চলে যা তোরা, মনে মনে প্রার্থনা করল সিসা। খুব করে চাইল যেন কপ্টার দুটো এখান থেকে চলে যায়।
ওরা কারা? নতুন একটি কণ্ঠস্বর প্রশ্ন করল।
কণ্ঠের মালিক কে, এটা দেখার জন্য তার চেহারা দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ সিসা ভাল করেই জানে কণ্ঠটা বোস্টন ববের। এই ব্যক্তি হলো ওর জীবনের ভুল মানুষ। এই লোকের বলার ধরনে একধরনের সুর আছে যেটা শুনলেই বোঝা যায়, গায়ে পড়ে নাক গলাতে চাইছে। ফালতু লোক। নিশ্চয়ই জশের পিছু পিছু এসে হাজির হয়েছে। ওকে পাত্তাই দিল না লিসা।
কপ্টার দুটোকে দেখে লিসার মধ্যে যে উদ্বিগ্নতা তৈরি হয়েছে সেটা জশের চোখ এড়ায়নি। লিসা…?
মাথা নাড়ল ও, দৃষ্টি আকাশে ঝুলে থাকা কপ্টার দুটোর দিকে। প্রার্থনা করার জন্য একনিষ্ঠ মনোযোগ দরকার।
কিন্তু প্রার্থনায় কোনো কাজ হলো না।
হোভার বের করে ওদের দিকে যাকে এলো কপ্টার দুটো। আগুন ফুলকি দেখা যাচ্ছে ওগুলো থেকে। সমান্তরাল রেখা ধরে বুলেট ধেয়ে এসে বেজের বরফ আর তুষারের মধ্যে নাক খুঁজতে খুঁজতে সামনে এগোল।
না… গুঙিয়ে উঠল লিসা।
চিৎকার করে পিছু হটতে শুরু করল বব। কী কাণ্ড ঘটিয়ে এসেছ তোমরা?
বেজে উপস্থিত বাকিরা এরকম অতর্কিত আক্রমণে নির্বাক হয়ে পড়েছিল। তবে সেটা কয়েক মুহূর্তের জন্য। যোর কাটতেই গলা ছেড়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করল সবাই। যে যেদিকে পারছে ছুটছে।
লিসার হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল পেইন্টার। সাথে জশকেও নিলো। পালাতে চাচ্ছে। কিন্তু এখানে তো সেরকম কোনো জায়গা নেই।
একটা রেডিও লাগবে! জশের উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়ল ক্রো। রেডিও কোথায়?
জশ কোনো জবাব না দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল।
ভাইয়ের হাত ধরে ঝাঁকি দিল লিসা। দৃষ্টি নিচে নামিয়ে এনে বলল, জশ, একটা রেডিও খুঁজে বের করতে হবে। পেইন্টারের উদ্দেশ্য ও বুঝতে পেরেছে। আর কিছু না হোক, অন্তত বাইরের দুনিয়ায় এখানকার খবরটুকু পৌঁছে দিতে হবে।
হঠাৎ কেশে উঠল জশ, নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, এদিকে আসো… মঠে মাওবাদীদের আক্রমণের পর ওরা এখানে একটা ইমার্জেন্সি কমিউনিকেশন সিস্টেম বসিয়েছে। লাল রঙের বড় এক তাবুর দিকে ওদের নিয়ে গেল জশ।
সিসা খেয়াল করে দেখল বোস্টন ববও ওদের সাথে সাথে এসেছে। বুঝতে, পারছে এখন পেইন্টার আর গানধারের ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। গানথার চুপ করে থাকলেও ওর হাতে থাকা রাইফেল অনেক কথা বলে দিচ্ছে। একটু আগে লঞ্চারে আরেকটা গ্রেনেড ভরেছে গানথার। রেডিওতে কাজ করার মুহূর্তে কেউ বাগড়া দিতে এলে তাকে এক হাত দেখিয়ে দেয়ার জন্য গানথর একদম প্রস্তুত।
কিন্তু তাবুর কাছে পৌঁছানোর আগেই পেইন্টার চিৎকার করে উঠল। নিচু হও সবাই!
