এই চেম্বারটাও গোল কিন্তু এখানে কোনো জানালা নেই। দেয়ালে থাকা কয়েকটি মোমদানি থেকে আলো ছড়াচ্ছে। তাতে অন্ধকার পুরোটা দূর হয়নি, আধো-আলো, আঘো-অন্ধকার হয়ে আছে চেম্বারটা। ১২টা গ্রানাইট কলাম দাঁড়িয়ে আছে চেম্বারের চারদিক জুড়ে। ছাদের অংশটুকু ডোম আকৃতির। নিচ থেকে তাকালে দেখা যায়, ছাদের গায়ে একটা স্বস্তিকা আঁকা আছে।
এটা হচ্ছে ক্যাসলের ভূগর্ভস্থ কক্ষ। জানালেন আলমস্ট্রম। রুমের মাঝখানে একটা কূপ আছে। মারা যাওয়া এসএস অফিসারদের কোট আনুষ্ঠানিকভাবে পুড়িয়ে ওখানে ফেলা হতো।
ইতোমধ্যে পাথুরে কূপটা গ্রের চোখে পড়েছে। উপরে আঁকা স্বস্তিকার ঠিক নিচেই আছে ওটা।
আপনারা যদি কূপের কাছে দাঁড়িয়ে দেয়ালের দিকে তাকান তাহলে এখানে চিত্রিত Mensch বর্ণমালাগুলো দেখতে পাবেন।
ডিরেক্টরের কথা মতো কূপের কাছে গেল গ্রে। পাথরে দেয়ালে বর্ণমালাগুলো আঁকা রয়েছে। এখন গ্রে আলমস্ট্রমের কথার মানে বুঝতে পারল। বর্ণের সাথে কিছু থাকলে বর্ণের প্রকৃত মর্ম বোঝা যায়…
এখানে থাকা সব বর্ণমালা উল্টো করে লেখা।
Toten-runes অর্থাৎ, মৃত্যুর বর্ণ।
আবার দড়াম করে শব্দ হলো। একটু আগেও এরকম শব্দ হয়েছিল। এবারের শব্দ পুরো প্রতিধ্বনি তুলল পুরো চেম্বার জুড়ে। তবে এবার কারেন্ট গেল না, কারণ এই চেম্বারে তো কারেন্ট-ই নেই। ভুল বুঝতে পেরে ঘুরল গ্রে। কৌতূহলের কারণে নিরাপত্তার দিক ভুলে গিয়েছিল ও। ড, আলমস্ট্রম ঘুরে ফিরে সবসময় দরজার কাছেই ছিলেন। দরজা থেকে খুব একটা দূরে কখনই সরেননি।
ডিরেক্টর এখন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তালা লাগিয়ে দিচ্ছেন।
কাঁচের ওপাশ থেকে চিৎকার করে বললেন তিনি, এবার আপনারা মৃত্যুর বর্ণ এর আসল মর্ম বুঝতে পারবেন। দরজার কাঁচটা নিশ্চয়ই বুলেটপ্রুফ।
আরেকটা শব্দ হলো। সব মোমবাতি নিভে গেল এবার। কোনো জানালা না থাকায় পুরো চেম্বারে কালি গোলা অন্ধকার নেমে এলো।
বিস্ময়ের ধাক্কায় সবাই চুপ হয়ে আছে। এমন সময় হিংস্র হিসহিসানির আওয়াজ হলো।
তবে আওয়াজটা কোনো সাপ থেকে আসেনি।
জিহ্বায় অন্যরকম স্বাদ পেল গ্রে।
গ্যাস।
.
