এটা সত্য আমাদের সমাজ স্তরে স্তরে বিন্যস্ত, আর সেই স্তরবিন্যাস অত্যন্ত অনমনীয়, প্রথম দর্শনে যা বংশানুক্রমিক বলেই মনে হবে। আন্তঃগোষ্ঠী যোগাযোগ পুঁজিবাদী সমাজে কিংবা প্রাক-শিল্পযুগে যেমনটা দেখা গেছে তেমনটা এখন খুব দেখা যায় না। পার্টির দুটি শাখার মধ্যে বিশেষ কিছু আন্তঃপরিবর্তন ঘটে কিন্তু তা ইনার পার্টির দুর্বলদের বের করে দেওয়া আর আউটার পার্টির উচ্চাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে যারা ক্ষতিকর নয় তাদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রলেতারিয়েতদের পার্টিতে অন্তর্ভূক্তির সুযোগ দেওয়ার চর্চা নেই। এদের মধ্যে যারা অতি অগ্রসরমান, যাদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে অসন্তোষ তাদের স্রেফ থট পুলিশের সহায়তায় চিহ্নিত করে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। তবে এই ব্যবস্থা স্থায়ী কিছু নয়, নয় কোনো নীতিগত বিষয়ও। পুরোনো বিশ্বের ধ্যান ধারণায় পার্টি চলে না। নিজেদের সন্তানদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার ইচ্ছাও পার্টির নেই, এমনকি যদি কখনো পার্টি পরিচালনার মতো দক্ষ হাত আর না থাকে তখন প্রলেতারিয়েতদের মধ্য থেকে পুরোপুরি নতুন একটি প্রজন্ম তুলে এনে নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারেও পার্টি প্রস্তুত থাকবে। সঙ্কটের বছরগুলোতে, পার্টির এই বংশানুক্রমিক ব্যবস্থার অনুপস্থিতির ভাবমূর্তি বিরোধী শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
সমাজতন্ত্রের অতীত ধারায় যখন ‘শ্রেণি সুবিধা’ নামের একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়তে হতো তখন এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে ওঠে যে, বংশানুক্রমিক না হলে কোনো কিছুকে স্থায়ীরূপ দেওয়া যায় না। তারা তখন বুঝতে পারেনি গোষ্ঠী শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য কোনো বাহ্যিক কাঠামো দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তারা এও বুঝতে চায়নি বংশানুক্রমিক আভিজাত্য বেশি দিন টেকে না, বরং ক্যাথলিক চার্চের মতো সবকিছুকে গ্রহণ করে নেওয়া সংগঠনগুলো শত শত কিংবা হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকে। গোষ্ঠীবদ্ধ শাসনের সারমর্ম এই নয় যে পিতার ক্ষমতা যাবে পুত্রের হাতে, তবে বিশ্বজুড়ে ধারণাটি এমন যে, মৃত্যুর পর জীবিতের হাতে তুলে দেওয়া হবে ক্ষমতা। এটা একটা বিশেষ জীবনধারাও। একটি শাসক গোষ্ঠী যতক্ষণ তার উত্তরাধিকার মনোনয়ন করে যেতে পারবে ততক্ষণই শাসক গোষ্ঠী হয়ে থাকবে। আর রক্তের ধারার অক্ষুণ্ণতা নিয়ে পার্টি চিন্তিত নয়, পার্টি চায় তাকে নিজেকেই চিরস্থায়ী করে রাখতে। এখানে কার হাতে ক্ষমতা তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত ক্রমাধিকারতন্ত্রের কাঠামোটি ঠিক থাকে ততক্ষণ তো নয়ই।
