সারি সারি স্টোর রুম পার হলো ওরা। ওগুলোর ভেতরে ব্যারেল, বাক্স, সিন্দুক দিয়ে বোঝাই হয়ে আছে। মিনিটখানেকের মধ্যে ওরা প্যাসেজের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেল। এখানকার বাতাস বেশ গরম, গন্ধকের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। বাহন থেকে নামতেই পেইন্টারের পায়ে হালকা কাপুনি অনুভূত হলো।
ওরা আসলে নিচে নয় উপরে যাচ্ছে।
এখান থেকে খাড়া ঢাল উঠে গেছে উপরে। বেশ চওড়া র্যাম্প। উপরে উঠে বিশাল ভোলা জায়গায় এসে পড়ল ওরা। কমার্শিয়াল এয়ারফিল্ডের মতো লাগছে জায়গাটিকে। ক্রেন, ফোর্কলিফট, ভারি যন্ত্রপাতি সবই আছে। মাঝখানে চুপ করে বসে আছে দুটো এ-স্টার ইকুইরিল হেলিকপ্টার। একটা সাদা, অন্যটি কালো। খেপে যাওয়া ভীমরুলের মতো দেখতে ওগুলো। অত্যধিক উচ্চতায় উড্ডয়নের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে।
ওদেরকে এগোতে দেখে বিশালদেহি ক্লাউস সামনে এগিয়ে এলো। অ্যানাকে ছাড়া অন্য কাউকে পাত্তাই দিল না। সব ঠিক আছে। খাস জার্মান ভাষায় জানাল সে।
একপাশে সারি সারি লোকজন দাঁড় করানো আছে। নারী-পুরুষ সবাই। এদেরকে পাহারা দিচ্ছে সশস্ত্র গার্ড।
কেউ ফসকে যায়নি তো? অ্যানা প্রশ্ন করলেন।
না, আমরা প্রস্তুত ছিলাম।
চারজন Sonnekonige-কে ক্যাসলের প্রত্যেক এক চতুর্থাংশে বসিয়ে দিয়েছিলেন অ্যানা, যাতে ক্যাসলের যে অংশে যারা আছে সেখান থেকে স্থান পরিবর্তন করতে না পারে। পেইন্টার স্যাবোটাজকারীকে ক্যাসলের যে অংশেই খুঁজে পাক না কেন তাকে ধরতে যেন কোনো অসুবিধা না হয়। এরকম অনুসন্ধান চলার ফলে স্যাবোটাজকারী সাবধান হয়ে যাবে, কোনো সন্দেহ নেই। তাই যা করার একবারেই করতে হবে। দ্বিতীয় কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে না।
বিষয়টি সম্পর্কে অ্যানাও জানেন। সামনে এগোলেন তিনি। পেয়েছ…?
পা ফেলতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে টলে উঠলেন। গানথার তাকে ধরে সোজা করে দাঁড় করাল, চেহারায় উদ্বিগ্নতার ছাপ স্পষ্ট।
আমি ঠিক আছি, বিড়বিড় করে ভাইকে আশ্বস্ত করলেন অ্যানা।
আমরা সবাইকে সার্চ করেছি, বলল ক্লাউস। অ্যানা হোঁচট খাওয়ার ব্যাপারটা যতটুকু সম্ভব এড়িয়ে গেল সে। এখানে কারও কাছে ফোন কিংবা অন্য কোনো ডিভাইস পাওয়া যায়নি। এবার হেলিপ্যাডে সার্চ শুরু করতে যাচ্ছিলাম আমরা।
ভ্রু কুঁচকালেন অ্যানা। ঠিক এই ভয়-ই পাচ্ছিলেন তিনি। স্যাবোটোজকারী তার কাজ শেষ করে ফোন বয়ে বেড়াবে না। বরং সেটাকে কোথাও ছুঁড়ে ফেলে দেবে, এটাই স্বাভাবিক।
কিংবা এমনও হতে পারে, পেইন্টার হয়তো হিসেবে ভুল করেছে।
সেক্ষেত্রে, পেইন্টারকেই নিজের ভুল শুধরে নিতে হবে।
অ্যানার পাশে এসে দাঁড়াল পেইন্টার। নিজের ডিভাইস বের করে বলল, আমি বরং ফোন খোঁজার কাজ শুরু করি।
সন্দেহের দৃষ্টিতে অ্যানা ওর দিকে তাকালেন। কিন্তু হাতে কোনো বিকল্পও নেই।সম্মতি দিয়ে মাথা নাড়লেন তিনি।
গানথারও লেগে রইল।
স্যাটেলাইট ফোন বের করে চালু করল পেইন্টার। মুখস্থ করে রাখা ৯ ডিজিটের নাম্বার চাপল। কিন্তু না, কিছুই হলো না। উপস্থিত সবার দৃষ্টি এখন ওর দিকে।
মনোঃসংযোগ করে আবার নাম্বারগুলো চাপল ও।
হচ্ছে না।
নাম্বার ভুল হয়েছে? ও কি নাম্বার গুলিয়ে ফেলেছে?
