হায়, আমি যদি হে পৃথিবী, তোমার অধিবাসী হতাম তাহলে তোমার মত সর্বত্র ঘুরে বেড়িয়ে পাহাড়-উপত্যকা, নদী-সমুদ্র, সমতল ভূমি, অরণ্যরাজি দেখে কত আনন্দই না লাভ করতাম। কিন্তু তোমার মধ্যে এত সব কিছু থাকা সত্ত্বেও কোথাও আমার আশ্রয় নেই। কোথাও আমার বাসের স্থান নেই। আমার চারদিকে আমি এইসব আনন্দময় বস্তুগুলি যতই দেখি তই আমার অন্তজ্বালা বেড়ে যায়। আমার মধ্যে এমন কতকগুলি ঘৃণ্য বিপরীতমুখী ভাবধারা আছে যার জন্য সকল সুন্দর বস্তু অসুন্দর হয়ে যায় আমার কাছে। এমন কি স্বর্গলোকেও আরও শোচনীয় হয়ে উঠবে আমার অবস্থা। কিন্তু এই মর্ত্যলোকে অথবা স্বর্গলোকে আমি বাস করতে চাই না। আমি চাই শুধু স্বর্গের অধিপতিকে জয় করতে। তাঁর সব গৌরবকে খর্ব করে দিতে। কিন্তু আমার এই দুঃখময় অবস্থা তা শুধু একা ভোগ করতে চাই না, আমি অন্য সব সুখীদেরও আমার এই দুঃখের অংশভাগী করে তুলতে চাই। তাতে যদি আমার দুঃখ আরও বেড়ে যায় তো যাক।
ধ্বংসের মধ্যে সবচেয়ে শান্তিলাভ করে আমার বিক্ষুব্ধ চিন্তাগুলি। যাদের জন্য এই সুন্দর পৃথিবী সৃষ্ট হয়েছে তাদের ধ্বংস করা অথবা তাদের ক্ষতিসাধন করাই হলো আমার কাজ। তাহলে এর স্রষ্টাও দুঃখ পাবে। তাতেই আমি সমস্ত নরকবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে গৌরববোধ করব।
সর্বশক্তিমান ঈশ্বর যে পৃথিবী ছয়দিন ছয়রাত ধরে সৃষ্টি করেছেন এবং তার আগেও কতদিন ধরে তার পরিকল্পনার চেষ্টা করেছেন তা আমি একদিন ধ্বংস করে দিতে চাই।
আমরা স্বর্গলোক থেকে বিতাড়িত হবার পর আমাদের সংখ্যা পূরণের জন্য অথবা আমাদের প্রতি ঘৃণাবশত আমাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য এই পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টি করে তাদের উন্নতি সাধনের জন্য বিভিন্ন স্বর্গীয় গুণাবলীতে ভূষিত করেছেন। তাঁর ইচ্ছা ও পরিকল্পনা মতোই কাজ করেছেন তিনি।
তিনি মানুষ সৃষ্টি করে সেই মানুষের জন্য এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষকে এই জগতের অধীশ্বররূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। হায়, এইভাবে কী উপকারই না তিনি আমাদের করেছেন। স্বর্গের দেবদূতেরা সর্বদা পাখা মেলে এই মানুষের অধীনস্থ দাসের মত সেবা করে বেড়ায়। দেবদূত প্রহরীরা সারা পৃথিবী প্রহরা দিয়ে বেড়ায়। তাদের। প্রহরাকেই আমি সবচেয়ে ভয় করি। তাদের সেই প্রহরা এড়ানোর জন্যই আমি মধ্যরাত্রির কুয়াশা ও অন্ধকারের আবরণে গা ঢাকা দিয়ে গোপনে নিঃশব্দে এখানে প্রবেশ করেছি। কোথায় এক ঘুমন্ত সর্পকে দেখতে পাব এবং তার দেহে প্রবেশ করে আমার কুটিল কামনাকে চরিতার্থ করতে পারব তার জন্য প্রতিটি ঝোঁপঝাড় আমি অনুসন্ধান করে চলেছি।
যে আমি একদিন সর্বোচ্চ পদে অভিষিক্ত হয়ে দেবতাদের সঙ্গে ওঠাবসা করতাম, সেই আমি আজ বাধ্য হয়ে পশু হতে চলেছি। পশুর গুণাবলী ধারণ করতে চলেছি। কিন্তু উচ্চাভিলাষ পূরণ ও প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য কে নীচে নামবেনা? যে উচ্চাভিলাষের আকাশে পাখা মেলে উড়তে চায় তাকে নীচে নামতেই হবে। যে প্রতিশোধ চায় তাকে আপাতমধুর সেই প্রতিশোধের তিক্ত ফল ভোগ করতেই হবে!
