মাত্র চারটি উপায়েই ক্ষমতাসীন পার্টিকে গদিচ্যুত করার সুযোগ থাকে। হয় বাইরের কোনো শক্তি এসে দখল করে নেবে, নয়ত এর সরকার পরিচালনায় অদক্ষতায় সাধারণ মানুষ বিদ্রোহ করবে, অথবা একটি শক্তিশালী, অতৃপ্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠার সুযোগ করে দেবে, অথবা নিজেই নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে দেবে। এই কারণগুলোর একেকটি আলাদাভাবে ঘটলে খুব একটা ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না, আর বলা যায় কোনো একটি শাসন ব্যবস্থায় এই চারটি কারণই কোনো মাত্রাভেদে বজায় থাকে। কোনো ক্ষমতাসীন শ্রেণি যদি এই চারটি দিক থেকেই নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে তার ক্ষমতা হয়ে উঠবে পাকাপোক্তভাবে স্থায়ী। আসলে বলা যায়, এখানে নির্ণয়ক একটাই, তা হচ্ছে, শাসক শ্রেণি নিজে কী ভাবছে।
এই শতকের মাঝামাঝিতে এসে প্রথম বিপদটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। তিন শক্তির প্রত্যেকেই বিশ্বকে বাস্তবিক অর্থেই অজেয় করে দিয়ে যে যার অংশ ভাগ করে নেয়, যা কেবল একটি পথেই পাল্টে যেতে পারে, তা হচ্ছে ধীরে ধীরে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তন, যা আবার খুব সহজেই এড়ানোও সম্ভব। দ্বিতীয় বিপদটি স্রেফ তাত্ত্বিক। জনগণ কখনোই নিজেরা বিদ্রোহ করবে না, আর তারা বিদ্রোহী হয়ে উঠবে না কারণ তারা শোষিত। আর যতদিন তারা তুলনা করে দেখার জন্য জীবন যাপনের অন্য কোনো মানের কথা জানতেও পারবে না, ততদিন তারা বুঝবে না যে তারা শোষিত। অতীতে সবগুলো অর্থনৈতিক সঙ্কট খামোখাই ঘটেছিল, আর এই যুগে তেমনটি আর ঘটতে দেওয়া হবে না। অন্য এবং সমবৃহৎ অব্যবস্থাপনা কিছু ঘটতে পারে, তবে তাতে কোনো রাজনৈতিক ফল মিলবে না, কারণ কোনো পথেই অসন্তোষ দানা বেঁধে ওঠার সুযোগ নেই।
যন্ত্র কৌশল আবিষ্কারের পর থেকে অতিউৎপাদন সমাজে এক সুপ্ত সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে, যা আবার সমাধান করা হয়েছে যুদ্ধাস্ত্র ও সরঞ্জামের অব্যাহত আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই (তৃতীয় অধ্যায় দেখুন), প্রয়োজনীয় মাত্রায় জনগণের নৈতিকতাবোধ ধরে রাখতেও রয়েছে এর উপযোগিতা। আমাদের আজকের শাসকদের সামনে সেক্ষেত্রে একমাত্র খাঁটি বিপদ হয়ে থাকছে—একটি যোগ্য, উননিয়োজিত, ক্ষমতাকামী নতুন গোষ্ঠীর জন্মলাভ, আর তাদের নিজেদের মধ্যে উদারপন্থা ও সংশয়বাদীতার সৃষ্টি। এখানে যে সমস্যাটির কথা বলতে হয়, সেটি শিক্ষাগত। যা পরিচালক দল ও তার অব্যবহিত নিচের নির্বাহী গ্রুপকে সচেতনতায় অব্যাহত ছাঁচ দিয়ে চলেছে। জনগণের সচেতনতাই একমাত্র প্রভাবিত হচ্ছে একটি নেতিবাচক পথে।
