এবার আমি আপনাদেরকে যা বলতে যাচ্ছি সেটাকে হয়তো সাধারণ বিচারবুদ্ধির সাথে সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। ধরুন, এই কাগজে আঁকা বাক্স দুটো হলো কনক্রিটের দেয়াল। আর যে দুটো ফাটল দেখতে পাচ্ছেন, ওগুলো হলো জানালা। এখন আপনি যদি বন্দুক দ্বারা এই জানালাগুলোর ভেতর দিয়ে গুলিবর্ষণ করেন তাহলে পেছনে থাকা। দেয়ালে কিছু দাগ দেখতে পাবেন। সেগুলো দেখতে অনেকটা এরকম হবে…
দ্বিতীয় কাগজটি নিয়ে তাতে অনেক ফুটকি আঁকলেন তিনি।
এটাকে ক প্যাটার্ন হিসেবে ধরে রাখুন। ফাটল কিংবা জানালা যা-ই বলুন না কেন কণিকা হিসেবে ব্যবহৃত গুলিগুলো এভাবেই দেয়ালে আঘাত করবে।
মাথা নাড়ল লিসা। বুঝলাম।
এবার গুলির বদলে আমরা যদি ফাটল দুটোর ভেতর দিয়ে বড় স্পটলাইট তাক করি তাহলে? গুলিকে কণিকা হিসেবে ধরেছি। এবার আলোকে তরঙ্গ হিসেবে ধরব। কারণ আমরা সবাই জানি, আলো তরঙ্গ আকারে ভ্রমণ করে। এক্ষেত্রে আমরা কিন্তু দেয়ালে ভিন্ন চিত্র দেখতে পাব।
নতুন একটা কাগজ নিয়ে তাতে হালকা আর গাঢ় কালো ছায়া আঁকলেন অ্যানা।
এরকম প্যাটার্ন হওয়ার কারণ : ডান ও বাম দুই ফাটল/জানালা দিয়ে প্রবেশ করা আলো একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল। এই প্যাটার্নকে খ হিসেবে ধরুন। তরঙ্গের ফলে এই প্যাটার্নের সৃষ্টি হয়েছে।
আচ্ছা, ধরলাম। বলল লিসা। কিন্তু আসলে কী হচ্ছে সেটার কিছুই বুঝতে পারছে না।
দুটো প্যাটার্নের কাগজ হাতে নিয়ে অ্যানা বললেন, এবার যদি আপনি একটা ইলেকট্রন গান হাতে নিয়ে ফাটল দুটোর ভেতর দিয়ে এক রেখায় ইলেকট্রন ছুঁড়তে থাকেন তাহলে কোন ধরনের প্যাটার্ন পাবেন?
ইলেকট্রনগুলোকে যদি বুলেটের মতো করে ছোঁড়া হয় তাহলে প্যাটার্ন ক–এর মতো পাব বলে মনে হচ্ছে। প্রথম ছবি দেখিয়ে লিসা বলল।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার সময় আপনি খ প্যাটার্ন পাবেন।
লিসাও বিষয়টা ভেবে দেখেছিল। আচ্ছা, তাহলে ইলেকট্রনকে যখন গান থেকে ছোঁড়া হয় তখন সেটা বুলেটের মতো হয়ে বেরোয় না, তরঙ্গ আগে বেরোয়। তরঙ্গ আকারে যাওয়ার ফলে সেটা খ প্যাটার্ন সৃষ্টি করে?
একদম ঠিক ধরেছেন।
তার মানে দাঁড়াচ্ছে… ইলেকট্রন তরঙ্গ আকারে ভ্রমণ করে।
হ্যাঁ। কিন্তু ফাটলের ভেতর দিয়েই যে ইলেকট্রনগুলো গেছে এটার ভো কোনো সাক্ষী নেই।
বুঝলাম না।
বোঝাচ্ছি। অন্য এক পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা একটা ফাটলের গায়ে ছোট্ট ক্লিকার বসিয়ে ছিলেন। ফাটলের ভেতর দিয়ে যখনই একটা ইলেকট্রন পার হলেই ক্লিকার সাথে সাথে বিপ করে উঠবে। ক্লিকারের মাধ্যমে ফাটলের ভেতর দিয়ে কতগুলো ইলেকট্রন পার হয়ে যাচ্ছে সেটার পরিমাপ করা সম্ভব। এবার বলুন, ওপাশের দেয়ালে কোন প্যাটার্ন পাওয়া গিয়েছিল?
