অনেকদিন চাপা থাকা ঘৃণা প্রকাশ পেল ওর চেহারায়। পেইন্টার ভেবে দেখল, এই লোকের শিরায় শিরায় রাগ-ঘৃণা জমানো ছিল। বছরের পর বছর ধরে অপমান সহ্য করেছে, এদিকে শারীরিকভাবেও বিকলাঙ্গ। সুস্থ হয়ে জন্ম নিয়ে রাজপুত্রের মতো ছিল অথচ এখন ব্যঙ্গ শুনতে হয়। পেইন্টার আন্দাজ করল, এর পেছনে শুধু রাগ, ক্ষোভ নয় আরও কিছু আছে। ক্লাউসকে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে কেউ।
কিন্তু কে সে?
ভাই, গানথারকে বলল ক্লাউস, এভাবে অর্ধ-মৃতের মতো বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না। আমাদের চিকিৎসা আছে। ওর কণ্ঠস্বরে আশার রেশ পাওয়া গেল। মানুষদের মধ্যে আমরা আবার রাজার আসন পেতে পারি।
আচ্ছা, বিশ্বাসঘাতকতা করার পেছনে তাহলে এই কাহিনি।
রোগমুক্তির আশ্বাস।
তবে গানথার এসবে টলল না। আমি তোমার ভাই নই, একদম মন থেকেই বলল সে। আমি কখনও রাজা ছিলাম না।
এই দুই ব্যক্তির মধ্যেকার ফারাকটা টের পেল পেইন্টার। গানখারের চেয়ে ক্লাউস বয়সে প্রায় এক যুগ বড়। সে একসময় এখানে রাজপুত্রের আদরে বড় হয়েছে,কিন্তু সেটা এখন শুধুই ইতিহাস। অন্যদিকে গানথারের জন্ম টেস্টের শেষে দিকে। অঙ্গহানি আর পাগলামোর ব্যাপারটা তখন মোটামুটি সবাই জানে। তাই গানথার জনের পর থেকে কখনই রাজপুত্রের সমাদর পায়নি। সে তার বর্তমান জীবনেই অভ্যস্ত হয়ে আসছে একদম ছোটবেলা থেকে।
এছাড়াও ওদের দুজনের মধ্যে জটিল একটা পার্থক্য আছে।
বিশ্বাসঘাতকতা করে তুমি অ্যানাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছ, বলল গানথার। তোমাকে এবং তোমাকে যে বা যারা সাহায্য করছে তাদের কাউকে আমি ছাড়ব না।
ক্লাউস দমল না। বলল, অ্যানাকেও সুস্থ করা সম্ভব। আয়োজন করা যাবে, সমস্যা নেই।
গানপারের চোখ সরু হয়ে গেল। ক্লাউস বুঝতে পারল গানথার দ্বিধায় পড়ে গেছে। গানথার নিজের কথা নয়, বোনের কথা চিন্তা করছে। ওকে মরতে দেব না।
গানথার আগে কী বলেছিল মনে করল পেইন্টার। অ্যানার কিছু হতে দেব না আমি। এই রোগ থামানোর জন্য যা দরকার হয় করব। তার মানে সে কী সবার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতেও প্রস্তুত? এমনকী বোনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে হলেও?
