নর্থ টাওয়ার এদিকে, বললেন ড, আলমস্ট্রম।
মনক, গ্রে ও ফিওনাকে মেইন হলের পেছন দিকে নিয়ে গেলেন ডিরেক্টর। রায়ান একটু আগে মিউজিয়ামের এক স্লিম মহিলা দলিল তত্ত্বাবধায়কের সাথে চলে গেছে। হিউগো হিরজফিল্ডের চিঠিপত্র কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেলে সেগুলো কপি করে আনবে সে। কিছু জিনিস গ্রে নিজে নিজে উপলব্ধি করতে পারলেও সবকিছু পরিষ্কার হওয়ার জন্য ওর আরও তথ্য প্রয়োজন।
তথ্য হাতে না আসা পর্যন্ত ডিরেক্টরের সাথে হিমল্যারের এই ক্যাসল ঘুরে দেখা যাক। এখান থেকেই হিউগো সাহেব নাৎসিদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। গ্রে বুঝতে পারল, সামনে এগোতে হলে ঘটনার পেছনের গল্প জানতে হবে। আর সেই গল্প শোনানোর জন্য স্বয়ং মিউজিয়াম ডিরেক্টরের চেয়ে ভাল আর কে হতে পারে?
নাৎসিদেরকে ভালভাবে বুঝতে হলে, সামনে এগোতে এগোতে আলমস্ট্রম বললেন, প্রথমে তাদেরকে একটা রাজনৈতিক পার্টি হিসেবে মনে করা বন্ধ করতে হবে। তারা নিজেদেরকে Nationalsozialistische Deutsche Arbeiterpartei বলে ডাকত। ইংলিশে বললে… ন্যাশনাল স্যোসালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি… নামে একটা দল হলেও তারা আসলে কাল্ট ছিল।
কাল্ট? প্রশ্ন করল গ্রে।
এসব প্রতীক আর চিহ্ন নিয়েই তো তাদের কারবার ছিল, তাই না? একজন আত্মাধিক নেতা ছিল তাদের যাকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। সেই নেতার সব অনুসারীরা আবার একই রঙের পোশাক পরে। গোপনে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান আর রক্ত দিয়ে প্রতিজ্ঞা করানো হতো। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো উপাসনা করার জন্য শক্তিশালী চিহ্ন তৈরি। জার্মান ভাষায় যেটার নাম Hakenkreluর, অর্থাৎ—ভাঙ্গা ক্রস। যেটাকে স্বস্তিকা নামেও ডাকা হয়ে থাকে।
হরে কৃষ্ণ-ও বলা যায়। বিড়বিড় করল মনক।
মজা করবেন না। নাৎসিরা এসবের ক্ষমতা বুঝতে পেরেছিল। বন্দুক কিংবা রকেটের চেয়েও এসবের শক্তি বেশি। ধর্ম দিয়ে পুরো একটা জাতির মগজধোলাই করে বশে আনা যায়। নাৎসিরা সেটাই করেছিল।
বিদ্যুৎ চমকাল বাইরে। বজ্রপাতের কম্পন ওদের পায়ের তলা পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিল। মিট মিট করল লাইট। বন্ধ হয়ে চাচ্ছে।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়ল সবাই।
একটা চামবাদুড়… বিড়বিড় করে মনে করিয়ে দিল মনক। যদি একটা ছোট বাদুড়ও বের হয় রে…।
আলো বাড়ল লাইটের। সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সামনে এগোল ওরা। হলের এ-অংশ একটা কাঁচের দরজার সামনে গিয়ে শেষ হয়েছে। বড় একটা রুম আছে দরজার ওপাশে।