যে সকল বিশ্বাস, অভ্যাস, পছন্দ, আবেগ, অনুভব, মানসিকতা আমাদের সময়কে বৈশিষ্টমণ্ডিত করে তার সবই আসলে পার্টির রহস্যময়তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য, আর এখনকার সমাজের বাস্তবিক প্রকৃতিকে হৃদয়াঙ্গমে বাধা সৃষ্টির জন্য তৈরি। বিদ্রোহ কিংবা প্রাক-বিদ্রোহের নামে সামান্য নড়াচড়াটিও আজ অসম্ভব। প্রলেতারিয়েতদের নিয়ে ভয়ের কিছুই নেই। স্রেফ কাজ করে, সন্তান জন্ম দিয়ে, আর মৃত্যুকে বরণ করে নিয়ে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম, শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করে দেবে, তাদের মধ্যে বিদ্রোহের ছিটেফোঁটাও থাকবে না। আর কেবল তাই নয় তাদের এটুকু বোঝার ক্ষমতাও তৈরি হবে না যে বিশ্বটি হতে পারত এখন যেমন তার চেয়ে ভিন্ন কিছু।
তারা কেবল তখনই বিপজ্জনক হয়ে উঠবে যখন শিল্পায়নের কারিগরি অগ্রসরতা এমন মানে পৌঁছে যাবে যেখানে তাদের আরো শিক্ষিত হয়ে ওঠা দরকারি হয়ে পড়বে। কিন্তু, যেহেতু সামরিক ও বাণিজ্যিক বিভেদ এখন আর গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়, সেহেতু জনপ্রিয় শিক্ষার হার ও মান দিন দিন কমছে। জনগণ যে মত ধারণ করে, কিংবা করে না, তাকে ঔদাসীন্যের বিষয় হিসেবেই দেখা হয়। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা দেওয়া যায় অনায়াসেই, কারণ তারা বুদ্ধিই ধারণ করে না। অন্যদিকে পার্টির কোনো সদস্যের বেলায় অতি তুচ্ছ বিষয়েও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভিন্নমত্যতাও সহ্য করা হয় না।
পার্টির একজন সদস্য তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত থট পুলিশের চোখে চোখে থাকে। এমনকি যখন যে একা থাকে তখনও কখনোই নিশ্চিত হতে পারে না যে, সে একা। যে কোনো সময়ে, হতে পারে ঘুমিয়ে কিংবা জেগে, কাজে কিংবা বিশ্রামে, গোসলে কিংবা বিছানায়, তাকে তল্লাশি করা যাবে তার জন্য সংকেত কিংবা সতর্কতা পর্যন্ত জারি করতে হবে না, আর এমনকি সে জানতেও পারবে না তার ওপর তল্লাশি চলছে। যা কিছু সে করে তার কোনোটিই তুচ্ছজ্ঞান করার সুযোগ নেই। তার বন্ধুত্ব, বিশ্রাম যাপন, স্ত্রী-সন্তানের প্রতি আচরণ, একাকীত্বের অভিব্যক্তি, ঘুমের মাঝে বিড়বিড়ানি, এমনকি হাঁটাচলার ভঙ্গি, শরীরের নড়াচড়ার বৈশিষ্ট্য, এ সবকিছুতেই অতিসন্দেহের দৃষ্টিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে।
বাস্তবিক দুষ্টাচরণই কেবল নয়, কোনো খামখেয়ালিপনা, হোক সে ছোটখাটো, কোনো অভ্যাসের পরিবর্তন, কোনো স্নায়ুবিক আচরণ যা ভেতরগত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার লক্ষণ তুলে ধরে এসব কিছুই নিশ্চিত ধরা পড়ে যাবে। কোনো পথেই তার পছন্দের কোনো স্বাধীনতা নেই। অন্যদিকে, তার কাজগুলো আইন দিয়ে কিংবা কোনো বিশেষ আচরণবিধি দিয়ে নিয়ন্ত্রিতও নয়। ওশেনিয়ায় কোনো আইন নেই। কিছু চিন্তা কিংবা কাজ ধরা পড়ে গেলে মৃত্যু অনিবার্য, অথচ তা নিষিদ্ধ নয়। আর নিরন্তর শুদ্ধিকরণ, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, কারাবাস আর বাষ্পকরণ যে চলে তা কিন্তু কোনো কৃত অপরাধের সাজা নয় বরং স্রেফ ভবিষ্যতে অপরাধী হয়ে উঠতে পারে এমন মানুষগুলোকে উবে দেওয়াই কাজ।
