অ্যানার দিকে তাকাল লিসা। ওর চেহারা অভিব্যক্তি পেইন্টার ঠিকই বুঝতে পারল। পেছনে থাকা শত্রুদের হাত থেকে নিজেদের জীবন তো বাঁচাতে হবেই, তার ওপর সঙ্গী হিসেবে তাদেরকে পাশে পাচ্ছে যারা কি-না মঠে আগুন দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান হুমকির পরিমাণ অনেক বেশি। অনেক বেশি ভয়াবহ। অ্যানা নির্দয়ভাবে মঠ ধ্বংস করেছিলেন তার নিজের সুবিধার জন্য। অন্যদিকে এখন যারা পিছু লেগেছে এরা অ্যানাকে থামিয়ে তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চাচ্ছে।
পেইন্টার জানে, এই ঘটনা এখানেই শেষ হয়ে যাবে না। এ তো সবে শুরু। ওরা সবে মাত্র ছোট্ট একটা আক্রমণ এড়াতে চাচ্ছে। সামনে যে আরও কতকিছু মোকাবেলা করতে হবে। অ্যানার কথাগুলো এখনও পেইন্টারের কানে বাজছে।
ওদেরকে থামাতে হবে আমাদের।
ওখানে অনেক স্যাটেলাইট ফোন আছে, বেজ ক্যাম্প থেকে ভিডিও সম্প্রচারের ব্যবস্থাও আছে। ওরা হয়তো হামলা করার সাহস পাবে না। লিসা ওর কথা শেষ করল।
আমরা আশা করতে পারি, ওই পর্যন্তই। বলল পেইন্টার। যদি ওরা তারপরও হামলা করে তাহলে আমাদের কারণে আরও অনেক জীবনহানি হবে।
সিটে হেলান দিয়ে পেইন্টারের কথাগুলো হজম করল লিসা। পেইন্টার জানে, বেজ ক্যাম্পে লিসার ভাইও আছে। ওদের দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল।
কিন্তু বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ, বলল লিসা। ঝুঁকি নেয়া ছাড়া উপায় নেই। এই খবর বাইরের পৃথিবীকে জানাতেই হবে!
ক্রো চোখ সরিয়ে নিল।
এভারেস্টের কাঁধের ওপর দিয়ে উড়ে গেলে অল্পের মধ্যে পৌঁছুনো যাবে। নইলে অনেকখানি ঘুরে যেতে হবে, বাড়তি সময় লাগবে তখন। বললেন অ্যানা।
পেইন্টার জিজ্ঞেস করল, তাহলে আমরা বেজ ক্যাম্পে যাচ্ছি?
একমত হলো সবাই।
তবে পেছনের আক্রমণকারীরা একমত হয়নি।
ওদের কপ্টারের রোটরের ঠিক ওপর দিয়ে একটা টাইগার কপ্টার চলে গেল। আসলে এ-স্টারকে উল্টো ওদের দিকে ধেয়ে আসতে দেখে আক্রমণকারীরা একদম অবাক হয়ে গেছে। বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে টাইগার কপ্টারটি দিক বদল করে এ স্টারের পিছু নিল।
পেইন্টার প্রার্থনা করল অন্য টাইগার কপ্টারগুলো যাতে একটু বৃত্ত রচনা করে এদিকে আসে। আপাতত এই একটা টাইগারকে সামলানো যাক।
অস্ত্রবিহীন নিরীহ এ-স্টার কপ্টার এখন তুষার আর বরফে ঢাকা গিরিখাতের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে। লুকোচুরির কোনো সুযোগ নেই এখানে। এই সুযোগ লুফে নেয়ার জন্য টাইগারের পাইলটের আর তর সইল না। ধেয়ে এলো টাইগার।
এ-স্টারের প্রটল বাড়িয়ে ইঞ্জিনের ভেতর থেকে সর্বোচ্চ শক্তি বের করার চেষ্টা করল গানথার। কপ্টারের ব্লেডের গতি বেড়ে গেছে। তীর বেগে ছুটছে এ-স্টার। গতি দিয়ে হয়তো ওরা টাইগারকে হারিয়ে দিতে পারবে কিন্তু ওটা থেকে ছোঁড়া মিসাইলকে তো পরাজিত করতে পারবে না।