লিসাকে টেনে শুইয়ে ফেলল ও। ওর দেখাদেখি সবাই শুয়ে পড়ল। বোস্টন বব আমতা আমতা করছিল দেখে জশ ওর পা ধরে আছড়ে ফেলল।
নতুন অদ্ভুত একটা শব্দ প্রতিধ্বনি হলো পাহাড়ের গায়ে।
আকাশের দিকে তাকাল ক্রো।
কী…? লিসা জানতে চাইল।
দাঁড়াও… দেখি। দ্বিধা নিয়ে বলল ক্রো।
লোতসে পর্বতের কাঁধের ওপর দিয়ে দুটো মিলিটারি জেটকে উদয় হতে দেখা গেল এবার। উদয় হতে দেরি আক্রমণ করতে দেরি নেই। জেট দুটোর পাখার নিচে আগুনের ঝলকানি দেখতে পেল ওরা।
মিসাইল।
এই সেরেছে!
কিন্তু বেজ টার্গেট করে মিসাইলগুলো ছোঁড়া হয়নি। বেজের ওপর দিয়ে সামনে, এগিয়ে গেল মিসাইল দুটো।
টাইগার কপ্টার দুটো অনেকখানি নিচে নেমে এসেছিল কিন্তু জেট থেকে ছোটা মিসাইল এসে আছড়ে পড়ল তাদের ওপর। টুকরো টুকরো হয়ে গেল দুই টাইগার কপ্টার। তবে ভাগ্য ভাল, খগুলো ক্যাম্পে এসে আছড়ে পড়েনি।
উঠে দাঁড়াল পেইন্টার, লিসাকেও তুলল।
উঠে পড়ল বাকিরাও।
লিসার দিকে তেড়ে ফুড়ে এগিয়ে গেল বোস্টন বব। হচ্ছেটা কী এসব? তুমি কোন কুকর্ম করে এসে এখন আমাদেরকে এসব দিয়ে ভোগাচ্ছ?
মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে ঘুরল লিসা। এর আগে এই লোকের সাথে এক বিছানায় রাত কাটিয়েছে বলেই হয়তো এতটুকু ধৈর্য দেখাতে পারছে। ভাবতেই অবাক লাগে, তখনকার লিসা আর এখনকার লিসার মধ্যে কত পার্থক্য। তখনকার লিসা যেন এই। লিসা নয়। দুজন ভিন্ন ব্যক্তি।
কুত্তী মাগী! আমাকে তোর পিঠ দেখাবি না বলে দিলাম! খেঁকিয়ে উঠল বব।
ঝট করে ঘুরল লিসা, ওর হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেছে… যদিও এটার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কারণ পেইন্টার আছে তো। হাতুড়ির মতো ববের মুখের ওপর ঘুষি মারল ক্রো। ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দেয়া এতদিন শুধু শুনে এসেছে লিসা, আজ স্বচক্ষে দেখল। এক ঘুষিতেই বব ভূপাতিত। হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে রইল বব, আর উঠল না। ওর নাক ভেঙ্গে গেছে।
নিজের মাথা চেপে ধরল ক্রো, আবার ব্যথা হচ্ছে।
প্রথমে বিস্মিত হলো জশ, তারপর দাঁত বের করে হাসল। ওহ, এই কাজটা করার জন্য গত এক সপ্তাহ ধরে আমার হাত নিশপিশ করছিল। যাক, কাজটা হতে দেখে ভাল লাগল।
ওরা আর কিছু বলার আগে লাল তাবু থেকে হলদে চুলঅলা একজন বেরিয়ে এলো। তার পরনে মিলিটারি ইউনিফর্ম। আমেরিকার মিলিটারি। এদিকে এগিয়ে এলো সে। পেইন্টারের দিকে তাকিয়ে বলল, ডিরেক্টর ক্রো? লোকটির উচ্চারণভঙ্গিতে জর্জিয়ান টান আছে। বলতে বলতে এক হাত সামনে বাড়িয়ে দিল সে।
হ্যান্ডশেক করল ক্রো।
স্যার, লোগান গ্রেগরি আপনাকে সালাম জানিয়েছেন। একটু আগে হয়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল সে।
