আলমস্ট্রমের কণ্ঠে না শোনা গেল। রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে কিছু বলছেন তিনি।
গ্রের পাশে দাঁড়িয়ে ফিওনা টলছে। ভেঙে আসতে চাইছে ওর হাঁটু। মনক ওকে ধরে মাথা উঁচু করে রাখার চেষ্টা করল। ভারি গ্যাস রুমের নিচের অংশে ভরে এবার ধীরে ধীরে উপরে উঠে আসছে। কিন্তু ওর অবস্থাও সুবিধের নয়।
গ্রের হাতে আর সময় নেই।
নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য গ্রে ওর হাতে থাকা টর্চ বন্ধ করে বাইবেলটাকে কূপে ফেলে দিলো। বাইবেলের মতো পবিত্র জিনিসকে এভাবে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার কারণে চোট লাগল ওর রোমান ক্যাথলিক অন্তরে। পুরোনো পৃষ্ঠাগুলোয় সহজেই আগুন ধরে গেল। বাড়তি ধোঁয়া বেরোল এবার।
গভীর একটা নিঃশ্বাস নিল গ্রে। এবার যে কথাটা বলতে যাচ্ছে এটা যথাসম্ভব বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। আপ্রাণ চেষ্টা করল ও। যদি আমরা মরে যাই তাহলে ডারউইন বাইবেলের গোপন জিনিসটাও আমাদের সাথে শেষ হয়ে যাবে!
অপেক্ষা করল ও। মনে মনে আশা করছে, ওর কথায় হয়তো কাজ হবে।
এক সেকেন্ড… দুই…
গ্যাস উঠে গলার কাছে চলে এসেছে। প্রতিবার নিঃশ্বাস নিতে ভুগতে হচ্ছে খুব।
হঠাৎ হুরমুড় করে ভেঙে পড়ল রায়ান। মনে হলো ওকে যে রশি দিয়ে টেনে দাঁড় করে রাখা হয়েছিল সেটা হঠাৎ করে কেউ কেটে দিয়েছে। মনক ওকে এক হাত দিয়ে ধরতে চাইল কিন্তু তাহলে ফিওনার ভারে হাঁটু মুড়ে সে-ও পড়ে গেল। পড়ল তো পড়ল, আর উঠল না। ফিওনাও ওর সাথে ভূপাতিত হয়েছে।
দরজার দিকে তাকাল গ্রে। মনকের হাত থেকে টর্চটা পড়ে গিয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। বাইরে কী কেউ আছে? ওর কথা বিশ্বাস করেছে ওরা?
সেটা আর গ্রের জানা হলো না।
বাকিদের মতো এবার গ্রেও আধারের কোলে ঢলে পড়ল।
.
বিকাল ৫টা ৫০ মিনিট।
হুলুহুলুই-আমফলোজি প্রিজার্ভ।
হাজার হাজার মাইল দূরে জেগে উঠল অন্য একজন।
ব্যথা নিয়ে রঙিন দুনিয়ায় চোখ মেলল সে। চোখ মেলেই দেখল ওর মুখের ওপরে পাখির পালক নাড়ানো হচ্ছে। প্রার্থনার স্তবক শুনতে পেল।
উঠেছে, জুলু ভাষায় বলল একজন।
খামিশি… নারী কণ্ঠ।
নিজের পরিচয় মনে করতে জেগে ওঠার লোকটির কয়েক মুহূর্ত লেগে গেল। নিজের নাম-ধাম মনে পড়ল ওর কিন্তু স্বস্তি পেল না। গোঙানির আওয়াজ এলো। আওয়াজটা ওর গলা দিয়েই বেরিয়েছে।
ওকে বসিয়ে দিন। জুলু ভাষায় বলল নারী কণ্ঠ। যদিও তার জুলু উচ্চারণে ব্রিটিশ টান রয়ে গেছে।
পিঠের পেছনে বালিশ দিয়ে দুর্বল খামিশিকে বসিয়ে দেয়া হলো। ওর দৃষ্টিশক্তি এখন স্থির হয়েছে। নগ্ন ইটের কুঁড়েঘরের একটা রুমে আছে ওরা। রুমটায় অদ্ভুত একধরনের গন্ধ ছড়িয়ে আছে। ওর নাকের নিচ দিয়ে কিছু একটু ঘুরিয়ে আনা হলো। আমোনিয়ার তীব্র দুর্গন্ধ পেল খামিশি। দুর্গন্ধের ধাক্কায় ও মাথা পেছনে হেলিয়ে দিল।
