ভলিউম ঠিক আছে তো?
দরজার ওদিকে আওয়াজ ভেসে আসছে, শুনতে পেল লিসা। ও জানে দরজায় গার্ড পাহারা দিচ্ছে। কিন্তু আওয়াজ কীসের? অ্যানা ফিরছেন নাকি? স্যাবোটোজকারীকে পাওয়া গেছে? মইয়ের দিকে এগোল লিসা। ও মনে মনে আশা করল, পেইন্টারও যেন লিসার সাথে থাকে। পেইন্টারকে ছেড়ে একা থাকতে ওর ভাল লাগছে না। সে হয়তো এই অদ্ভুত থিওরির মাথামুণ্ড বের করতে পারবে।
মইয়ের কাছে পৌঁছে নিচে নামতে শুরু করল লিসা। প্রথম ধাপে পা রেখেছে মাত্র।
এমনসময় তীক্ষ্ণ চিৎকারে ও নিজের জায়গায় থমকে দাঁড়াল। চিৎকারটা শুরু হতে গিয়েই থেমে গেছে।
দরজার ঠিক বাইরে হয়েছে সেটা।
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ফলস্বরূপ লিসা নিজেকে উপরে তুলে বেলকুনিতে চলে গেল। ছায়ায় আশ্রয় নিল ও।
লিসা চুপ করে ছায়ায় ঘাপটি মেরে আছে। এমতাবস্থায় রুমের দরজা একবার খুলে বন্ধ হলো। রুমে ঢুকল একজন। নারী। তার পরনে সাদা পরিকা। কিন্তু এই নারী তো অ্যানা নন। পারকার হুড নামিয়ে একটি স্কার্ফ খুলল সে। সাদা চুল আর ভূতের মতো ফ্যাকাসে চেহারা তার।
এই নারী বন্ধু নাকি শত্রু?
সেটা না জানা পর্যন্ত লুকিয়ে থাকবে লিসা।
এই মহিলাকে বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে। চোখ বুলিয়ে রুমে কী যেন খুঁজছে সে। আধ পাক ঘুরতেই তার জ্যাকেটে লেগে থাকা রক্ত চোখে পড়ল। তার হাতে একটি বাঁকানো কাটানা দেখা যাচ্ছে। এটা জাপানিজ ফলাযুক্ত জাপানিজ অস্ত্র। ওটার ফলা থেকে রক্ত চোয়াচ্ছে।
রুমের ভেতরে ধীরে ধীরে ঘুরছে সে।
অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
নিঃশ্বাস খুব সাবধানে ফেলছে লিসা। মনে মনে প্রার্থনা করল ছায়া যেন ওকে পুরোপুরি ঢেকে রাখে। লাইব্রেরির কয়েকটি বাতি নিচ তলা আলোকিত করে রেখেছে, এছাড়াও ফায়ারপ্লেসের আগুন যোগ করছে বাড়তি আলো। কাঠের আগুন পুড়ে পুড়ে হঠাৎ হঠাৎ আলোর পরিমাণ বেড়ে গেলেও উপরের তলা ততটা আলোকিত হলো না।
এই আলোক সল্পতা কী ওর লুকিয়ে থাকার জন্য যথেষ্ট? লিসা দেখল আগন্তক মহিলাটি আরেকবার চক্কর দিয়ে রুমের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। রক্তাক্ত কাটানা হাতে ধরা আছে, একদম প্রস্তুত।
সন্তুষ্টচিত্তে মহিলাটি অ্যানার ডেস্কের দিকে এগোল। ডেস্কের ওপরে থাকা এলোমেলো কাগজপত্র এড়িয়ে চওড়া টেবিলের পেছনে চলে গেল সে। দেয়ালের গায়ে ঝুলতে থাকা কাপরের তৈলচিত্রের কাছে গিয়ে সেটাকে সরিয়ে ফেলল। ওটা সরাতেই দেখা গেল দেয়ালে একটি লোহার সিন্দুক সেট-আপ করা আছে।
চিত্রটিকে একপাশে ধরে রেখে কম্বিনেশন লক, হ্যাঁন্ডেল আর দরজার প্রান্ত পর্যবেক্ষণ করল মহিলা।
