অ্যানা তার কপালে হাতের তালু ছোঁয়ালেন। আঙুল কাঁপছে। চোখ কচলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন তিনি। চেহারার অভিব্যক্তি মোটেও হাসি-খুশি নয়। তার কণ্ঠ এখন এতই নরম হয়ে গেছে যে প্রায় শোনাই যাচ্ছে না। আমি তো সেটা বলিনি। আপনি ভুল দিকে ভুলভাবে দৃষ্টি দিচ্ছেন।
লিসা এ নিয়ে আর কিছু বলল না। ও বুঝতে পারল অ্যানার পক্ষে আরও কথা চালিয়ে যাওয়া কষ্টকর হবে। ওদের সবাইকে আরও ঘুম দেয়া উচিত। কিন্তু আর একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতেই হচ্ছে।
বেল, এটার কাজ কী? বলল লিসা।
অ্যানা প্রথমে পেইন্টার ও পরে লিসার দিকে তাকালেন। বেল হচ্ছে সেই কোয়ান্টাম পরিমাপক যন্ত্র।
অ্যানা যা বললেন সেটা হজম করতে গিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল লিসা।
অ্যানার এরকম বিধ্বস্ত চেহারাতেও কী যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বোঝা কঠিন। গর্ব, বিশ্বাস, সাথে একটু ভয়।
বেল-এর ফিল্ড শুধু ডিএনএ-কে নিখুঁতই করে না তার সাথে মানবজাতিরও উন্নতি ঘটায়।
তাহলে আমাদের কী অবস্থা? বলল ক্রো। আপনি, আমি? আমাদেরকে কী এবং কীভাবে নিখুঁত করা হচ্ছে এখন?
এরকম আক্রমণাত্মক খোঁচা দেয়া প্রশ্ন শুনে অ্যানার চেহারা থেকে উজ্জ্বলতা চলে গেল। অন্য বিষয়গুলোর মতো এটাতে দ্বিমুখী সম্ভাব্যতা ছিল। একটা সামনের দিকে অন্যটা বিপরীত দিকে।
বিপরীত দিকে?
আমাদের কোষে যে রোগ আক্রমণ করেছে, বলতে বলতে অ্যানা অন্যদিকে তাকালেন। এটা শুধু অবনতিই নয়… এটা বিকেন্দ্রীকরণ। অর্থাৎ, বিবর্তনের বিপরীত।
হাঁ করে অ্যানার দিকে তাকিয়ে রইল পেইন্টার। অবাক হয়ে গেছে।
এরপর আনা যা বললেন তাতে সবার মাঝে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। আমাদের শরীর আবার সেই আদিকালের তরল অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে যেখান থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল।
.
ভোর ৫টা ০৫ মিনিট।
সাউথ আফ্রিকা।
বানরের শব্দ ওকে জাগিয়ে দিল।
বানর?
বানর এলো কোত্থেকে? বিস্ময়ের ধাক্কায় ঘুম ঘুম ভাব ছুটে গেল ওর। উঠে বসল গ্রে। ওর আশেপাশের পরিবেশ উপলব্ধি করে বুঝে উঠতে গিয়ে স্মৃতি জড়িয়ে গেল।
ও বেঁচে আছে।
একটি সেলের ভেতর।
বিষাক্ত গ্যাস, উইউইলসবার্গ মিউজিয়াম, মিথ্যে কথা… সব মনে পড়ে গেল ওর। ডারউইনের বাইবেল পুড়িয়ে দিয়েছিল, দাবি করেছিল ওটার ভেতরে থাকা গোপন তথ্য শুধু ওরাই জানে। ওর আশা ছিল ওতে কাজ হবে। দেখা যাচ্ছে, আসলেই কাজ হয়েছে। বেঁচে আছে ও। কিন্তু বাকিরা কোথায়? মনক, ফিওনা, রায়ান?
