অবশ্য আমিও তখন তোমার ভ্রান্ত পূর্ণতার লক্ষণ দেখে অতিমাত্রায় তোমার প্রশংসা করে ভুল করেছিলাম। ভেবেছিলাম এতে কোন বিপদ হবে না। এখন আমি আমার এই কাজের জন্য অনুশোচনা করছি। এটাই হলো আমার অপরাধ আর এই অপরাধে এখন তুমি অভিযুক্ত করছ আমাকে।
নারীদের উপর অতিরিক্ত আস্থা স্থাপন করে তাদের ইচ্ছাপূরণ করতে গিয়ে পুরুষেরা ভবিষ্যতে এই অপরাধই বারবার করবে। কোন সংযম বা অনুশাসন নারী মানবে না। পরে নিজের ইচ্ছায় ক্ষয় হয়ে বিপদে পড়বে। পুরুষের দুর্বলতা বা প্রশ্রয়কে দায়ী করে অভিযুক্ত করবে তাকে।
এইভাবে পরম্পরকে অভিযুক্ত করে দুঃখের সঙ্গে কালযাপন করতে লাগল তারা। কেউ নিজের দোষ দেখল না, নিজেকে ধিক্কার দিল না। আত্মপ্রতিষ্ঠার চেষ্টাজনিত এই দ্বন্দ্বের কোন শেষ ছিল না।
অষ্টম সর্গ
যেখানে ঈশ্বর বা দেবদূত স্বর্গ থেকে নেমে এসে বন্ধুর মত মানুষের পাশে এসে কত কথাবার্তা বলেন, তার সরল সামান্য খাদ্য ভোজন করেন, সেখানে আমাদের মত মানুষের কোন কথা বলা নিষ্প্রয়োজন। আমি শুধু এই ঘটনার মর্মান্তিক পরিণাম দেখাব। মানুষ কিভাবে বিধির বিধান লঙ্ঘন করে অবিশ্বাসী, আনুগত্যহীন ও ঈশ্বরদ্রোহী হয়ে ওঠে, আমি বলব তারই কথা।
মানুষের এই অবিশ্বস্ততা ও নিষিদ্ধ আচরণের জন্য তাকে ত্যাগ করে তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান ঈশ্বর চিরতরে। ফলে স্বর্গ ও মর্ত্যের মধ্যে ব্যবধান বা দূরত্ব বেড়ে যায়। উভয়পক্ষে ক্রমাগত চলতে থাকে ক্রোধ আর ভর্ৎসনার বাণবর্ষণ। অবশেষে ঈশ্বর বিচারের রায়দানের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীতে দুঃখ নেমে আসে চিরকালের জন্য। নেমে আসে পাপ আর মৃত্যুর করাল ছায়া। সত্যিই দুঃখের বিষয়। কিন্তু এ নিয়ে প্রচুর তর্কবিতর্ক হয়। ট্রয় যুদ্ধে শত্রুদের পশ্চাতে ধাবিত কঠোর একিলিসের মধ্যে যে রোষ দেখা গিয়েছিল, ঈনিসের প্রতি জুনো এবং ওডিসিয়াসের প্রতি সমুদ্রদেবতা পসেডন যে রোষ দেখান, ইতালির অধিপতি টার্নাস তার স্ত্রী ল্যাভিনিয়াকে হারিয়ে যে রোষে ফেটে পড়ে, সেই রোষ এইসব তর্কবিতর্কে প্রকাশিত হয়।
আমি এইসব কাব্যে প্রকাশ করার জন্য আমার স্বর্গীয় সাহায্যকারিণীর সাহায্য নিতে পারি। তিনি অযাচিতভাবে মাঝে মাঝে আমার নিদ্রার মধ্যেই আবির্ভূত হন। আমার স্বতোৎসারিত সকল কাব্যই তিনি আমাকে নিদ্রিত অবস্থাতে বলে দেন।
বহুদিন আগে হতেই এক বীরত্বপূর্ণ আখ্যানকাব্য রচনা করার প্রয়াস পেয়েছিলাম। কিন্তু শুধু বীরত্বের কথা মনঃপূত হয়নি আমার।
তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছিল মর্ত্যলোকে। ঘনীভূত হয়ে উঠছিল গোধূলির ছায়া, রাত্রির গোলার্ধে দিগন্তকে আচ্ছন্ন করে তুলেছিল।