তাই হোক। যেহেতু সুউচ্চ স্বর্গলোকে গিয়ে আমি ঈশ্বরকে ধরতে পারলাম না, সেইহেতু সেই ঈশ্বরের পরেই যে আমার মনে ঈর্ষা জাগায়, যে ঈশ্বরের নূতন প্রিয় বস্তুরূপে আমাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। আমাদের প্রতি ঘৃণাবশত যাকে ঈশ্বর সামান্য মাটি থেকে সৃষ্টি করে এমন উন্নত অবস্থায় উন্নীত করেছেন, সেই মাটির মানুষকে ঈশ্বরের নবজাত সন্তানকে ঘৃণা করতে চাই আমি। ঘৃণার শোধ ঘৃণার দ্বারাই নিতে হয়।
এই কথা বলার পর একরাশ কালো কুয়াশার মত গুঁড়ি মেরে প্রতিটি সিক্ত অথবা শুষ্ক ঝোঁপের মধ্যে সে একটি ঘুমন্ত সর্পের সন্ধান করে যেতে লাগল। অবশেষে সে এক জায়গায় দেখতে পেল ঘাসের মধ্যে কুণ্ডলী পাকিয়ে মাথা রেখে একটি সাপ নির্ভয়ে ঘুমোচ্ছে। শয়তান তার মুখের মধ্যে প্রবেশ করে তার পাশবিক কুটিল স্বভাবটি লাভ করল। তারপর তার বুদ্ধিকে সক্রিয় করে তুলল। কিন্তু তাতে সর্পটির ঘুমের কোন ব্যাঘাত হলো না। এইভাবে রাত্রি প্রভাত হবার অপেক্ষায় রইল।
তারপর যখন প্রভাতের শুচিস্নিগ্ধ আলো ইডেন উদ্যানের প্রস্ফুটিত ফুলগুলির উপর ঝরে পড়তে লাগল, তখন সেই সব ফুলগুলি হতে বিচিত্র সৌরভে আমোদিত হয়ে উঠল উদ্যান। পৃথিবীর সমস্ত সুগন্ধি বস্তুগুলি পরম স্রষ্টার উদ্দেশ্যে নীরবে গৌরবগান করতে লাগল। তখন সর্পরূপী শয়তান দেখল সেই মানবদম্পতি ঈশ্বরের স্তোত্ৰগানে মুখর হয়ে উঠল। সমস্ত প্রকৃতি ও প্রাণীজগতের মধ্যে একমাত্র তারাই এই কণ্ঠস্বরের অধিকারী। ঈশ্বরের স্তবগানে সমর্থ। গান শেষে তারা প্রথমে প্রকৃতির রূপ, বর্ণ ও গন্ধ কিছুক্ষণ উপভোগ করল। পরে তারা তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম সম্বন্ধে আলোচনা করতে লাগল।
ঈভ তখন বলল, আদম, যতই আমরা এই উদ্যানের গাছপালা ও ফুলগুলির পরিচর্যা করছি ততই আমাদের কাজ বেড়ে যাচ্ছে। এতদিন আমরা দুজনে একসঙ্গে কাজ করে আসছি। একাজে আরও লোকের দরকার। যে সব গাছপালার অতিরিক্ত অংশ হেঁটে দিচ্ছি, একরাত্রির মধ্যেই তারা আবার বেড়ে উঠছে। তাই উপায়স্বরূপ একটি চিন্তা আমার মনে হয়েছে। এ বিষয়ে তোমার পরামর্শ চাই। আমি আমাদের শ্রমকে ভাগ করে নিতে চাই। আমরা দুজনে দু জায়গায় কাজ করব। তুমি পছন্দমত এক জায়গায় যেতে পার অথবা যেখান বেশি প্রয়োজন বুঝবে সেখানে যাবে। অথবা যেখানে আইভিলতাগুলি কোন গাছকে জড়িয়ে উঠতে পারছে না সেখানে গিয়ে তাদের উঠিয়ে দেবে। আর আমি ঐ গোলাপবনে গিয়ে তাদের পরিচর্যা করব বেলা দুপুর পর্যন্ত।
