চিন্তা করতে গিয়ে আবার মাথাব্যথা শুরু করল পেইন্টারের।
ইন্ডাসট্রিয়াল এসপিয়োনাজের এই খেলায় ক্লাউসকে নিশ্চয়ই ডাবল এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কেউ একজন এখানকার সমান্তরালে রিসার্চ করে যাচ্ছে। এখন যেহেতু এই ক্যাসলের কাজ প্রয়োজনের অতিরিক্ত এগিয়ে যাচ্ছে তাই প্রতিযোগীকে ধ্বংস করে রাস্তা পরিষ্কার করতে যাচ্ছে কেউ।
আচ্ছা, ও কি সত্য কথা বলেছে? প্রশ্ন করল গানথার।
একটু আগে এই বিশালদেহির ভেতরে যে দ্বিধা তৈরি হতে দেখেছিল সেটা ভাবল পেইন্টার। নিজের আর বোনের চিকিৎসার আশ্বাস তাকে দ্বিধায় ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু সে-সব ক্লাউসের সাথে মারা গেছে।
তবে ওরা হাল ছাড়েনি।
হাঁটু গেড়ে বসল অ্যানা। ক্লাউসের পকেট থেকে একটি ছোট ফোন বের করল। আমাদেরকে দ্রুত কাজ করতে হবে।
আপনি সাহায্য করতে পারবেন? ফোন দেখিয়ে পেইন্টারকে জিজ্ঞেস করল গানথার। ফোনের অপর পাশে কে কথা বলেছে সেটা জানতে পারলে ওদের আশা এখনও বাঁচবে।
যদি কল ট্রেস করা যায়… উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন অ্যানা।
মাথা নাড়ল পেইন্টার। না, অক্ষমতার জন্য নয়। আসলে ওর চোখ ব্যথা করছে। মাইগ্রেনের যন্ত্রণায় দপদপ করছে মাথা। তবে ওর মাথা নাড়ার কারণ এগুলোও নয়।
কিছু একটা… ধরবে ধরবে করছে কিন্তু ধরতে পারছে না…
ওর কাছে এগিয়ে এলেন অ্যানা, ওর কনুই ছুঁয়ে বললেন, এতে আমাদের দুপক্ষেরই…
জানি আমি, ঝামটা দিল পেইন্টার। এখন মুখ বন্ধ রাখুন! আমাকে ভাবতে দিন।
ওর কনুই ছেড়ে দিলেন অ্যানা।
পেইন্টারের হঠাৎ গর্জনে পুরো রুম একদম চুপচাপ হয়ে গেছে। ওর মনে কিছু একটা খচখচ করে যাচ্ছে… ও সেটাকে বের করতে চাইছে কিন্তু হচ্ছে না। একধরনের মানসিক যুদ্ধ করছে ও।
স্যাট-ফোন… এই স্যাট-ফোনে কিছু একটা আছে… কিন্তু… মাথাব্যথার মধ্যে বিড়বিড় করল পেইন্টার। কিন্তু কী সেটা?
অ্যানা নরম স্বরে বললেন, কী বলতে চাচ্ছেন?
এবার মাথায় ধরেছে! ও এত বেখেয়ালি হলে কী করে?
ক্লাউস জানতে এই ক্যাসল ইলেকট্রনিক তদারকির অধীনে আছে। তারপরও ফোন করল কেন? নিজেকে কেন প্রকাশ করল? এই ঝুঁকি নেয়ার অর্থ কী?
ভয়ের ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল ওর শরীর দিয়ে। অ্যানার দিকে ঘুরল ও। গুজব। আমরা গুজব ছড়িয়ে ছিলাম কিছু জেরাম-৫২৫ এখনও অক্ষত আছে। এটা যে আসলে ভুয়া গুজব ছিল সেটা তো শুধু আমরাই জানতাম, তাই না?
রুমে উপস্থিত অন্যান্যে হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রেগেও গেল কয়েকজন। গুজব শুনে তাদের ভেতরে আশার সঞ্চার হয়েছিল। ভেবেছিল বেল হয়তো নতুন করে কার্যকর করা যাবে। অথচ এখন শোনা যাচ্ছে সেই গুজব-ই ভুয়া!
