তোমাকে ছাড়া কি করে আমি বাঁচব? তোমার মধুর কথাবার্তা, তোমার গভীর ভালবাসা, তোমার অবিরাম সাহচর্য সব হারিয়ে কেমন করে একা থাকব আমি এই বিশাল অরণ্যপ্রদেশে?
ঈশ্বর কি আর এক ঈভ সৃষ্টি করবেন আমার আর একটি পাঁজর থেকে? লু আমার অন্তর থেকে তোমার অন্তরের ক্ষত মুছে যাবেনা কখনো। হে আমার অর্ধাঙ্গিনী, আমার অস্থিমজ্জার আর এক প্রতিমূর্তি, একই প্রকৃতির দ্বারা অবিচ্ছেদ্যভাবে আবদ্ধ আমরা। সুখ-দুঃখ যাই হোক, আর কখনই আমরা বিচ্ছিন্ন দ্য না পরস্পরের কাছ থেকে।
এই কথা বলে কিছুটা সান্ত্বনা পেল আদম। এরপর ঈভের দিকে ঘুরে আবার শান্ত কণ্ঠে বলতে লাগল, হে দুঃসাহসী ঈত, তুমি ঐ নয়নমনোস্ত্র পবিত্র ফল আস্বাদন করে এক বিপজ্জনক কাজ করেছ। যে ফল স্পর্শ করা নিষিদ্ধ তা তুমি ভক্ষণ করেছ। কিন্তু যা হয়ে গেছে তা আর ফিরবে না। হয়ত ঈশ্বর বা নিয়তি সর্বশক্তিমান নয়। হয়ত তুমি মরবে না। কাজটা হয়ত যতটা ভয়ঙ্কর ভেবেছিলে ততটা ভয়ঙ্কর নয়। সর্প তোমার আগেই সে ফল ভক্ষণ করায় সে ফল তার অলৌকিকত্ব হারিয়ে সাধারণের ভক্ষ্য হয়ে উঠেছে। তুমি বলছ সে এখনো জীবিত আছে এবং পশু হয়ে বাকশক্তি লাভ করেছে মানুষের মত। তাহলে এ ফল ভক্ষণ করে আমরাও সেই অনুপাতে উন্নততর জীবন লাভ করতে পারি। দেবতা অথবা দেবতার সমান দৈবীশক্তি লাভ করতে পারি। পরম স্রষ্টা ঈশ্বরের মত সর্বজ্ঞ আমাদের যতই ভীতি প্রদর্শন করুন ধ্বংস করবেন বলে, তিনি নিশ্চয়ই তাঁরই সৃষ্ট জীব আমাদের ধ্বংস করবেন না। শেষ পর্যন্ত। আমরা হচ্ছি তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, উদার মর্যাদাসম্পন্ন। আমাদের যদি পতন হয় তাহলে যে কাজের জন্য ঈশ্বর আমাদের নিযুক্ত করেছেন, সে কাজ পণ্ড হয়ে যাবে। তাহলে ঈশ্বরকে নিজের হাতে তাঁর সৃষ্টিকে ধ্বংস করে তার সমস্ত শ্রমকে ব্যর্থ করে দিতে হবে নিজের হাতে। ঈশ্বর সম্বন্ধে এমন ধারণা আমরা পোষণ করতে পারি না। আবার নূন করে কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা ঈশ্বরের আছে। কিন্তু সেই সঙ্গে আমাদের উচ্ছেদসাধন করতে নিশ্চয়ইরমন চাইবেনা। তাহলে তার প্রতিপক্ষের জয় হবে এবং সে বলবে ঈশ্বরের অনুগ্রহ কত চঞ্চল, কত অস্থায়ী। তিনি প্রথমে আমাকে ধ্বংস করে পরে মানবজাতিকে ধ্বংস করবেন। এরপর কাকে ধ্বংস করবেন? এইভাবে তাঁকে ঘৃণা করার সুযোগ তিনি ভঁর শত্রুকে দেবেন না নিশ্চয়। আমি তোমার সঙ্গে আমার ভাগ্যকে নির্ধারিত করে ফেলেছি। মৃত্যু বা ধ্বংসের অভিশাপ যদি নেমে আসে তাহলে দুজনে একসঙ্গে তা ভোগ করব। তোমার যদি মৃত্যু হয় তাহলে সে মৃত্যু জীবনে খুবই বরণীয় হয়ে উঠবে আমার কাছে। প্রকৃতির এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে এমনভাবে আবদ্ধ আছি আমরা যে আমাদের মধ্যে কেউ সে বন্ধন ছিন্ন করতে পারবে না। আমরা হৃদয়ে এক, একই রক্তমাংসে গঠিত। তোমাকে হারানো মানেই আমার নিজেকে হারানো।
