মাথা নাড়ল পেইন্টার। গানথার হলো পাহারাদার কুকুরের মতো। ও বিজ্ঞানের কী বোঝে!
ওর কথাটার সত্যতা প্রমাণ করতে গানথারের ওখান থেকে নাক ডাকার ভারি আওয়াজ ভেসে এলো। বেল সম্পর্কিত তথ্যগুলো অ্যানার মাথায় রয়েছে। যদি তার মন বিগড়ে…।
তার মন বিগড়ে গেলে ওরা সব হারিয়ে ফেলবে।
সেটা হওয়ার আগেই আমাদেরকে সব কিছু জেনে নিতে হবে।
একমত হলো ক্রো।
লিসার চোখে চোখ পড়ল ওর। লিসা নিজের অভিব্যক্তি লুকোনোর চেষ্টা করল না। ওর চেহারা দেখলেই সব পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। কাঠমাণ্ডু থেকে প্লেনে চড়ার সময় ওর চেহারা পেইন্টার খেয়াল করেছিল। ওর চেহারায় কোনোরকম দ্বিধা ছিল না। পেইন্টারের সাথে রওনা হওয়ার ব্যাপারে সম্পূর্ণ সম্মতি ছিল। বুঝে-শুনেই এসেছে সে। লিসা এখনকার বিষয়টাও ভাল করেই বুঝতে পারছে।
শুধু অ্যানার মন ও স্মৃতিশক্তি-ই হুমকির মুখে আছে তা নয়, পেইন্টারও ঝুঁকিতে আছে।
পেইন্টারই একমাত্র ব্যক্তি যে এই ঘটনার শুরুর সূত্র থেকে এখন পর্যন্ত টিকে আছে। মেডিক্যাল ও সাইন্টিফিক জ্ঞানও রাখে সে। কিন্তু সেই মনন ও মেধা এখন পাগল হওয়ার হুমকিতে রয়েছে। ক্যাসলে লিসা ও অ্যানা পরস্পরের মধ্যে অনেক কথাবার্তা বলেছে। অ্যানার রিসার্চ লাইব্রেরি ঘেঁটে ঘেঁটে দেখেছে লিসা। কে জানে হয়তো ছোই কোনো জিনিস বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ধরা দেবে। ছোট্ট একটা জিনিসই হয়তো ব্যর্থতা আর সফলতার পার্থক্য করে দিতে পারবে। কাঠমাণ্ডু বিষয়টা লিসা বুঝতে পেরেছিল।
কাঠমাণ্ডুতে ও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
সোজা এসে প্লেনে চেপে বসেছে। ভাবার কিছু নেই।
ক্রোর হাতের কনুই ছেড়ে আঙুল ধরল লিসা। অ্যানাকে দেখিয়ে বলল। চলো তার মাথায় কী আছে সেগুলো বের করি।
.
বেল কীভাবে কাজ করে সেটা বুঝতে হলে আপনাদেরকে প্রথমে কোয়ান্টাম থিওরি বুঝে নিতে হবে। ব্যাখ্যা করলেন অ্যানা।
এই জার্মান মহিলাকে লিসা বেশ করে পর্যবেক্ষণ করল। তার চোখের মণি বড় বড় হয়ে গেছে। ওষুধ একটু বেশিই খাচ্ছেন বোধহয়। আঙুলগুলো কাঁপছে। যক্ষের ধনের মতো দুই হাত দিয়ে চশমা ধরে আছেন তিনি। জেটের পেছনের অংশে চলে এসেছে ওরা। সামনের অংশে পাহারাদারের তত্ত্বাবধানে গানথার ঘুমাচ্ছে।
আমার মনে হয় আমাদের হাতে পিএইচডি করার মতো যথেষ্ট সময় নেই। বলল পেইন্টার।