এই পটভূমিকায়, আগেভাগে জেনে না থাকলেও, যে কেউ ওশেনীয় সমাজের সাধারণ কাঠামোটি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবেন। পিরামিডের চূড়ায় যিনি বসে তিনি বিগ ব্রাদার। তিনি সকল ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। প্রতিটি সাফল্য, প্রতি অর্জন, প্রতিটি জয়, প্রতিটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, সকল জ্ঞান, সকল বুদ্ধি, সকল খুশি, সকল সদ্গুণ সবই তার নেতৃত্ব আর অনুপ্রেরণার ফল। বিগ ব্রাদারকে কেউ কখনো দেখেনি। তিনি স্রেফ বিজ্ঞাপনমঞ্চে দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে থাকা একটি মুখ, টেলিস্ক্রিনের এক কণ্ঠস্বর। আমরা অনেকটা যৌক্তিকভাবেই নিশ্চিত, তার কোনোদিন মৃত্যু হবে না, আর ইতোমধ্যেই তার জন্মদিনটি নিয়েও তৈরি হয়েছে ধর্তব্যে নেওয়ার মতো অনিশ্চয়তা। বিগ ব্রাদার একটি বেশ, পার্টি তাকে ঠিক যেমনটি বিশ্বের কাছে উপস্থাপন করতে চায় এই বেশ তেমনই। তার কাজ হচ্ছে ভালোবাসা, ভয়, শ্রদ্ধা ও আবেগের মূল কেন্দ্রে ভূমিকা পালন করে যাওয়া, যা সবাইকে একটি সংগঠনের দিকে নয় একজন ব্যক্তির দিকে টেনে নেয়।
বিগ ব্রাদারের পরেই আসে ইনার পার্টি। এর সদস্য সংখ্যা ছয় মিলিয়নে সীমিত যা ওশেনিয়ার মোট জনসংখ্যার দুই শতাংশেরও কম। ইনার পার্টির পরে আসে আউটার পার্টি, যাকে, ইনার পার্টিকে যদি রাষ্ট্রের মস্তিষ্ক বলা হয়, বলা যাবে দুই হস্ত। এদের পরে রয়েছে নির্বোধ সাধারণ, যাদের আমরা ‘দ্য প্রোল’ বলেই অভ্যস্ত, আর এদের সংখ্যা মোট জনগোষ্ঠীর ৮৫ শতাংশ। আগের শ্রেণি বিণ্যাসে প্রোলরা ছিল নিম্নশ্রেণি: বিষূবমণ্ডলীয় ভূমির এ এক দাস জনগোষ্ঠী যারা দখলদারদের হাতে হাতে বদলেছে, যারা পুরো কাঠামোর স্থায়ী কিংবা প্রয়োজনীয় কোনো অংশ নয়।
নীতিগতভাবে এই গ্রুপগুলোর সদস্যপদ বংশানুক্রমিক নয়। তত্ত্বমতে ইনারপার্টির বাবা-মায়ের সন্তান জন্মগতভাবে ইনার পার্টির হবে না। বয়স ষোল হলে পরীক্ষা দিয়ে তবেই এই পার্টির কোনো না কোনো শাখায় ভর্তি হতে হবে। এছাড়াও নেই কোনো বর্ণগত বৈষম্য, এক প্রদেশের ওপর অন্য প্রদেশের দাদাগিরিও নেই। ইহুদি, নিগ্রো, খাঁটি ভারতীয় রক্তবহনকারী দক্ষিণ আফ্রিকানরা পার্টির উচ্চসারিতে আসীন, আর প্রতিটি অঞ্চলের প্রশাসক নেওয়া হচ্ছে সেই অঞ্চলেরই বাসিন্দাদের মধ্য থেকেই। ওশেনিয়ার কোনো অংশেই বাসিন্দাদের এমন ভাবনার সুযোগ নেই যে তারা দূর রাজধানীর শাসনে এক উপনিবেশিক জনগোষ্ঠী। ওশেনিয়ার কোনো রাজধানী নেই, আর এর খেতাবি প্রধান এমন এক ব্যক্তি যার অস্তিত্ব কোথায় কেউ জানে না। এছাড়াও ইংরেজি এর মূল যোগাযোগের ভাষা, আর নিউস্পিক দাপ্তরিক ভাষা, তাও আবার কোনোভাবেই কেন্দ্রীভূত নয়। এর শাসকদের মধ্যে কোনো রক্ত-সম্পর্ক নেই, তবে তারা সবাই একই সাধারণ মতবাদের প্রতি অনুগত।