বলতে বলতে টাইগারের পাইলট তার কপ্টারে থাকা গান পড় তাক করে ফায়ার করতে শুরু করল। বুলেটগুলো মুখ গুজল দুই পাশে থাকা তুষার আর বরফের ভেতরে।
হারামজাদাগুলোর বড় বাড় বেড়েছে! বুড়ো আঙুল ঝাঁকিয়ে বলল পেইন্টার। যেমন কুকুর তেমন মুগুর মারতে হবে এখন।
বুঝতে না পেরে ওর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল গানথার।
টাইগার ভারি কপ্টার, পেইন্টার ব্যাখ্যা করল। আমরা আমাদের কপ্টারকে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে পারি। যেখানে ওটা পৌঁছুতে পারবে না।
বিষয়টা বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল গানথার। কপ্টারের গতিকে সামনের দিকে না দিয়ে উপরের দিকে দিল ও। দ্রুতগতির লিফটের মতো শাশা করে ওদের এ-স্টার উপরে উঠতে শুরু করল।
এ-স্টারকে আবার ভিন্ন দিকে এগোতে দেখে টাইগার কিছুটা ভড়কে গেল। ওটার পিছু নিতে একটু সময় লাগল ওটার তবে ধাওয়া করতে ছাড়ল না।
উচ্চতা দেখার জন্য অ্যালটিমিটার দেখল ক্রো। এ-স্টার কপ্টার ব্যবহার করেই হেলিকপ্টার দিয়ে সর্বোচ্চ উচ্চতায় ওঠার বিশ্ব রেকর্ড করা হয়েছিল। রেকর্ড গড়ার সময় সেই কপ্টার এভারেস্টের চুড়োয় ল্যান্ড করেছিল তখন। যদিও আজকে ওদের অত উঁচুতে উঠতে হবে না। ২২ হাজার ফুট উচ্চতা পার হওয়ার পর থেকে টাইগারের রোটর প্রাণপণে ঘুরছে কিন্তু আর উপরে উঠতে পারছে না। অস্ত্র আর মিসাইলের ওজন এর জন্য দায়ী।
আপাতত পেইন্টারের এ-স্টার নিরাপদে উর্ব গগনে যাত্রা করতে পারছে।
কিন্তু উপরে তো আর সারাজীবন থাকতে পারবে না।
নামতে ওদের হবেই।
পানির নিচে থাকা ক্ষুধার্ত হাজারের মতো ওদের জন্য নিচে টাইগার কপ্টার অপেক্ষা করছে। পেইন্টার দেখল বাকি দুই টাইগারও এখানে হাজির হয়ে যাবে একটু পর। আসছে ওগুলো। দিক পরিবর্তন আর দ্রুতগতির ধাওয়ার ফলে ওরা একটু পিছিয়ে পড়েছিল।
কপ্টারের উপরে যাও, এত হাতের উপরে আরেক হাতের তালু এনে ইশারা করে দেখাল ক্রো।
বিষয়টা গানথার বুঝতে পারল না ঠিকই তবে আদেশ পালন করল।
পেছন ফিরল পেইন্টার। তোমাদের দুজনকে কাজ দিচ্ছি। দুপাশের জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখো। টাইগারটা যখন একদম ঠিক ঠিক আমাদের কপ্টারের নিচে থাকবে জানাবে আমাকে।
দুই নারী মাথা নেড়ে সায় দিল।
সামনে থাকা একটা লিভারের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকাল ক্রো।
চলে এসেছি প্রায়! চিৎকার করে লিসা জানান দিল।
একদম! এক সেকেন্ড পরে বললেন অ্যানা।
পেইন্টার ওর সামনে থাকা লিভারটা টেনে দিল। কপ্টারের নিচে থাকা হার্নেস নিয়ন্ত্রণ করে এই লিভার। এই হার্নেসের সাহায্যেই তখন পেইন্টার রশি দিয়ে ঝুলে ছিল। তবে এবার কোনো রশি নামানো হয়নি। কোনো কারণে হার্নেস যদি জ্যাম হয়ে যায় তাহলে আপদকালীন মুহূর্তে ওটাকে ফেলে দেয়ার জন্য এই লিভার রাখা হয়েছে। লিভারটা পুরোপুরি টেনে দিল ক্রো। শুনতে পেল কপ্টারের নিচ থেকে পটাশ শব্দ করে হার্নেসের কপিকল ছিটকে পড়ে গেল।
