জানালা দিয়ে তাকাল ক্রো।
গানথার ওদের দেখার সুবিধার্থে এ-স্টারকে একটু সরিয়ে নিল।
কপিকল সুদ্ধ হার্নেস গিয়ে পড়ল টাইগারের ঘুরন্ত রোটরের ওপর। যার ফল হলো অত্যন্ত ভয়াবহ। কপ্টারের ব্লেড ভেঙ্গে ছড়িয়ে গেল চারদিকে। মাতালের মতো গোত্তা খেতে লাগল টাইগার। নিচে খসে পড়ছে।
আর সময় নষ্ট না করে এভারেস্টের দিকে এগোতে বলল ক্রো।
বেজ ক্যাম্পের নিচের ঢালে পৌঁছুতে হবে ওদের। কিন্তু নিচের আকাশ তো নিরাপদ নয়।
ক্ষ্যাপা ভীমরুলের মতো নিচে দুটো টাইগার কপ্টার উড়ে বেড়াচ্ছে। এগোচ্ছে ওদের পিছু পিছু। যদিও উচ্চতার হিসেবে ওদের নিচ দিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু এগোচ্ছে তো।
এদিকে পেইন্টারের কপ্টারে আর কোনো হানেস কপিকলও নেই।
.
লিসা দেখল হেলিকপ্টার দুটো ওদের দিকে তেড়ে আসছে। দুটো বাঘ একটি হরিণকে ধাওয়া করছে যেন।
কপ্টারকে এভারেস্ট আর এর পাশে থাকা পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা অংশে নিয়ে এলো গানথার। পেছনে থাকা কপ্টারগুলোর আক্রমণ থেকে বাঁচতে হলে পাহাড়কে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। পাহাড়ের টোলের পাদভূমিতে বেজ ক্যাম্পের অবস্থান।
ওরা যদি ওখানে পৌঁছুতে পারতো…। লিসার চোখের সামনে ভাইয়ের বোক বোকা হাসিমাখা মুখখানি ভেসে উঠল। কপ্টার ওখানে গেলে পিছু পিছু যদি ওই দুই কপ্টারও হাজির হয় তাহলে তো বিষয়টা এরকম দাঁড়াল : বেজ ক্যাম্পে যুদ্ধ টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ঠিক না?
গানথারের দিকে ঝুঁকে আছে পেইন্টার। কথা বলছে কিন্তু কপ্টারের রোটরের আওয়াজে সেসব লিসার কান পর্যন্ত পৌঁছুতে পারল না। পেইন্টারের ওপর আস্থা রাখতে হবে। অযথা প্রাণহানি করবে সে।
সামনে পাহাড় উদয় হওয়ায় গানথার কপ্টারের নাক তীক্ষ্ণভাবে নিচু করল। নিজের সিট আঁকড়ে ধরল লিসা। ওর মনে হলো, এই বুঝি ও সামনে থাকা উইডশীন্ডের কাঁচ ভেঙ্গে বাইরে ছিটকে চলে যাবে। সামনে পাহাড় আর বরফ ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না।
পেছন থেকে বিকট আওয়াজ ভেসে এলো।
মিসাইল! চিৎকার করলেন অ্যানা।
এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে গানথার কন্ট্রোল স্টিক টান দিল। কপ্টারের নাক উঁচু করে ডান দিকে বাঁক নিল ও। কপ্টারের ল্যান্ডিং স্ট্যান্ডের ঠিক নিচ দিয়ে মিসাইলটা বেরিয়ে চলে গেল। অল্পের জন্য রক্ষা পেল ওরা। মিসাইল গিয়ে পাহাড়ের গায়ে হামলে পড়ল। পাথর আর বরফের বিভিন্ন খণ্ড ছিটকে আসতে শুরু করল বিস্ফোরণের ফলে। সেগুলো থেকে বাঁচতে আবার নাক নিচু করে কপ্টার ছোটাল গানথার।