নিজের সেলে চোখ বুলালো গ্রে। ছিমছাম সেল। একটা খাট, টয়লেট আর গোসলখানা আছে এখানে। প্রায় ইঞ্চিখানেক পুরু লোহার বার আছে দরজায়। তবে কোনো জানালা নেই। সামনের হলওয়েতে ফ্লোরোসেন্ট লাইট জ্বলছে। এবার নিজের দিকে খেয়াল করল গ্রে। কে বা কারা যেন ওকে নগ্ন করে রেখেছে। তবে ভাঁজ করা এক সেট কাপড় রাখা আছে বিছানার কাছে থাকা একটি চেয়ারের ওপর।
কম্বল সরিয়ে উঠে দাঁড়াল গ্রে। পুরো দুনিয়া দুলে উঠল, তবে কয়েকবার শ্বাস নেয়ার পর থামল দুলুনি। বিতৃষ্ণা লাগছে। ভারি লাগছে ফুসফুসকে। বিষাক্ত গ্যাস এসবের জন্য দায়ী।
গ্রে খেয়াল করে দেখল ওর উরুতে খুব ব্যথা হচ্ছে। আঙুল বুলিয়ে বুঝল ওখানে সঁচ ফোঁটানো হয়েছে। বাঁ হাতে ব্যান্ড-এইড দেখতে পেল ও। বোঝা গেল, ওকে চিকিৎসা দিয়ে বাঁচিয়ে তোলা হয়েছে।
দূর থেকে আবার গর্জন ও চিৎকার ভেসে এলো।
বন্য বানর।
খাঁচার বানরের আওয়াজ এরকম নয়।
প্রাকৃতিক পরিবেশে থাকলেই এরকম আওয়াজ করা সম্ভব।
কিন্তু কোথায় আছে গ্রে? বাতাস বেশ শুকনো, উষ্ণ, কস্তুরির সুগন্ধও পাওয়া যাচ্ছে। গরম অঞ্চলে এসেছে ও। আফ্রিকার কোথাও হবে হয়তো। জ্ঞান হারানোর পর কত সময় পেরিয়েছে? ওর হাতে ওরা কোনো হাতঘড়ি রেখে যায়নি। তাহলে দিন-তারিখ বুঝতে পারতো। তবে গ্রে আন্দাজ করল, একদিনের বেশি পার হয়নি। দীর্ঘ সময় ঘুমালে ওর গালে দাগ বসে যেত। হাত বুলিয়ে দেখল এখন সেরকম কোনো দাগ নেই।
কাপড়গুলো নিলো গ্রে।
ওকে নড়তে দেখে কারও টনক নড়ল।
হলের ঠিক ওপাশে থাকা সেলের বার দেয়া দরজার কাছে এলে মনক। সঙ্গীকে জীবিত দেখে গ্রে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ… বিড়বিড় করল গ্রে।
তুমি ঠিক আছ?
আছি আরকি… তবে পরনে কিছু নেই।
মনক অবশ্য ইতোমধ্যে পোশাক পরে নিয়েছে। গ্রের জন্য রাখা পোশাক আর মনকের পোশাক একই। সাদা জাম্পস্যুট। গ্রে নিজের পোশাক পরতে শুরু করল।
নিজের বাম হাত উঁচু করে দেখাল মনক। বেজন্মগুলো আমার হাতটা পর্যন্ত খুলে নিয়ে গেছে। ওর বাম হাতে থাকা যান্ত্রিক অংশটুকু এখন নেই। মনকের হাত না থাকাটা খুব একটা দুশ্চিন্তার বিষয় নয়। হয়তো এটা ওদের জন্য সুবিধা হয়ে ধরা দিতে পারে। তবে আগের কাজ আগে…
ফিওনা আর রায়ান কোথায়?
বলতে পারছি না। হয়তো এখানেই কোনো সেলে আছে… কিংবা অন্য কোথাও নিয়ে গেছে।
কিংবা মারা গেছে, মনে মনে বলল গ্রে।
এবার কী হবে, বস? মনক জানতে চাইল।
কিছু করার নেই। যারা আমাদেরকে বন্দী করেছে তাদের পদক্ষেপ না নেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আমাদের কাছে যে তথ্য আছে সেটা ওদের দরকার। দেখি তথ্য বিক্রি করে আমরা কী লাভ করতে পারি।
মাথা নাড়ল মনক। ও খুব ভাল করেই জানে, ক্যাসলে গ্রে ধাপ্পা মেরেছে। কিন্তু মিথ্যা কথা বললে সেটা ঠিক-ঠাক চালিয়ে যাওয়া চাই। আর স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, এই সেলগুলোর ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