তা ঠিক। তবে মাত্র তিনটা মূল বিষয়বস্তু বুঝতে হবে। অবশেষে হাত থেকে চশমা রাখলেন তিনি। প্রথমে আমাদেরকে বুঝতে হবে কোনো পদার্থকে যখন সাবঅ্যাটমিক লেভেলে অর্থাৎ পরমাণুর চেয়ে ক্ষুদ্র অংশে ভাঙ্গা হয় তখন ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রন পাওয়া যায়। তারপর থেকে সাধারণত আমরা যেটা জানি সেটা থেকে ভিন্ন কিছু ঘটবে। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক আবিষ্কার করলেন ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন… এরা কণিকা ও তরঙ্গ দুইভাবেই কাজ করে থাকে। বিষয়টা অদ্ভুত এবং পরস্পর বিরুদ্ধ। কণিকা বা কণাদের চলার জন্য নির্দিষ্ট চক্র আছে, পথ আছে। অন্যদিকে তরঙ্গ জিনিসটা চারিদিকে ছড়িয়ে যায়। সেভাবে নির্দিষ্ট কোনো বাধাধরা নিয়মে চলে না।
আর এই সাবঅ্যাটমিক কণিকাগুলো দুরকম আচরণই করে? লিসা প্রশ্ন করল।
হ্যাঁ, তাদের দুরকম আচরণ করার ক্ষমতা থাকে। কণিকা কিংবা তরঙ্গ। বললেন অ্যানা। এরপর আমরা পরবর্তী পয়েন্টে যাব। হেইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার সূত্র।
লিসা এই সূত্র সম্পর্কে ইতোমধ্যে জ্ঞানলাভ করেছে। অ্যানার ল্যাবরেটরিতে বসে এটা নিয়ে পড়েছিল ও। হেইজেনবার্গের মতে পর্যবেক্ষণ করে না দেখা পর্যন্ত কোনোকিছুই নিশ্চিত নয়। বলল লিসা। কিন্তু এর সাথে ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রনের কী সম্পর্ক সেটা আমার মাথায় ঢোকেনি।
হেইজেনবার্গের সূত্র বোঝার জন্য বিড়াল পরীক্ষা সবচেয়ে কার্যকরী, অ্যানা বললেন। একটা বাক্সে বিড়াল রেখে তাতে এমন এক ডিভাইস ঢোকানো হলো যেটা বিড়ালকে যে-কোনো সময় বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত করতে পারে আবার নাও পারে। সম্পূর্ণ ভাগ্যের ওপর নির্ভর করছে বিষয়টা। এরপর বাক্সটাকে বন্ধ করে দেয়া হলে বিড়ালের অবস্থা কী দাঁড়াল? হয় জীবিত কিংবা মৃত। হেইজেনবার্গের মতে, বাক্স বন্ধ করার পর থেকে বিড়ালটা এক হিসেবে মৃত এবং অন্যভাবে জীবিত। অর্থাৎ, জীবিত-মৃত দুটোই। যতক্ষণ না কেউ বাক্স খুলে বিড়ালকে পর্যবেক্ষণ না করছে ততক্ষণ পর্যন্ত এই অবস্থা বলবৎ থাকবে।
এই সূত্রে বৈজ্ঞানিক বিষয়ের চেয়ে দার্শনিকতার ছাপ বেশি, বলল লিসা।
বিড়ালের ক্ষেত্রে হয়তো এরকম মনে হতে পারে। তবে সাবঅ্যাটমিক লেভেলে কিন্তু এটা প্রমাণিত সত্য।
প্রমাণিত? কীভাবে? ক্রো প্রশ্ন করল। এতক্ষণ লিসাকে প্রশ্ন করতে দিয়ে চুপচাপ বসেছিল ও। ওদিকে অ্যানাও জানেন, পেইন্টার এসব বিষয়ে মোটামুটি জ্ঞান রাখে, তাই লিসার প্রশ্নের জবাবগুলো সুন্দর করে দিচ্ছেন তিনি। যাতে লিসা বিষয়টা ভালভাবে বুঝতে পারে।
ঐতিহাসিক দুটো-ফাটল পরীক্ষার মাধ্যমে, বললেন অনা। এটা নিয়ে এবার আমরা তিন নম্বর বিষয়ে আলোচনা করব। দুটো কাগজ নিয়ে একটা কাগজে দুটো দেয়াল আঁকলেন তিনি। দেয়াল দুটোর অবস্থান হলো : একটার পেছনে আরেকটা। এরপর একটা দেয়ালে দুটো জানালার মতো ফাটল আঁকলেন।