জানালার কাঁচের সাথে গাল ঠেকিয়ে লিসা দেখল পেছন থেকে কপ্টার দুটো ওদের দিকে বাঁক নিয়ে ধেয়ে আসছে। দূরত্ব কমে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। তারপর হঠাৎ করেই পাহাড়ি দেয়ালের আড়ালে পড়ে গেল টাইগার দুটো।
আমরা চলে এসেছি! পেইন্টার চিৎকার করে জানাল। শক্ত হয়ে বসে থাকো সবাই।
ওদের কপ্টার নাক নিচু করে ছুটে যাচ্ছে। সামনে বেজ ক্যাম্প। ওদের গতি দেখে মনে হবে বেজ ক্যাম্পে ক্রাশ ল্যাস্ত করতে যাচ্ছে ওরা।
প্রতি মুহূর্তে তীব্র গতিতে বেজ ক্যাম্প ওদের কাছে চলে আসছে। পতাকা, তার সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখন।
ল্যান্ড করতে খবর আছে আমাদের! আবার চিৎকার করল পেইন্টার।
কিন্তু গানথার কপ্টারের গতি কমাল না।
বিড়বিড় করে ঠোঁট নাড়াল লিসা। ওহ গড… ওহ গড়… ওহ গড়…
একদম শেষ মুহূর্তে গানথার কন্ট্রোল স্টিক টেনে ধরল। বাতাসে ভারসাম্য হাতড়ে বেড়াচ্ছে রোটর, খুব একটা সুবিধে করতে পারছে না।
সিটের হাতল খামচে ধরে আছে লিসা।
ভূমি ধেয়ে আসছে কপ্টারের দিকে।
এবং কপ্টারের ল্যান্ডিং স্ট্যান্ডের সামনের অংশ ভূমি স্পর্শ করল, বেশ জোরেশোরেই হলো সেটা। ল্যান্ডিঙের সময়ও কপ্টারের নাক একটু সামনের দিকে ঝুকানো ছিল। সিট থেকে ছিটকে যাচ্ছিল লিসা কিন্তু সিট বেল্ট বাঁচিয়ে দিল ওকে। রোটরের বাতাসে তুষার আর বরফ দূরে সরে যাচ্ছে। অবশেষে কপ্টারের ল্যান্ডিং স্ট্যান্ড পুরোপুরি ভূমি স্পর্শ করল।
বের হও সবাই! নির্দেশ দিল পেইন্টার ক্রো। ওদিকে গানথার ইঞ্জিন বন্ধ করছে।
কপ্টারের হ্যাঁচ খুলে বেরিয়ে এলো ওরা।
লিসার পাশে এসে ওর হাত নিজের হাতে নিয়ে পেইন্টার এগোল। ওদের পেছন পেছন আসছে গানথার আর অ্যানা। অনেক লোক এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। পাহাড়ের গায়ে মিসাইল আঘাত করার শব্দ নিশ্চয়ই শুনেছে ওরা।
নানান ভাষায় অস্পষ্টভাবে ওদের দিকে প্রশ্ন ছোঁড়া হলো।
অবশ্য কপ্টারের শব্দে সেগুলো পুরোপুরি কানে পৌঁছুতে পারল না।
কিন্তু একটা কণ্ঠ লিসার কানে ঠিকই পৌঁছুল।
লিসা!
শব্দের উৎসের দিকে ঘুরল ও। পরনে কালো স্লেপ্যান্ট আর ধূসর থার্মাল শার্ট পরিহিত একটা পরিচিত অবয়ব লোকজনকে ঠেলে ওর দিকে এগিয়ে আসছে।
জশ!
হাত ছেড়ে দিয়ে ভাইয়ের কাছে লিসাকে যেতে দিল ক্রো। ছুটে গিয়ে ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল লিসা। ওর ভাইয়ের শরীর দিয়ে চমরি গাইয়ের গন্ধ বেরোচ্ছে। কিন্তু তবুও লিসার খুব ভাল লাগল।
ওদের পেছনে ঘোঁতঘোত করল গানথার। Pass auf?
সতর্কীকরণ সিগন্যাল।
আশেপাশের সবার মধ্যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
সবার হাত সামনের দিকে কী যেন দেখাচ্ছে।
বাধনমুক্ত হলো দুই ভাই-বোন।
সেই দুই টাইগার হেলিকপ্টার টোলের ওপরে শূন্যে ভেসে আছে। আক্রমণ করার জন্য মুখিয়ে আছে ওগুলো।