obergruppenfahrersaal, এক গোছা ভারি চাবি বের করে দরজা খুলতে খুলতে বললেন আলমস্ট্রম। এটা হলো ক্যাসলের ভেতরের পবিত্র স্থান। সাধারণ দর্শনার্থীদেরকে এটা দেখতে দেয়া হয় না। তবে আপনাদের কথা আলাদা।
দরজা খুলে ওদেরকে ঢুকতে দিলেন তিনি।
ভেতরে ঢুকল ওরা। বৃষ্টির ছাট এসে জানালায় পড়ছে… সেটার প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে পুরো চেম্বার জুড়ে।
রাজা আর্থারের দুর্গের ভেতরের অংশের অনুকরণে হিমল্যার এই রুম বানিয়ে ছিলেন। এমনকি ওক কাঠ দিয়ে বিশাল এক গোল টেবিলও বানিয়ে ছিলেন তিনি। ব্ল্যাক অর্ডার প্রজেক্টের ১২ জন অফিসার সাথে নিয়ে এখানে মিটিং ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করতেন।
ব্ল্যাক অর্ডার জিনিসটা কী? মনক প্রশ্ন করল।
এটা হিমল্যারের এসএস-এর আরেক নাম। তবে আরেকটু সঠিকভাবে বলতে গেলে…schwarze Auftrag…ব্ল্যাক অর্ডার…নামটা হিমল্যারের ভেতরের গোষ্ঠীদের দেয়া ছিল। একটা গোপন চক্র যাদের শিকড় গিয়ে ঠেকেছে ঠুলি সোসাইটিতে।
মনোযোগ দিল গ্রে। ঠুলি সোসাইটির কথা উঠেছে আবার। হিমল্যার এই দলের সদস্য ছিলেন, রায়ানের প্রপিতামহ হিউগো হিরজফিল্ডও সদস্য ছিলেন এখানকার। যোগসূত্র পাওয়া গেল। এই গুপ্ত চক্রের সদস্য ও বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতো এককালে উন্নত প্রজাতির মানুষেরা পৃথিবীতে রাজত্ব করে গেছে এবং সামনে আবার করবে।
ডিরেক্টর বলে যাচ্ছেন, হিমল্যার বিশ্বাস করতেন এই রুম আর টাওয়ার হলো নতুন আর্য জাতির আত্মাধিক ও ভৌগোলিক কেন্দ্রস্থল।
কেন? প্রশ্ন করল গ্রে।
শ্রাগ করে রুমের মাঝখানে গেলেন ড. এই অঞ্চলেই টিউটন-রা রোমানদেরকে পরাজিত করেছিল। জার্মানির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল সেটা।
রায়ানের বাবার কাছ থেকেও গ্রে এরকম একটা গল্প শুনে এসেছে।
তবে এখানে আরও কিছু কারণ থাকতে পারে। লোককাহিনি এখানে খুবই শক্তিশালী। এই ব্যাপারে এখানকার অবস্থা অনেকটা সেই আদিম পাথুরে যুগের মতো। অনেকে বলে থাকে নরস ওয়ার্ল্ড ট্রির শেকড়ইগড্রাসিল, এটার নিচে অবস্থিত। এছাড়া ডাইনিরা তো আছেই।
তাদেরকে এখানে খুন করা হয়েছিল, বলল গ্রে।
প্যাগান ধর্মের অনুসারী বলে মহিলাদেরকে খুন করা উচিত বলে হিমল্যার বিশ্বাস করতেন কিংবা ন্যায্য বলে মনে করতেন। স্ক্যান্ডেভিয়ান আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে মহিলারা। তাই তাদের রক্ত দিয়ে এই ভূমি পবিত্র করা হয়েছিল।
যে প্রতিষ্ঠানগুলো জমি-ফ্ল্যাট বিক্রি করে ব্যাপারটা অনেকটা তাদের মতো হয়ে গেল, আবার বিড়বিড় করল মনক। জায়গা, জমি নিয়ে বকবক করে সবাই।
মনকের এরকম উদ্ভট মন্তব্য শুনে ভু কুঁচকালেন আলমস্ট্রম। সে যা-ই হোক, এই হলো উইউইলসবার্গ-এর গোড়াপত্তনের কাহিনি। মেঝের দিকে নির্দেশ করলেন তিনি।