প্যাটার্নের তো কোনো পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়, তাই না?
বাস্তব পৃথিবীতে আপনার কথা সত্য। কিন্তু এই সাবঅ্যাটমিক দুনিয়ায় নয়। ডিভাইস হিসেবে ব্যবহৃত ক্লিকারের সুইচ অন করার পর খ প্যাটার্ন বদলে ক হয়ে গিয়েছিল।
তাহলে পরিমাপ করতে যাওয়ার ফলে প্যাটার্নের এই পরিবর্তন হলো?
হেইজেনবার্গ যেমনটা বলেছিলেন। বিষয়টা অসম্ভব মনে হতে পারে। কিন্তু এটাই সত্য। বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। ইলেকট্রন কণিকা ও তরঙ্গ দুভাবে থাকতে পারে যতক্ষণ না ইলেকট্রনগুলোকে পরিমাপ করা হচ্ছে। ইলেকট্রনকে পরিমাপ করতে গেলে সেটা যে-কোনো এক অবস্থায় চলে যেতে বাধ্য হয়।
লিসা একটি সাবঅ্যাটমিক দুনিয়া কল্পনা করার চেষ্টা করল যেখানে সবকিছুই এরকম দ্বিমুখী সম্ভাবনাময়। উদ্ভট। কোনো মানেই হয় না।
আমরা জানি, পরমাণু দিয়ে অণুর জন্ম, বলল লিসা, তেমনি অণুর সমষ্টিতে গড়ে উঠেছে পুরো পৃথিবী। এখানে আমরা সবকিছু দেখি, জানি, অনুভব করি। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্সে যেরকম দুনিয়ার কথা বলা হচ্ছে সেটার সাথে আমাদের সত্যিকার পৃথিবীর মূল সীমারেখাটা কোথায়?
তার আগে আবারও বলি, দ্বিমুখী সম্ভাবনা বন্ধ করার একমাত্র উপায় হলো ইলেকট্রনকে পরিমাপ করতে হবে। ওরকম পরিমাপক যন্ত্র আমাদের বাস্তব দুনিয়াতে পাওয়া সম্ভব। পরিমাপক যন্ত্রটা হয়তো আলোর ফোটন হয়ে কিছু একটায় আঘাত করে কিংবা কোনো কিছুর সাথে ধাক্কা খেয়ে পরিমাপ জানায়। এভাবে বাস্তব দুনিয়ার পরিমাপক যন্ত্র যখন সাবঅ্যাটমিক পৃথিবীর কোনোকিছু পরিমাপ করতে শুরু করে তখন সেটা জোরপূর্বক বাস্তব দুনিয়ার অংশ হয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে নিজের হাত দেখতে পারেন। কোয়ান্টাম লেভেলে স্যাবঅ্যাটমিক কণিকাগুলো গঠিত হয়ে আপনার হাত তৈরি হয়েছে। কোয়ান্টামের কোষ তত্ত্ব মেনেই হয়েছে জিনিসটা। কিন্তু হাতের বাইরের অংশে এই বাস্তব দুনিয়ার বিলিয়ন বিলিয়ন পরমাণুর প্রভাবে আপনার নখের জন্ম। এই পরমাণুগুলো লাফাচ্ছে, ধাক্কাচ্ছে একে অপরকে। একে অপরকে পরিমাপ করে জোরপূর্বক স্থির বাস্তবে ধরে রেখেছে।
বুঝলাম…
লিসার কণ্ঠে দ্বিধার সুরটুকু নিশ্চয়ই অ্যানা শুনতে পেয়েছেন।
আমি জানি, বিষয়টা অদ্ভুত লাগছে। কিন্তু আমি কিন্তু কোয়ান্টাম থিওরির পুরোটা ব্যক্ত করিনি। স্রেফ ভাসা ভাসা কিছু তথ্য জানিয়েছি। ননলোকালিটি, টাইম টানেলিং মাল্টিপল ইউনিভার্সের মতো বিষয়গুলো কিন্তু সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছি।