এমন সময় যে শয়তানরাজ গ্যাব্রিয়েলের দ্বারা তাড়িত হয়ে ইডেন উদ্যানের সীমানা থেকে পালিয়ে গিয়েছিল সে আবার ফিরে এল। সে আবার তার পূর্বপরিকল্পিত প্রতারণা আর প্রতিহিংসাকে সজীব করে তুলল তার মনে। মানবজাতির ধ্বংসসাধনের উদ্দেশ্যে ও সংকল্পে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠল সে। সে তারপর মধ্যরাত্রির অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে নির্ভীকভাবে ফিরে এল।
ইতিমধ্যে সে গোটা পৃথিবীটাকে পরিক্রমা করে এসেছে। ইউরিয়েল তাকে চিনতে পারার পর থেকে চেরাবজাতীয় দেবদূত প্রহরীদের সতর্ক করে দেয় সে। সে তাই সারাদিন ধরে দেবদূতদের প্রহরা এড়িয়ে অতি সন্তর্পণে ঘুরে বেড়িয়ে রাত্রির অন্ধকারে ফিরে আসে ইডেন উদ্যানে।
এর আগে পৃথিবী পরিক্রমাকালে সে শুধু পৃথিবীর নদী-সমুদ্র-পাহাড়-পর্বত সমম্বিত বিচিত্র ভূপ্রকৃতি দর্শন করেনি, সে তার বিচিত্র জীবজন্তুগুলিকেও বিভিন্ন জায়গায় ভাল করে খুঁটিয়ে দেখে। সে দেখে কোন্ জীব তার উদ্দেশ্যসাধনের বেশি কাজে লাগবে। সব দেখার পর অবশেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় সে যে, সাপই হলো সব জীবজন্তুর মধ্যে সবচেয়ে কুটিল। সে সর্পদেহ ধারণ করে তার কু-অভিসন্ধি সিদ্ধ করলে কেউ তাকে সন্দেহ করবে না। অন্য জীবদেহ ধারণ করে এ কাজ সিদ্ধ করতে গেলে সন্দেহ জাগতে পারে অন্যের মনে। সে তাই মনে মনে ঠিক করল সর্পদেহের মধ্যে প্রবেশ করে তার কুটিল প্রতারণার গোপন বাসনাকে লোকচক্ষু হতে ঢেকে রেখে স্বচ্ছন্দে তা চরিতার্থ করতে পারবে সে।
সে তখন পৃথিবীকে সম্বোধন করে আবেগের সঙ্গে বলতে লাগল, হে পৃথিবী, তুমি স্বর্গলোকের শুভ অনুরূপ যদিও স্বৰ্গকেই সকলে পছন্দ করে বেশি। তথাপি তুমি দেবতাদের বসবাসযোগ্য, যদিও তোমাকে স্বর্গের পর দ্বিতীয় স্থানাধিকারী হিসাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে। ঈশ্বর স্বর্গের সব স্থান সৃষ্টি করার পর কখনো তার থেকে খারাপ কিছু সৃষ্টি করতে পারেন না।
অনন্ত মহাশূন্যে যে সব ঘূর্ণমান গ্রহনক্ষত্র, সূর্য ও জ্যোতিষ্কমণ্ডলী নিয়ত নৃত্যশীল তাদের আলোক শুধু তোমার উপরেই পতিত হয়। তারা শুধু তোমাকেই আলোকিত করে। ঈশ্বর যেমন ত্রিভূবনের কেন্দ্রস্থলে বিরাজিত থেকে সর্বত্র তাঁর প্রভাব ও প্রভুত্ব বিস্তার করেন তেমনি তুমিও সমস্ত গ্রহের কেন্দ্রস্থলে থেকে সমস্ত সৌরজগতের শুভ প্রভাবগুলি আকর্ষণ করো। তাদের গুণগুলি তোমার গাছপালা ও ওষধিতে সঞ্চারিত হয় সফলভাবে। সেইসব গুণের প্রভাবেই তোমার মধ্যস্থিত প্রাণীগুলি জন্মলাভ করে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় ধীরে ধীরে। তাদের মধ্যে মানুষই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ প্রাণী, একমাত্র তারই মধ্যে জ্ঞানবুদ্ধি আছে।
