সেই যে, কনুইয়ে প্রথম আঘাত পড়ল তখন থেকেই দুঃস্বপ্নের শুরু। পরে সে অবশ্য বুঝতে পারে এই যা কিছু ঘটছে তা স্রেফ শুরু মাত্র, সব কয়েদীর ক্ষেত্রেই জিজ্ঞাসাবাদের এ এক সাধারণ প্রাথমিক প্রক্রিয়া। অপরাধের অন্ত নাই—ষড়যন্ত্র, নাশকতা আর এমন আরো অনেক—যা প্রত্যেককেই এক পর্যায়ে স্বীকার করে নিতে হবে। এই স্বীকারোক্তি স্রেফ এক আনুষ্ঠানিকতা, তবে নির্যাতন অবশ্যই এক বাস্তবতা। কতবার তাকে প্রহার করা হয়েছে, কতক্ষণ ধরে চলেছে সে প্রহার, সে মনে করতে পারে না। প্রতিবারই পাঁচ/ছয় জন কালো ষণ্ডামার্কা উর্দিধারী তাকে ঘিরে সক্রিয় হয়েছে। কখনো খালি হাতে কিল-ঘুষি, কখনো লাঠি কিংবা ইস্পাতের রড দিয়ে বেদম প্রহার, কখনো শক্ত বুটে কষে লাথি। মাঝে মাঝে সে কুঁকড়ে মেঝেতে পড়ে থেকেছে, পশুর মতো গড়াগড়ি খেয়েছে, আর শরীরকে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে, পেঁচিয়ে একেকটি লাথি আর লাঠিপেটা থেকে নিজেকে রক্ষা করার অবিরাম, নিষ্ফল চেষ্টা চালিয়ে গেছে। আর তার ফল হিসেবে পেয়েছে আরো লাথি, পেট, পাঁজর, কনুই, জঙ্ঘা, কুঁচকি, অণ্ডকোষ, মেরুদণ্ডের মূল হাড়—কোনোটিই বাদ যায়নি। কখনো কখনো যখন এমনটা চলতে থাকত তখন তার কাছে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, বাজে আর অক্ষমার্য বলে মনে হতো একটি বিষয়কে, তা হচ্ছে—রক্ষীরা তাকে পেটাচ্ছে কিন্তু এরপরেও সে অচেতন হয়ে যাচ্ছে না, কিংবা নিজেকে অচেতন করে ফেলতেও পারছে না। কখনো কখনো মস্তিষ্কানুভূতি তাকে এতটাই ছেড়ে চলে যেত যে সে ক্ষমার জন্য চিৎকার করতে থাকত। এমনকি মারধর শুরুর আগেই চিৎকার জুড়ে দিত। একেকটি ঘুষির জন্য হাত পাকানো দেখেই তার মন বাস্তব আর কল্পিত সকল অপরাধের জন্য স্বীকারোক্তি দিতে প্রস্তুত হয়ে যেত। আবার অন্যকোনো সময় সে সাব্যস্ত করে ফেলত—কিছুই স্বীকার করবে না। কষ্ট আর বেদনার্ততার মাঝ থেকেও একটি শক্তি বেরিয়ে আসত। আবার অন্যসময়, যখন কিছুটা দুর্বলচিত্ত হয়ে পড়ত, তখন নিজেই নিজেকে বলত, ‘স্বীকারোক্তি দেব, তবে এখনই নয়। এই যন্ত্রণা যতক্ষণ না পুরোপুরি অসহনীয় হয়ে পড়ে ততক্ষণ আমাকে শক্তি ধরে রাখতে হবে। আরো তিনটি লাথি, আরো দুটি লাথি বসবে, তারপর আমি সেই কথা বলব যা ওরা শুনতে চায়। ’
কখনো কখনো ওরা পেটাতে পেটাতে তার চলৎশক্তিটুকুও কেড়ে নিত, আর আলুর বস্তার মতো তাকে কোনো একটি কয়েদখানার মেঝেতে ছুড়ে ফেলে যেত, যাতে অবসাদ কাটিয়ে উঠতে পারে এরপর আবারও বের করে এনে আর আবারও পূর্ণোদ্যমে প্রহার শুরু করতে পারে। মাঝে মাঝে সময়টা একটু বেশিই পাওয়া যেত। তবে সেসময়ের কথা অতি অল্পই মনে পড়ে কারণ সে সময়টুকু ঘুমে কিংবা