রিয়ারভিউ আয়নায় রায়ানকে পর্যবেক্ষণ করল গ্রে। মনক আর ফিওনার উপস্থিতিতে বেচারাকে একটু নার্ভাস মনে হচ্ছে।
আপনি আমাদেরকে কী যেন জানাবেন? গ্রে প্রশ্ন করল।
রায়ানের দৃষ্টি আয়নায় পড়ায় গ্রের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল ওর। ঢোক গিলে মাথা নাড়ল। আমার বাবা মনে করে, আমি হিউগো সম্পর্কে কিছুই জানি না। তার ধারণা, অতীতকে মাটিচাপা দিয়ে রাখাই ভাল। কিন্তু শাক দিয়ে কি আর মাছ ঢাকা যায়? ঘটনা কখনও চাপা থাকে না। গুঞ্জন ঠিকই শোনা যায়। ফুফি টোলার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
বিষয়টা গ্রে বুঝতে পারল। পরিবারের গোপন জিনিসগুলো আপনা আপনি উপরে উঠে আসে। যতই গভীরে সেগুলোকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন, লাভ হয় না। যুদ্ধের সময় পূর্বপুরুষদের কার্যবিধি সম্পর্কে জানার কৌতূহল থেকেই হয়তো রায়ান এসব জানতে পেরেছে। ছেলেটার চোখ-মুখে সেটার ছাপ স্পষ্ট।
আপনি নিজে পরিবারের অতীত নিয়ে তদন্ত করেছেন? বলল গ্রে।
হ্যাঁ, তিন বছর ধরে। কিন্তু এসবের শিকড় আরও পেছনে। বার্লিন ওয়ালের ধ্বংস হওয়া কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়ন লুপ্ত হওয়া পর্যন্ত এর বিস্তার।
বুঝলাম না।
সোভিয়েতের ফাইলগুলো উন্মুক্ত করে দিয়েছিল রাশিয়া, মনে আছে আপনার?
আছে। কিন্তু ওগুলোর সাথে কী সম্পর্ক।
বেশ, উইউইলসবার্গ যখন আবার নির্মাণ করা…
দাঁড়ান! ফিওনা বাগড়া দিল। দুই হাত আড়াআড়ি রেখে রায়ানের পাশে বসে আছে ও। রায়ানের উপস্থিতিতে বোধহয় ও খুব একটা সন্তুষ্ট নয়। গ্রে কয়েকবার রিয়ারভিউ আয়নায় ওকে রায়ানের দিকে তাকাতে দেখেছে। রায়ানের ওয়ালেট এখনও বহাল তবিয়তে আছে কি-না ভাবছে গ্রে। আবার নির্মাণ? মানে ওই জঘন্য জিনিসটাকে তারা পুনরায় বানিয়েছিল? ফিওনা প্রশ্ন করল।
মাথা নাড়ল রায়ান। ক্যাসলটিকে এখন দেখা যাচ্ছে। সিগন্যাল দিয়ে গাড়িকে বার্গস্রাসের দিকে নিল গ্রে। এই রাস্তা ধরে এগোলে ক্যাসলে পৌঁছুনো যাবে। যুদ্ধের শেষ দিকে হিমল্যার এটাকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। শুধু উত্তর দিকের টাওয়ারটা অক্ষত ছিল। যুদ্ধের পর এটাকে পুনরায় নির্মাণ করা হয়। ১৯৭৯ সালে কাজ শেষ হয় এটার। বিগত সরকারের সাথে অনেক পিটিশন মোকাবেলা করার পর মিউজিয়ামের পরিচালকরা ক্যাসলের সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র সংগ্রহ করতে সক্ষম হন।
রাশিয়াসহ, বলল মনক।
Natirlich, একটি রেকর্ডে ভেজাল ছিল। পরিচালক তখন দলিল তত্ত্বাবধায়ককে রাশিয়ায় পাঠিয়ে দিলেন। তিন বছর আগে, এই অঞ্চলে রাশিয়ানদের কর্মযজ্ঞ সংক্রান্ত দলিল-পত্র ট্রাকভর্তি করে নিয়ে ফিরে আসেন তারা। রাশিয়ানদের সেই ফাইলগুলোর ভেতরে খোঁজ চালানোর জন্য একটা লম্বা তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। আমার প্র পিতামহ হিউগো হিরজফিল্ডের নামও ছিল সেখানে।
কেন?
