যে অপরাধ সে করেছে তা আর করবে না সে প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদে স্নায়ুতে যখন জ্বালা ধরে যেত, তখন এইসব অনুনয় বিনয়েও তার কান্না পেত। এইসব আদুরে গলা তার ভেতরটা যতখানি ভাঙচুর করে দিত, নিরাপত্তারক্ষীদের বুটের লাথি আর ওজনদার ঘুষিগুলোও ততখানি কাবু করতে পারত না। ততক্ষণে সে স্রেফ একটি মুখ ছাড়া আর কিছু নয় যা শব্দ করে, একটি হাত ছাড়া কিছু নয় যা ইশারা করে। তার কাছে যেমনটি চাওয়া হয় সেই শব্দ কিংবা সেই ইশারাটি করে যাওয়াই তার কাজ। তার একটাই উদ্বেগ আর চাওয়া, তা হচ্ছে—সে বুঝতে চায় আসলে ওরা কী জানতে চায়, কোন স্বীকারোক্তিটি পেতে চায় তার কাছে। আর যখনই বুঝতে পারে তখনই, নতুন করে অপদস্থ হওয়ার আগেই দ্রুত স্বীকারোক্তি দিয়ে দেয়।
এরই মধ্যে দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের হত্যা করার স্বীকারোক্তি সে দিয়েছে, রাষ্ট্রদ্রোহী প্যাম্ফেলেট বিলি, সরকারি তহবিল তসরুপ, সামরিক গোপন তথ্য বিক্রি আর সব ধরনের নাশকতা চালিয়েছে বলেও স্বীকার করে নিয়েছে। সে আরো স্বীকার করেছে ইস্টেশীয় সরকারের বেতনভোগী চর ছিল সেই ১৯৬৮ সাল থেকে। স্বীকার করেছে, সে ছিল এক ধর্মবিশ্বাসী, পুঁজিবাদের সমর্থক আর বিকৃত যৌনাচারী। সে স্বীকার করেছে সে ছিল তার স্ত্রীর হন্তারক, যদিও সে জানে এবং প্রশ্নকর্তারাও অবশ্যই জানবেন তার স্ত্রী এখনো জীবিত। স্বীকারোক্তিতে সে আরো জানিয়েছে, গোল্ডস্টেইনের সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ, গোপন সংগঠনেরও সে একজন সক্রিয় সদস্য আর এর সবাইকেই সে চেনে। সব কিছু স্বীকার করে নেওয়া আর সবাইকে জড়িয়ে ফেলাই ছিল অপেক্ষাকৃত সহজ। তবে, এক অর্থে এর সবকিছুই তো সত্য। এত সত্যি যে, মনে মনে সে ছিল পার্টি বিরোধী, আর পার্টির চোখে কোনো কিছু মনে ভাবা আর কাজে করার মধ্যে কোনো ফারাক নেই।
অন্য ধরনের কিছু স্মৃতিও রয়েছে। সেগুলো যেন তার মন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝুলে আছে, ঠিক যেভাবে অন্ধকারে ঘিরে ঝুলে থাকে কিছু ছবি।
একটি কয়েদখানায় তাকে রাখা হয়েছিল সেখানে আলো ছিল, আবার অন্ধকারাচ্ছন্নও হয়ে থাকতে পারে, কারণ সেখানে একজোড়া চোখ ছাড়া আর কিছুই সে দেখতে পেত না। হাতের কাছে কিছু একটা যন্ত্র অবিরাম ধীর লয়ে টিক টিক শব্দ করে চলত। চোখ দুটো ক্রমেই বড় আর ভয়ঙ্কর হয়ে উঠত। হঠাৎই বিছানা ছেড়ে ভেসে উঠত তার গোটা শরীর, আস্তে আস্তে চোখ দুটির ভেতরে ঢুকে পড়ত, আর মনে হতো ওগুলো যেন তাকে গিলে খাচ্ছে।
কর্কশ আলোর নিচে ডায়াল ঘেরা একটি চেয়ারে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল। সাদা কোট পরা একজন সারাক্ষণ সেইসব ডায়াল থেকে রিডিং নিতেন। বাইরে ভারী বুটের টানা শব্দ। ক্যাচ-ক্যাচ শব্দ তুলে দরজা খুলে গেল। মোমমুখো অফিসার ভেতরে ঢুকলেন, পেছনে পেছনে ষণ্ডামার্কা দুই রক্ষী।