দুপুর ১টা ৪৯ মিনিট।
হিমালয়।
হেলিকপ্টার তিনটি আক্রমণ করার জন্য ধেয়ে আসছে।
বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে কপ্টারগুলোকে পর্যবেক্ষণ করল পেইন্টার। বেল্ট খুলে কো-পাইলটের সিটে নিজের সুবিধামতো অবস্থানে বসল ও। ধেয়ে আসা কপ্টারগুলোকে চিনতে পেরেছে : ইউরোকপ্টার টাইগার, ওজনে মাঝারি, গান পড় আর মিসাইলের ব্যবস্থা আছে। উড়তে উড়তে অন্য কোনো আকাশযানে হামলা করার সামর্থ্য রাখে ওগুলো।
আমাদের কপ্টারে কোনো অস্ত্র আছে? গানথারকে জিজ্ঞেস করল পেইন্টার ক্রো।
গানথার মাথা নাড়ল। নেই।
পেছন থেকে ধেয়ে আসতে থাকা শত্ৰু কপ্টারের হাত থেকে বাঁচার জন্য নিজের কপ্টারের গতি বাড়িয়ে দিল গানথার। এই একটা অস্ত্র-ই ওদের কাছে আছে। সেটা হলো : গতি।
ওদের এই এ-স্টার কপ্টার ওজনে হালকা, অস্ত্র ও গোলা-বারুদ না থাকায় বাড়তি কোনো ওজন নেই, চটপট এদিক-ওদিক ঘোরানো যায়। এ-স্টার কপ্টারের সুবিধা বলতে এগুলো-ই। একদম সীমিত।
ধাওয়া খেয়ে গানথার কোন দিকে এগোচ্ছে সে-সম্পর্কে পেইন্টারের পরিষ্কার। ধারণা আছে। এই অঞ্চলের ম্যাপ দেখে নিয়েছে ও। মাত্র ৩০ মাইল সামনেই চীনা সীমান্ত।
পেছনের হেলিকপ্টারগুলো থেকে রক্ষা পেলেও চীনা আকাশ রক্ষীরা ওদেরকে ছাড়বে না। তার ওপর বর্তমানে নেপাল সরকার আর মাওবাদীদের মধ্যে চলমান গণ্ডগোলের কারণে চীনা সীমান্তে কড়া পাহাড়া দেয়া হচ্ছে। পেইন্টারদের অবস্থা খুব করুণ। অনেকটা জলে কুমীর, ডাঙায় বাঘ-এর মতো।
হঠাৎ অ্যানা চিৎকার করে উঠলেন। মিসাইল!
তার চিৎকারের আওয়াজ শেষ হতে না হতেই ওদের কপ্টারের পাশ দিয়ে ধোয়া তুলে একটা মিসাইল বেরিয়ে গেল। মাত্র কয়েক ফুটের জন্য মিস করে গেছে। সামনে থাকা একটা পাহাড়ের গায়ে গিয়ে আঘাত করল মিসাইল। উপত্যকার বড় একটা অংশ মিসাইলের আঘাতে ধসে গেল। আগুন আর পাথরের মিশ্রণ ছিটকে উঠল উপরে।
বিক্ষিপ্তভাবে ছিটকে আসা বিভিন্ন টুকরো থেকে বাঁচতে গানথার হেলিকপ্টারকে সরিয়ে নিল।
পাহাড়ের দুই ঢালের ভেতর দিয়ে হেলিকপ্টারকে উড়িয়ে নিল ও। সরাসরি ওদের গায়ে এখন মিসাইল লাগানো সম্ভব হবে না।
আমরা যদি নিচে নেমে দ্রুত দৌড় দেই… বললেন অ্যানা।
পেইন্টার মাথা নাড়ল। কপ্টারের ইঞ্জিনের আওয়াজকে ছাপিয়ে যাওয়ার জন্য উঁচু কণ্ঠে বলল, এই টাইগার কপ্টারগুলোকে আমার চেনা আছে। ইনফ্রারেড আছে ওগুলোতে। আমাদের শরীরের তাপমাত্রার চিহ্ন ওরা পাবেই। নিচে নেমে কোনো লাভ হবে না। নিচে নামলে পিস্তল কিংবা মিসাইল… কোনোকিছু থেকেই মুক্তি নেই।
তাহলে আমরা কী করব?
ওই সাদা আলোর বিস্ফোরণের পর থেকে পেইন্টারের মাথা এখনও ধরে আছে। ও ঠিকভাবে মাথা খাটাতে পারছে না।
পেছনের সিট থেকে সামনে ঝুঁকে কম্পাস দেখতে দেখতে লিসা বলল, এভারেস্ট।
কী?
আমরা তো এখন এভারেস্টের দিকে এগোচ্ছি। কম্পাস দেখি বলল লিসা। আমরা যদি ওখানে ল্যান্ড করে পর্বতারোহীদের মাঝে মিশে যেতে পারি…
লিসার পরিকল্পনাটা মাথায় রাখল ক্রো। আইডিয়া মন্দ নয়।
ঝড়ের ফলে পাহাড়ে আরোহীদের নির্ধারিত শিডিউল পিছিয়ে গেছে। আমি যখন ওখান থেকে রওনা হয়েছিলাম তখন প্রায় ২০০ জন ব্যক্তি ভাল আবহাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। কিছু নেপালিজ সৈনিকও ছিল তার মধ্যে। মঠে আগুন লাগার পর নেপালিজ সৈন্যদের পরিমাণ হয়তো আরও বেড়েছে।