তবে এরা ছাড়া অন্য একজনও গুজবটিকে সত্য বলে ধরে নিয়েছিল।
গানথারও জানতো, জঘন্য একটা ভীতি নিয়ে বললেন অ্যানা।
হেলিপ্যাডের ওদিকে হেঁটে গেল পেইন্টার। ক্যাসলের নকশা কল্পনা করল ও। এখন ও বুঝতে পারছে ক্লাউস কেন এখান থেকে ফোন করেছিল। বেজন্মটা ভেবেছিল সে ধরা পড়বে না। এতটাই আত্মবিশ্বাস ছিল যে, ফোনটাকে দূরে সরিয়ে রাখারও প্রয়োজনবোধ করেনি। তবে হ্যাঁ, বেশ হিসেব কষে এই জায়গাটা ঠিক করেছে।
অ্যানা, আপনি যখন গুজব ছড়াচ্ছিলেন তখন কী এটাও বলে ফেলেছেন, জেরাম ৫২৫ কোথায় রাখা আছে। বিস্ফোরণের হাত থেকে ওটা কীভাবে রক্ষা পেল, বলে দিয়েছেন?
হুম, আমি বলেছিলাম জেরাম-৫২৫ একটা ভল্টে রাখা আছে।
ভল্ট? কীসের ভল্ট?
বিস্ফোরণস্থল থেকে দূরে। আমার স্টাডিতে। কেন?
স্টাডি হলো ক্যাসলের আরেক মাথায়।
আমাদের সাথে খুঁটিবাজি করা হয়েছে, বলল পেইন্টার। ক্যাসল মনিটর করা হচ্ছে জেনেও ক্লাউস এখান থেকে ফোন করেছিল। আপনার স্টাডি থেকে দৃষ্টি সরানোর জন্য আমাদেরকে ইচ্ছে করে এখানে নিয়ে এসেছে সে। কারণ, আপনার ছড়ানো গুজব অনুযায়ী, স্টাডির কোনো একটা গোপন ভল্টে জেরাম-৫২৫ রাখা আছে।
এখনও বুঝে উঠতে পারেননি অ্যানা, মাথা নাড়লেন।
ক্লাউসের ফোন করাটা ভুয়া ছিল। ওদের আসল উদ্দেশ্য হলো, সর্বশেষ বেঁচে যাওয়া জেরাম-৫২৫-এর ক্ষতি করা।
চোখ বড় বড় হয়ে গেল অ্যানার।
গানথারও বিষয়টা বুঝতে পেরেছে। দ্বিতীয় একজন স্যাবোটোজকারী আছে তাহলে।
হ্যাঁ, আমরা এখানে ছুটে এসেছি, এই সুযোগে সে জেরাম-৫২৫-এর দফারফা করবে।
আমার স্টাডি, পেইন্টারের দিকে ফিরে বললেন অ্যানা।
পেইন্টার কথাটির গভীরতা টের পেল। অ্যানার স্টাডিতে স্যাবোটোজকারীর তাপের মুখে কেউ একজন পড়তে যাচ্ছে।
.
লোহার মইয়ে চড়ে লাইব্রেরির উপরের অংশে এসেছে লিসা। এক হাত বেলকুনির রেলিঙে রেখে ঘুরে ঘুরে দেখছে।
গত এক ঘণ্টা যাবত কোয়ান্টাম মেকানিক্স সংক্রান্ত বিভিন্ন বই ও পেপার সংগ্রহ করেছে ও। খুঁজতে খুঁজতে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের মূল গবেষণাগ্রন্থও পেয়ে গেল। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক হলেন কোয়ান্টাম থিওরির জনক। এই থিওরিতে কণিকা সংক্রান্ত এক জগতের কথা বলা আছে, যেখানে এনার্জীকে ছোট ছোট প্যাকেটে টুকরো করা যায়। ওগুলোর নাম কোয়ান্টা, আর সেগুলো কণিকা ও তরঙ্গ দুইরকম আচরণ-ই করতে পারে।
এসব পড়ে মাথাব্যথা হয়ে গেল সিসার।
এসবের সাথে বিবর্তনের সম্পর্ক কোথায়?
হয়তো সেই উত্তরের ভেতরেই রোগের চিকিৎসা লুকিয়ে আছে।
এসব বাদ দিয়ে, শেলফ থেকে একটি বই নিল ও। কভার পড়ে দেখল। অক্ষরগুলো অস্পষ্ট।
