ্রিকার যে-কোনো অঞ্চলে নিয়ে আসা সম্ভব।
কিন্তু জায়গাটা আসলে কোথায়?
নুড়ি বিছানো পথ দিয়ে গার্ড ওদেরকে এগিয়ে নিয়ে চলল। গ্রে শুনতে পেল ওদের পথ থেকে কয়েক ফুট দূরে বড় গাছপালার নিচে থাকা ঝোঁপঝাড়ের ভেতর বড় কিছু একটা মেপে মেপে ঘোট পা ফেলে এগোচ্ছে। কিন্তু এত কাছে থাকা সত্তেও সেটার আকৃতি আন্দাজ করা সম্ভব হলো না। সেরকম কিছু হলে জঙ্গলের ভেতরে দৌড় দিতে হবে। জঙ্গলে অনেক আড়াল নেয়ার জায়গা আছে।
কিন্তু সেরকম কিছুই হলো না। ১৫০ ফুট এগোনোর পর জঙ্গলের রাস্তা শেষ হলো। আরও সামনে এগোতে জঙ্গল পেছনে পড়ে গেল ওদের।
জঙ্গল ছাড়িয়ে ওরা যেখানে এসে পড়ল সেটা একটা সাজানো গোছানো সবুজ অঞ্চল। বুনো জঙ্গল নয়। এখানে পানি খেলা করছে। পুকুর ও খাড়ি আছে। ঝরণাও আছে। ওদেরকে দেখে একটা হরিণ মাথা তুলে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য থেমে দৌড়ে বনের ভেতরে পালাল ওটা।
এখন ওপরের আকাশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। তাঁরা চমকাচ্ছে আকাশে। তবে পূর্ব দিকে তারাদের দেখা যাচ্ছে না। ওখানে নতুন দিনের নতুন সূর্য উদয় হওয়ার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। ভোর হতে আর প্রায় ১ ঘন্টা বাকি।
পাশে আরেকটা জিনিস দেখে গ্রের চোখ আটকে গেল।
বাগানের ওপাশে ছয় তলা বিশিষ্ট অট্টালিকা দেখা যাচ্ছে। বনের পাশে পাথুরে অট্টালিকা। ওটা দেখে ওর পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল। ইয়োসমিটে আহওহানি লজ ভেসে উঠল ওর মানসপটে। তবে এই অট্টালিকা ওটার চেয়েও বিশাল। দশ একর জায়গা নিয়ে এই অট্টালিকা দাঁড়িয়ে আছে। ঝুল-বারান্দা, বেলকুনি সবই আছে এতে। বাম পাশে কাঁচে ঘেরা একটা কনজারভেটরি দেখা যাচ্ছে। ওটার ভেতরে আলোর ব্যবস্থা থাকায় কাঁচ ভেদ করে বাইরে আলো আসছে এখন। আলো দেখে মনে হচ্ছে ওর ভেতরে ভোরের সূর্য ঢুকে আছে যেন।
অঢেল অর্থ-সম্পত্তি এখানে। পাথুরে পথের ওপর দিয়ে হেঁটে ম্যানর ভবনের দিকে এগোচ্ছে ওরা। পাথুরে পথটা ওয়াটার গার্ডেন আর কয়েকটি পুকুর ও খাড়িকে আলাদা করেছে। পাথুরে ব্রিজের ওপর দুই মিটার লম্বা একটা সাপকে দেখা গেল। এটা কী সেটা বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু যখন মাথা উঁচু করে ফণা তুলল তখনই বোঝা গেল সব।
