ঘুটঘুটে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে টর্চ দিয়ে আলো জ্বালালো মনক।
গ্রে নিজের প্যাক হাতড়ে টর্চ খুঁজে বের করে জালিয়ে উপরের দিকে তাক করল। গম্বুজের পাশ দিয়ে ধোঁয়া বের হওয়ার জন্য ছোট্ট করে ভেন্টের ব্যবস্থা রাখা আছে। সবুজ গ্যাস বেরিয়ে আসছে ওখান থেকে, গ্যাসটা বাতাসের চেয়ে ভারি। ধোয়ার জলপ্রপাতের মতো ভেন্ট থেকে গ্যাস রুমে নেমে আসছে।
ভেন্ট এর ছিদ্র বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ ওটা অনেক উঁচুতে।
গ্রের দিকে সরে এলো ফিওনা। রায়ান কূপের অন্যপাশে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের হাত দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছে ও। পুরো বিষয়টা বিশ্বাসই করতে পারছে না।
নড়াচড়া হওয়ায় গ্রের দৃষ্টি মনকের দিকে ফিরল।
৯ এমএম গ্লক পিস্তল বের করে কাঁচের দরজার দিকে তাক করেছে সে।
না! মানা করল গ্রে।
কিন্তু ততক্ষণে যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে। বেরিয়ে গেছে গুলি।
পিস্তলের শব্দে রুম কেঁপে উঠল। কাঁচের গায়ে হুমড়ি খেয়ে গুলি অন্যদিকে ছুটল। একটা স্টিলের ভেন্টের সাথে গিয়ে সংঘর্ষ ঘটিয়ে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বেরোল।
ভাগ্য ভাল এই গ্যাস দাহ্য নয়। নইলে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের কারণে ওরা সবাই মারা পড়তো।
মনকও বুঝল বিষয়টা। বুলেটপ্রুফ, মুখ হাঁড়ি করে বলল ও।
ওর কথায় কথায় সায় দিলে আলমস্ট্রম জানালেন। বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখতে হয়েছে। অনেক আধুনিক-নাৎসিরা ভেতরে অহেতুক প্রবেশের চেষ্টা। করেছিল। গ্রেরা আলো জ্বালানোর ফলে সেই আলো কাছে গিয়ে প্রতিফলিত হয়ে। ফিরে আসছে। আলমস্ট্রম ঠিক বাইরের কোনো অবস্থানে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন সেটা বোঝা যাচ্ছে না।
হারামজাদা, বিড়বিড় করল মনক। রুমের নিচের অংশ গ্যাসে ভরে যাচ্ছে। গ্যাসের গন্ধটা বেশ মিষ্টি হলেও তেতো স্বাদ দিল জিহ্বায়। যাক, অন্তত সায়ানাইড দেয়নি। এই সবুজ গ্যাসের চেয়েও জঘন্য, তিতা কাঠবাদামের মতো গন্ধ ওটার।
দাঁড়িয়ে থাকো সবাই, বলল গ্রে। মাথা উঁচু রাখো। ভেন্টগুলো থেকে দূরে… রুমের মধ্যে চলে আসো সবাই।
রুমের মধ্যে জড়ো হতে শুরু করল ওরা। গ্রের হাত শক্ত করে ধরল ফিওনা। আরেক হাত বের করে বলল, আমি ওই ব্যাটার পকেট মেরে দিয়েছি। দেখো তো, মানিব্যাগে কিছু পাও কি-না।
খুব ভাল করেছ। কিন্তু ওর চাবিগুলো চুরি করতে পারলে না? বলল মনক।
গলা উঁচিয়ে জার্মান ভাষায় রায়ান বলল, আ… আমার বাবা জানে… আমরা এখানে এসেছি। তিনি Pofitzef-দের ফোন করবেন কিন্তু।
এই তরুণের তারিফ করতেই হয়, ভাবল গ্রে। ছেলেটা তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