ঠুলি সোসাইটির সাথে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ওরা ক্যাসলে আড্ডা দিত। প্রাচীন অক্ষর আর বর্ণমালা সম্পর্কে হিউগোর জ্ঞান ছিল সেটা সবাই জানতো তখন। হিমল্যারের ব্যক্তিগত জ্যোতিষী কার্ল উইলিগাটের সাথে তার পত্র যোগযোগ ছিল।
বাইবেলে থাকা সেই ত্রিশূল আকৃতির চিহ্নের কথা মনে করল গ্রে। তবে সে ব্যাপারে কিছু বলল না।
কয়েকটা বাক্সে আমার প্রপিতামহের তথ্য নিয়ে ফিরেছিলেন দলিল তত্ত্বাবধায়ক। আমার বাবাকে খবর দেয়া হয়েছিল কিন্তু তিনি যাননি।
কিন্তু আপনি গিয়েছিলেন? প্রশ্ন ছুড়ল মনক।
আমি তার সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে চাচ্ছিলাম, রায়ান জবাব দিল। কীভাবে… কেন… এসবের উত্তর… মাথা নাড়ল সে।
অতীতের শক্ত হাত আছে, যেটা কখনও বর্তমানকে ছাড়ে না।
তারপর কী জানতে পারলেন? এবার গ্রে প্রশ্ন করল।
বেশি কিছু নয়। একটা বাক্সে ছিল নাৎসি রিসার্চ ল্যাবের তথ্য, যেখানে আমার প্র-পিতামহ কাজ করতেন। তাঁর পদ ছিল : Oberarbeitsleiter। অর্থাৎ প্রজেক্টের প্রধান। শেষের শব্দগুলো একটু লজ্জা ও অবজ্ঞা মিশিয়ে উচ্চারণ করল রায়ান। তবে তারা যা নিয়েই কাজ করে থাকুক না কেন ওগুলো প্রকাশ করার মতো কিছু ছিল না। অধিকাংশ কাগজে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে লেখা ছিল। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব; এসব।
আপনি ওগুলো সব পড়ে দেখেছেন?
ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল রায়ান। আমার প্রপিতামহ তাঁর কাজ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে শুরু করেছিলেন কিন্তু প্রজেক্টও ছাড়তে পারছিলেন না, এটুকু জানতে পেরেছি।
তাহলে হয়তো তাকে গুলি করা হয়েছিল? বলল ফিওনা।
রায়ান মাথা নাড়ল। না, তা নয়। আসলে বিষয়টা এরকম, তিনি প্রজেক্টটা চালিয়ে যেতে পারছিলেন না আবার ছেড়েও দিতে পারছিলেন না।
গ্রে টের পেল রায়ানও ওদের মতো অতীত নিয়ে ঘেঁটে দেখেছে।
মটমট শব্দে নিজের ঘাড় মটকালো মনক। এগুলোর সাথে ডারউইন বাইবেলের কোনো সম্পর্ক আছে? আলোচনাকে মূল প্রসঙ্গে ফিরিয়ে আনল।
আমি একটা নোট খুঁজে পেয়েছিলাম, জবাব দিল রায়ান। প্রপিতামহ তাঁর মেয়ে টোলাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন ওটা। তাতে লেখা ছিল এক বাক্স বই তিনি এস্টেটের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। বিষয়টা আমার পরিষ্কার মনে আছে কারণ, নোটটা একটু অদ্ভুত ছিল।
কী লিখেছিলেন তিনি?
এখানকার জাদুঘরে চিঠিটা রাখা আছে। চাইলে দেখতে পারবেন, কপি করেও নিতে পারবেন যদি প্রয়োজন হয়।