‘রুম ১০১’—বললেন অফিসারটি।
সাদা কোটধারী কিন্তু ঘুরলেন না, উইনস্টনের দিকে ফিরেও তাকালেন না, তখনও তার চোখ ডায়াল গুলোতেই স্থির।
একটি বিশাল বারান্দাপথ ধরে তাকে গড়িয়ে গড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, এক কিলোমিটার প্রশস্ত সেই পথ জ্বলজ্বলে সোনালি আলোয় ঝলমল, চারিদিক থেকে হাসি-ঠাট্টার গর্জন ভেসে আসছে। আর ভেসে আসছে উচ্চস্বরের সব স্বীকারোক্তি। সব কিছুই স্বীকার করে নিচ্ছিল সে। এতদিনে শত নির্যাতনের পরও যা কিছু নিজের মধ্যে ধরে রাখতে পেরেছিল তাও এবার গড়গড় করে বলে দিল। নিজের জীবনের গোটা ইতিহাস সে তাদের সামনেই আবার তুলে ধরছিল যা তারা আগে থেকেই জানে। তার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীরা, প্রশ্নকর্তারা, সাদা কোটধারীরা, ও’ব্রায়েন, জুলিয়া, মি. চ্যারিংটন সবাই একই করিডোরে অট্টহাস্যে চিৎকার করে করে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিছু কিছু বিষয় কখনো কখনো ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখা হতো, কিন্তু পরে তা কী করে যেন ভুলে এড়িয়ে চলে যেত, ফলে আর কখনোই ঘটত না। এক পর্যায়ে সবকিছুই যেন ঠিকঠাক হয়ে যায়, আর কষ্ট-বেদনা নেই, তার তখন শুধুই খালি পড়ে পড়ে থাকা, জেনে যাওয়া, ক্ষমা করে দেওয়া এক জীবন।
শক্ত তক্তার বিছানায় একটু নড়ে উঠল সে, অনেকটা আধা নিশ্চয়তায় মনে হলো, ও’ব্রায়েনের কণ্ঠই শুনতে পেয়েছে। পুরো জিজ্ঞাসাবাদে সে ও’ব্রায়েনকে আর একবারও দেখেনি, তবে তার মন বলত ও’ব্রায়েন ঠিক তার কনুইয়ের কাছে দাঁড়িয়ে, তবে দেখা যাচ্ছে না। ও’ব্রায়েনের নির্দেশেই সবকিছু হচ্ছে। এ যেন তিনিই, যিনি উইনস্টনের জন্য রক্ষীদের নিয়োজিত করছেন, তিনিই ওদের হাতে তার মৃত্যু ঠেকিয়েছেন। এ যেন তিনিই যিনি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন উইনস্টন কখন ব্যথায় কাতরাবে, কখন শ্বাস নেবে, কখন তাকে খাবার দেওয়া হবে, কখন ঘুমাবে, কখন তার বাহুতে ওষুধ ঢোকানো হবে। এ যেন তিনিই যিনি প্রশ্নগুলো করছেন আর উত্তর কী হবে তাও জানিয়ে দিচ্ছেন। তিনিই যন্ত্রণাদানকারী, তিনিই রক্ষাকারী, তিনিই অনুসন্ধানদাতা, আবার তিনিই বন্ধু। হঠাৎই—উইনস্টন মনে করতে পারে না ওষুধের প্রভাবে, ঘুমের ঘোরে, নাকি সে স্বাভাবিক ঘুমের মাঝে, নাকি পুরোপুরি সজাগ অবস্থাতেই—তার কানে বিড়বিড় করে একটি কণ্ঠ ধ্বনিত হলো: ‘ভয় নেই উইনস্টন, তুমি আমার জিম্মায় আছো। সাতটি বছর আমি তোমার ওপর নজর রেখেছি। এখন ক্রান্তিকাল এসে গেছে। আমিই তোমাকে রক্ষা করব, আমিই তোমাকে সঠিক পথে নিয়ে যাব। ’