সংজ্ঞাহীনতায় কেটেছে তার। একটি কয়েদখানার কথা মনে পড়ে সেখানে ছিল তক্তার বিছানা, দেয়ালে ঝুলে থাকা তাকিয়া, টিনের বেসিন। খাবার হিসেবে পেত গরম স্যুপ, রুটি, কখনো কখনো কফিও মিলত। তার মনে আছে খিটমিটে মেজাজের এক নাপিত আসত দাঁড়ি কামিয়ে দিতে আর চুল কাটতে, আর কারবারিদের মতো দেখতে, অসহমর্মী সাদা কোটধারী লোকগুলো আসত কখনো নাড়ি দেখতে, তার ইচ্ছানিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়াগুলো যাচাই করতে, চোখের পাতা উল্টে, কর্কশ আঙুলগুলো দিয়ে ভাঙা হাড়গুলোর ওপর নির্মমভাবে ঘষাঘষি করে তারা দেখত আর পেশিতে সুঁই ফুটিতে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখত।
প্রহারের পৌনপৌনিকতা আর মাত্রা এক পর্যায়ে কমে আসে, কিন্তু সেটাই তখন হয়ে ওঠে আতঙ্কের আরেক নাম—এই বুঝি ফের শুরু হবে। কোনো একটি উত্তর মনঃপুত না হলেই প্রহারের ব্যবস্থা। এখন আর কালো উর্দিধারী ষণ্ডারা নয়, প্রশ্ন করছেন পার্টির বোদ্ধারা। নাদুসনুদুস চেহারার লোকগুলো দ্রুত হাত-পা নাড়িয়ে আর চশমায় ঝিলিক তুলে দীর্ঘ সময় ধরে প্রশ্নবান চালিয়ে যান। নিশ্চিত নয়, তবে তার ধারণা, একেক দফায় দশ-বারো ঘণ্টা ধরে চলে একেকটি জিজ্ঞাসাবাদ। এই প্রশ্নকারীরা তাকে নির্যাতনে জর্জরিত দেখেছেন কিন্তু তাতেও হয়ত তাদের মন যেন ভরে না। সে কারণেই তারা মুখে চাপড়ে, কান মলে, চুল টেনে, এক পায়ে খাড়া করিয়ে রেখে, প্রশ্রাবের বেগ চাপলেও আটকে রেখে, চোখ থেকে পানি বের হয়ে আসা পর্যন্ত কড়া তীর্যক আলো ফেলে কষ্ট দিয়েছেন।
এসবের একটাই উদ্দেশ্য ছিল—তাকে অপদস্থ করা আর যুক্তি তর্ক চালানোর শক্তি কিংবা যৌক্তিকতার বোধ ধ্বংস করে দেওয়া। মূল অস্ত্রই ছিল নির্মম সব প্রশ্নবাণ, আর একের পর এক, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই বাণ হেনে চলতেন তারা। থমকে দিয়ে, কথার ফাঁদ পেতে, বক্তব্য বিকৃত করে, পদে পদে মিথ্যাচারের দোষ দিয়ে, স্ববিরোধিতার ধুয়ো তুলে এই চেষ্টা চালিয়ে যান তারা, যতক্ষণ না স্নায়ু দৌর্বল্য কিংবা লজ্জায় ফুপিয়ে কেঁদে দিত—ততক্ষণ। কখনো একদফায় অন্তত আধা ডজনবার তাকে কাঁদতে হয়েছে। প্রতিবারই তারা চিৎকার করে ভর্ৎসনা করেছেন কিংবা উত্তর দিতে সামান্য ইতস্তত করলেই হুমকি-ধমকি দিয়েছেন, ফের নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে তুলে দেবেন এটাই ছিল হুমকি। আবার কখনো তাদের সুরটা পাল্টেও গেছে—তাকে কমরেড সম্বোধন করেছেন, ইংসক আর বিগ ব্রাদারের দোহাই দিয়ে অনুনয় বিনয় করে, দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানতে চেয়েছেন পার্টির প্রতি তার আর এতটুকু আনুগত্যও কি নেই?