কী সমস্যা? প্রশ্ন করলেন অ্যানা।
ফোনের ছোট্ট ক্রিনের দিকে তাকাল পেইন্টার। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নাম্বারগুলো আবার পড়ল। ধরা পড়েছে। আমি শেষের দুই ডিজিট এদিক-ওদিক করে ফেলেছিলাম। ঠিক করছি।
মাথা ঝাঁকিয়ে নাম্বারগুলোকে আবার টাইপ করতে শুরু করল ও। মনোযোগ দিয়ে ধীরে ধীরে। অবশেষে ঠিকভাবে নাম্বার ভোলা হলো। বাটন চাপা শেষে চোখ তুলতেই অ্যানার সাথে চোখাচোখি হলো ওর। দক্ষতার অভাবে এই ভুল হয়নি, এই ভুল হয়েছে পরিস্থিতির চাপে কারণে। অ্যানা বিষয়টা বুঝতে পেরেছেন। সঠিকভাবে বাটন চাপতে পারাকে মানসিক তীক্ষ্ণতার পরিচায়ক হিসেবে ধরা হয়ে থাকে।
যদিও এটা একটা সাধারণ টেলিফোন নাম্বার।
তবে সাধারণ হলেও গুরুত্বপূর্ণ।
নাম্বার নিশ্চিত হয়ে ট্রান্সমিট বাটনে চাপ দিল পেইন্টার।
মিলিসেকেন্ড পর চেম্বারে একটি ফোন বেশ উচ্চ আওয়াজে বেজে উঠল।
সবকটি চোখ ঘুরল ওদিকে।
ক্লাউস।
সে এক পা পেছালো।
আপনাদের স্যাবোটাজকারী…ঘোষণা করল পেইন্টার।
অভিযোগ অস্বীকার করার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিল ক্লাউস… কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে হ্যান্ডগান বের করল। ওর চোখ-মুখ শক্ত হয়ে আছে।
সেকেন্ডের মধ্যে গানথার তার এমকে-২৩ পিস্তল দিয়ে ক্লাউসকে উপযুক্ত জবাব দিল।
ছুটল বুলেট।
অস্ত্রটি ছিটকে পড়ে গেল ক্লাউসের হাত থেকে।
সামনে এগিয়ে এসে গানথার নিজের ধোঁয়া ওঠা পিস্তলের ব্যারেল নিয়ে ক্লাউসের গালে ঠেসে ধরল। গরম মাজলের ছোঁয়া লাগতেই চরচর করে উঠল ঠাণ্ডা মাংস, দাগ বসে গেছে। কিন্তু ক্লাউস নির্বিকার। মুখ কুঁচকালো না পর্যন্ত! স্যাবোটোজকারীকে প্রাণে মারা যাবে না। প্রয়োজনীয় প্রশ্ন-উত্তরগুলো জানতে হবে। গর্জন করে প্রথম প্রশ্ন করল গানথার।
কেন? কীসের জন্য?
ভাল চোখ দিয়ে ওর দিকে তাকাল ক্লাউস। অন্য চোখ আগের জায়গায় চুপ করে রইল, প্যারালাইসিস। ওর ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি, খুব ভয়ানক দেখাচ্ছে সেটা। মেঝেতে চাটি মেরে বলল, Leprakonige দের অপমানকাল শেষ করার জন্য করেছি।