এবার ওর চোখে পড়ল ওর ডান হাতে আইভি লাইন দেয়া হয়েছে। হলুদ তরল ভরা একটি ব্যাগ থেকে নেমে এসে ওর হাতে ঢুকেছে লাইনটা।
একপাশে নগ্ন বুক নিয়ে এক শ্যামান দাঁড়িয়ে আছে, তার মাথায় পালকের মুকুট পরা। এই লোকটি এতক্ষণ প্রার্থনার স্তবক পাঠ করতে করতে শকুনের পালক ওর মুখের ওপর ঘোরাচ্ছিল। মৃত্যুকে এভাবে তাড়ানো হয়ে থাকে।
অন্যদিকে, ড. পলা কেইন খামিশির এক হাত ধরে বসে ছিলেন, এখন হাতটাকে আবার কম্বলের নিচে রাখছেন তিনি। কম্বলের নিচে খামিশি সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় রয়েছে। ঘামে ওর সব পোশাক ভিজে জবজবে হয়ে গিয়েছিল।
কী…? কোথায়…? গলা কর্কশ শোনাল খামিশির।
পানি আনুন, নির্দেশ দিল পলা।
জুলু লোকটি নির্দেশ মেনে একটা টোলের ক্যানটিন এগিয়ে দিল।
ধরে খেতে পারবেন? পলা জানতে চাইলেন।
মাথা নাড়ল খামিশি, পারবে। ধীরে ধীরে ওর শক্তি ফিরে আসছে। ক্যানটিন নিয়ে কুসুম কুসুম গরম পানিতে চুমুক দিল ও। জিহ্বা ভিজতেই ঘটনাগুলো মনে পড়তে শুরু করল। এই জুলু লোকটি… খামিশির বাড়িতে ছিল।
হঠাৎ করে ওর হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে গেল। ডান হাতে আইভি লাইন দেয়া। ব্যান্ডেজ করা আছে গলার এক জায়গায়। সব মনে পড়ে গেল ওর। সেই দুই মুখঅলা। ডার্ট। ব্ল্যাক মাম্বা। সাপ দিয়ে করা সাজানো নাটক।
কী হয়েছিল?
জুলু লোকটি বয়সে বৃদ্ধ। খামিশি একে চিনতে পারল। এই ব্যক্তিই সর্বপ্রথম পার্কে উকুফা দেখে রিপোর্ট করেছিল। সেটা আজ থেকে ৫ মাস আগের কথা। অবশ্য তখন তার কথা কেউ আমলে নেয়নি। এমনকি খামিশিও পাত্তা দেয়নি তখন।
ডক্টরের সাথে কী হয়েছে… সব শুনেছি আমি। মাথা নেড়ে পলার প্রতি সমবেদনা জানাল জুলু। আর আপনি কী দেখেছেন, কী বলেছেন সেগুলোও জেনেছি। লোকজন সবাই এসব নিয়ে বলাবলি করছিল। বিষয়টা নিয়ে আপনার সাথে কথা বলার জন্য আপনার বাসায় গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি আপনি নেই। তাই অপেক্ষা করতে লাগলাম। এমন সময় কয়েকজনকে আসতে দেখে লুকিয়ে পড়লাম আমি। ওরা সাপটাকে কাটল। মাম্বা সাপ। ব্ল্যাক ম্যাজিক করছিল বোধহয়। তাই আমি আর তখন বের হইনি।
চোখ বন্ধ করল খামিশি। মনে পড়ছে সব। বাসায় আসার পর ডার্টের আক্রমণের শিকার হয়েছিল। পড়ে ছিল মরার মতো। কিন্তু আক্রমণকারীরা জানতো না, কেউ একজন লুকিয়ে আছে।
ওরা চলে যাওয়ার পর আমি বের হয়ে অন্যদেরকে ডেকে আনলাম। তারপর গোপনে আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছি। জানাল বৃদ্ধ।