আদম এই কথা বললে ঈভ তাকে বলল, তোমার প্রেমাতিশয্যের কী অপূর্ব পরীক্ষা, কী উজ্জ্বল ও উচ্চমানের দৃষ্টান্ত! কিন্তু তোমার পূর্ণতার অংশ কেমন করে আমি লাভ করব আদম যাতে আমি তোমার পার্শ্বদেশ থেকে উদ্ভূত হয়েছি একথা আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি? তুমিই এমনি আমাদের অচ্ছে মিলনের কথা বললে। তোমার সংকল্পের কথা ঘোষণা করে আমাদের মিলন কত নিবিড় তার প্রমাণ দিলে। মৃত্যু বা মৃত্যুর থেকে ভয়ঙ্কর কোন শক্তিই আমাদের বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। তুমি আমার প্রতি এক গভীর ভালবাসার বন্ধনে এমনভাবে বিজড়িত হয়ে আছ যে, এই ফল ভক্ষণের জন্য যদি কোন অপরাধ বা পাপ হয়ে থাকে আমার তাহলে সে অপরাধ ও সে পাপের শাস্তি মাথা পেতে নিতে রাজি আছ তুমি। আজ এই ফলের আস্বাদ এক মহা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আমাদের প্রেমের গুণ ও শক্তিকে অভ্রান্তভাবে প্রমাণ করে দিল যার কথা এর আগে কখনো জানতে বা বুঝতে পারিনি আমরা।
যদি তুমি তোমার প্রেমের এই সততা ও বিশ্বস্ততার কথা আজ এমন ভাবে ঘোষণা না করতে তাহলে আমার এই ফলভক্ষণের ফলে মৃত্যু এসে ভয়াবহরূপে উপস্থিত হলে আমি পরিত্যক্ত অবস্থায় একাকী সে মৃত্যুকে বরণ করে নিতাম। তোমার জীবনের শান্তিকে বিঘ্নিত করে তোমাকে আমার সঙ্গে মৃত্যুবরণ করতে কোনভাবে প্ররোচিত করতাম না।
কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে আসল ঘটনা তা নয়। আমি ভাবছি অন্য কথা। কোন মৃত্যু নয়, এক পূর্ণ ও পরিণত জীবনের রূপ লাভ করতে চলেছি আমরা। এই ফলের স্বর্গীয় আস্বাদ আমার জ্ঞানচক্ষুকে উন্মীলিত করে দিয়েছে, এক নূতন আশা ও আনন্দের দিগন্তকে উন্মোচিত করে দিয়েছে আমাদের সামনে। সুতরাং আমার অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে হে আদম, তুমিও এ ফল অবাধে ‘আস্বাদন করো। সমস্ত মৃত্যুভয় বাতাসে উড়িয়ে দাও।
এই কথা বলে আদমকে আলিঙ্গন করল ঈভ। আনন্দাশ্রু ঝরে পড়তে লাগল তার চোখ থেকে। আজ আদম তার প্রেমকে এক মহত্তর সুমন্নতি দান করেছে, সে তার সেই প্রেমের খাতিরে সমস্ত ঐশ্বরিক রোষ ও মৃত্যুকে বরণ করে নিতে চেয়েছে, এ কথা ভেবে আনন্দের সঙ্গে এক বিরল গর্ব অনুভব করল সে।
ঈভ জ্ঞানবৃক্ষের শাখাসহ যে ফল এনেছিল সে ফল সে উদার হাতে আদমকে দান করল। ঈভের থেকে সে অধিকতর জ্ঞানের অধিকারী হলেও কোন কুণ্ঠা না করেই সে ফল খেয়ে নিল, ঈভের নারীসুলভ সৌন্দর্য ও সুষমায় সহজেই মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ল সে।