কাঁচের ওপাশ থেকে নতুন একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল। কাঁচে আলো প্রতিফলিত হওয়ায় এই ব্যক্তির চেহারাও দেখা যাচ্ছে না। আমার তো মনে হয়, তোমার বাবা আর কখনও কাউকে ফোন করতে পারবে না। কথাগুলো সে হুমকি হিসেবে বলেনি, একদম ঘোষণা দেয়ার মতো বলেছে।
এক পা পিছিয়ে গেল রায়ান। মনে হলো, ওকে কেউ শারীরিকভাবে আঘাত করেছে। একবার গ্রের দিকে আরেকবার দরজার দিকে তাকাল বেচারা।
নতুন কণ্ঠস্বরটা গ্রে ও ফিওনার পরিচিত। দুজনই চিনতে পেরেছে। নিলাম হাউজের ট্যাটুঅলা ক্রেতার কণ্ঠ এটা।
এবার আর তোমাদের কোনো কৌশল কাজে আসবে না, বলল সে। পালানোর কোনো রাস্তা নেই এবার।
মাথা খালি খালি লাগল গ্রের। ওর মনে হচ্ছে ওর শরীরের কোনো ওজন নেই, খুব হালকা লাগছে নিজেকে। মাথা ঝাঁকিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল ও। লোকটা ঠিকই বলেছে। এবার পালানোর কোনো রাস্তা নেই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ওরা অসহায়, প্রতিরোধ করার কোনো শক্তি নেই।
জ্ঞানই শক্তি।
তোমার প্যাক থেকে লাইটার বের করো, মনককে নির্দেশ দিলো গ্রে।
মনক নির্দেশ পালন করল। এদিকে গ্রে ওর নিজের ব্যাকপ্যাক থেকে নোটবুক ব্যাক করে কূপের ভেতর ফেলল।
মনক, রায়ানের কপিগুলো দাও তো। গ্রে হাত বাড়িয়ে দিলো। আর ফিওনা, তুমি বাইবেলটা দাও, প্লিজ।
নির্দেশমতো দুজনই কাজ করল।
কূপের ভেতরে আগুন লাগাও, বলল গ্রে।
লাইটার জ্বালিয়ে রায়ানের আনা কাগজগুলোকে মনক আগুন ধরিয়ে কূপের ভেতর ফেলে দিলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আগুন আর ধোঁয়া বেরিয়ে এলো কূপ থেকে। সব কাগজ পুড়িয়ে ফেলছে। নতুন উৎপন্ন ধোঁয়াগুলো সবুজ গ্যাসকে একটু হলেও বাধা দিচ্ছে… নাকি এটা শুধু গ্রের আশা মাত্র? মাতালের মতো মাথা ঝাঁকাল ও।
দরজার ওপাশে বিড়বিড় করে ওরা কী যেন বলছে। এত আস্তে বলছে যে ভালভাবে শুনতে পাওয়া গেল না।
ডারউইন বাইবেল উঁচু করে চিৎকার করে বলল গ্রে। এই বাইবেলের ভেতরের গোপন জিনিসটা একমাত্র আমরাই জানি!
কাঁচের আড়ালে দাঁড়িয়ে সাদা-চুলঅলা লোকটি তাচ্ছিল্যের স্বরে জবাব দিলো, আমাদের যা জানা দরকার সেসব ড. আলমস্ট্রম জানিয়ে দেবেন। প্রাচীন বর্ণমালার বিষয় কোনো ব্যাপারই না। আমাদের কাছে ওই বাইবেলের কানা-কড়ি মূল্যও নেই এখন।
তাই নাকি? হাতে থাকা টর্চের আলো বাইবেলের ওপর ফেলল গ্রে। হিউগো সাহেব বাইবেলের পেছনের অংশে কী লিখেছেন সেটা আলমঈমকে দেখিয়েছি, কিন্তু সামনে কী লিখেছেন ওটা তো এখনও দেখাইনি!
কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা। তারপর ওপাশে আবার বিড়বিড় করে কথা বলার আওয়াজ পাওয়া গেল। গ্রের মনে হলো এবার এক নারী কণ্ঠও ও শুনতে পেয়েছে। হয়তো ওই ফ্যাকাসে লোকটার যমজ বোন।