তাকে ওরকম মনোযোগী হতে দেখে একটু স্বস্তিতে শ্বাস ফেলল লিসা। চুরি যখন করতে এসেছে করুক। যা নিতে চায় নিয়ে চলে যাক। এই মহিলা যদি বাইরের গার্ডকে খতম করে ভেতরে ঢুকে থাকে তাহলে এটাকে নিজের সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। যদি কোনো ফোন যোগাড় করা যায়… কাজে লাগতো।
হঠাৎ জোরে আওয়াজ হওয়ায় চমকে গেল লিসা।
কয়েক ফুট দূরে শেলফ থেকে একটি ভারি বই আছড়ে পড়েছে বেলকুনির ওপর। ধাক্কার ঠেলায় পৃষ্ঠাগুলো এখনও উল্টাচ্ছে একা একা। লিসার মনে পড়ল, একটু আগে এই বইটা শেলফ থেকে বের করেছিল কিন্তু ঠিকভাবে জায়গামতো রাখেনি। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সেটার শাস্তি দিয়েছে। আস্তে আস্তে বইটাকে বাইরের দিকে টেনে নিয়ে আছড়ে ফেলেছে মেঝেতে।
নিচ তলায়, রুমের মাঝখানে এসে দাঁড়াল মহিলা।
তার আরেক হাতে এবার একটি পিস্তল শোভা পাচ্ছে, ওটা উপরের দিকে তাক করা।
লিসার লুকোচুরি খেলা শেষ।
.
সকাল ৯ টা ১৮ মিনিট।
বারেন, জার্মানি।
বিএমডব্লিউ-এর দরজা খুলল গ্রে। ভেতরে ঢুকবে এমন সময় ওর পেছনে হাঁক শুনতে পেল। হোস্টেলের দিকে ফিরল ও। ছাতা মুড়ি দিয়ে রায়ান হিরজফিল্ড ওদের দিকে ছুটে আসছে। বিজলির চমক আর বৃষ্টির জোয়ারে পার্কিং লটে ভিজে একাকার।
ভেতরে ঢোকো, মনক আর ফিওনাকে নির্দেশ দিল গ্রে।
রায়ান কাছে এসে গ্রের পাশে দাঁড়াল।
আপনারা ক্যাসলে যাচ্ছেন? ওদের দুজনের মাথার ওপর ছাতা ধরে বলল সে।
হ্যাঁ, কেন?
আপনাদের সাথে আমিও আসি?
আমার মনে হয় সেটার দরকার হবে না…।
গ্রেকে থামিয়ে দিল রায়ান। আমার প্রপিতামহ… হিউগো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন আপনারা। সেক্ষেত্রে আমি আপনাদেরকে আরও কিছু তথ্য দিতে পারি। তারজন্য আপনাদেরকে একটু কষ্ট করে ওই পাহাড়ে যেতে হবে।
দ্বিধা করল গ্রে। এই ছেলে নিশ্চয়ই ওর বাবার সাথে গ্রের কথাবার্তায় আড়িপেতে ছিল। নইলে এসব জানল কী করে? আর রায়ান কী এমন জানে যেটা ওর বাবা জানে না? সম্মতির অপেক্ষার আগ্রহ নিয়ে গ্রের দিকে তাকিয়ে আছে রায়ান।
যে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দিল।
ধন্যবাদ। ছাতা বন্ধ করে গাড়িতে চড়ে বসল রায়ান। ফিওনার পাশে নিজের জায়গা করে নিল।
ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি ছাড়ল গ্রে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ওরা এস্টেটের ড্রাইভওয়েতে চলে এলো।
হোস্টেলে থাকাটাই বোধহয় আপনার জন্য ভাল হতো, তাই না? সামনের সিট থেকে পেছন দিকে ফিরে বলল মনক।
এলিসা ফ্রন্ট ডেস্ক সামলে নেবে, রায়ান জবাব দিল। তাছাড়া ঝড়ো আবহাওয়ার ফলে সবাই ফায়ারপ্লেসের কাছে বসে থাকবে। তদারকি করতে খুব একটা কষ্ট হবে না।