চিকিৎসা হবে, এই নিশ্চয়তা তোমাকে কে দিয়েছে? অ্যানা কঠিন গলায় প্রশ্ন করলেন।
হাসল ক্লাউস। তোমাদের চেয়ে অনেক ভাল মানুষ আমাকে এই কথা দিয়েছেন। এখান থেকে সরিয়ে নিতে হবে তোমাদের। অনেক কাজ করেছ এখানে। আর দরকার নেই।
উচ্চশব্দে কিছু একটা বিস্ফোরিত হলো পেইন্টারের হাতে। অ্যামপ্লিফায়ার শর্ট সার্কিট হয়ে ব্যাটারি ফেটে গেছে। জ্বলছে আঙুলগুলো। ধোঁয়া ওঠা স্যাট-ফোন হাত থেকে ফেলে দিল পেইন্টার। হেলিপ্যাডের দরজার দিকে তাকাল ও। মনে মনে বলল, যথেষ্ট সময় টিকেছিল অ্যামপ্লিফায়ারটি।
তবে এই বিস্ফোরণের ফলে শুধু পেইন্টারের-ই মনোযোগ সরে যায়নি, অন্য সবারও দৃষ্টি সরে গেছে। সবাই তাকিয়ে আছে ওর দিকে। এমনকি গানথারও বাদ যায়নি।
এই সুযোগে ক্লাউস একটি হান্টিং নাইফ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। গুলি ছুড়ল গানথার। কিন্তু ততক্ষণে ছুড়ি এসে গানপারের কাঁধের মাংসে জায়গা করে নিয়েছে। ক্লাউস ঝাঁপিয়ে এসে পড়েছে গানথারের ওপর।
খাবি খেয়ে ক্লাউসকে মেঝের উপর ছুঁড়ে ফেলল গানথার।
মেঝেতে আছড়ে পড়লেও ক্লাউস নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। পেট চেপে ধরল সচল হাত দিয়ে। পেটের জখম থেকে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কাশল ক্লাউস। আরও রক্ত বেরোল এবার। টকটকে লাল রক্ত। গানথারের ছোঁড়া গুলি ওকে বেশ মারাত্মকভাবে জখম করেছে।
অ্যানা তাড়াতাড়ি তার ভাই গানথারের কাছে গেলেন। ছুড়ির আঘাত পরীক্ষা করে দেখতে চান। কিন্তু গানথার তাকে সরিয়ে দিল। এখনও ক্লাউসের দিকে পিস্তল তাক করে রেখেছে সে। গানথারের হাতা চুঁইয়ে রক্ত পাথুরে মেঝেতে গিয়ে পড়ছে।
হাসল ক্লাউস, বলল, মরবে তোমরা সবাই মরবে! রশির বিষ গেড়ো চেপে ধরলেই মরবে সবকটি!
আবার কাশল ও। রক্তের বন্যা বয়ে গেছে ওর আশেপাশে। শেষবারের মতো কেপে উঠে মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ল ক্লাউস। গানথার নিজের পিস্তল নিচু করল। ক্লাউসের দিকে পিস্তল তাক করে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। শেষ নিঃশ্বাস ফেলে বড়সড় দেহটা স্থবির হয়ে গেল।
মৃত।
এবার বোনকে জখমের পরিচর্চা করতে দিল গানথার। আপাতত এক টুকরো কাপড় দিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত স্থান বেঁধে দেয়া হলো, মূল পরিচর্চা পরে করা হবে।
ক্লাউসের লাশের পাশে গেল পেইন্টার। কিছু একটা ওর মনে খুঁতখুঁত করছে। রুমের বাকি সবাই চারিদিকে এসে দাঁড়াল। ভয় আর আশা মেশানো কণ্ঠে কথা বলছে তারা। ওরা শুনতে পেয়েছে চিকিৎসার ব্যাপারে শুনতে পেয়েছে।
পেইন্টারের সাথে অ্যানাও যোগ দিল। আমাদের টেকনিশিয়ান দিয়ে ওর স্যাটেলাইট পরীক্ষা করিয়ে নেব। হয়তো এখান থেকে সামনে এগোনোর সূত্র পাওয়া যেতে পারে স্যাবোটাজের পেছনে কার হাত আছে।
যথেষ্ট সময় নেই, বিড়বিড় করল পেইন্টার। অন্য সবকিছু বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু ভাবতে চেষ্টা করল। কিন্তু আসল ব্যাপারটাকে ধরি ধরি করেও কেন যেন ধরতে পারছে না।
লাশের পাশে হাঁটতে হাঁটতে ক্লাউসের কথাগুলো ভাবল ও।
…মানুষদের মধ্যে আমরা আবার রাজার আসন পেতে পারি।
…অনেক কাজ করেছ এখানে। আর দরকার নেই।
