ঈশ্বর এই পৃথিবীর থেকে অনেক দূরে মনের ঊর্ধ্বে বিরাজ করেন। অসংখ্য চরদ্বারা পরিবৃত আমাদের মহান বিধাতাপুরুষ সদাজাগ্রত প্রহরীর মত এই মর্ত্যলোকের সব কিছু লক্ষ্য করলেও এখানকার অনেক ঘটনা হয়ত অজানিত রয়ে যায় তার কাছে।
কিন্তু আদমের কাছে আমি কিভাবে যাব? আমি কি তাকে আমার এই পরিবর্তনের কথা জানিয়ে আমার এই নবলব্ধ জ্ঞানসমৃদ্ধ সুখের সমান অংশ দান করব অথবা তাকে কিছুই না জানিয়ে এই জ্ঞানকে আমার শক্তির মধ্যে, আমার মধ্যে, আমার অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখব? তাকে আমার সহ অংশীদার করব না এ বিষয়ে? আমি তার সমান হয়েও নারী হিসাবে কি তার প্রেমাকর্ষণের জন্য আমার জ্ঞানগত স্বাধীনতা ও শ্রেষ্ঠত্বকে বজায় রেখে চলব? এটাই হয়ত ভাল হতে পারে।
কিন্তু যদি এই ঘটনা ঈশ্বর প্রত্যক্ষ করে থাকেন এবং যদি এর ফলে আমাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়? তাহলে আমি আর এ পৃথিবীতে থাকব না এবং আদম তখন আর একজন ঈভকে বিবাহ করে তাকে তার জীবন-সঙ্গিনী করে তুলবে। তখন আমার অবর্তমানে তাকে নিয়ে সুখে বাস করতে থাকবে সে। সুতরাং আমি নিশ্চিতরূপে দৃঢ়তার সঙ্গে স্থির করলাম আদমকেও আমি আমার এই পরম স্বর্গীয় সুখের সমান অংশ দান করব। আমি তাকে এত গভীরভাবে ভালবাসি যে আমি তার সঙ্গে হাসিমুখে মৃত্যুবরণ করতে পারব। কিন্তু তাকে ছেড়ে জীবনে বেঁচে থেকেও বাঁচার কোন আনন্দ পাব না।
এই বলে সেই বৃক্ষতল হতে তার স্বামীর সন্নিধানে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াল ঈভ। কিন্তু যাবার আগে যে অলৌকিক বৃক্ষ দেবতাদের পানীয় অমৃত থেকে তার প্রাণরস আহরণ করে, তার অন্তর্নিহিত শক্তির প্রতি নত হয়ে শ্রদ্ধা জানাল।
এদিকে আদম সর্বক্ষণ ঈভের প্রত্যাগমন কামনায় উন্মুখ হয়ে অধীর আগ্রহের সঙ্গে প্রতীক্ষা করছিল তার। তার একক শ্রমকে সম্মানিত করার জন্য উপহারস্বরূপ তার গলদেশকে শোভিত করবে বলে বাছাই করা বিচিত্র ফুল দিয়ে একখানি মালা গেঁথে রেখে দিয়েছিল সযত্নে। চাষীরা প্রায়ই ফসলের রানী বা দেবীর উদ্দেশ্যে এমনি করে মালা গেথে রাখে।
ঈভের দীর্ঘ বিলম্বিত প্রত্যাবর্তনে কতখানি আনন্দ ও সান্ত্বনা লাভ করবে আদম শুধু একা একা সেই কথাই ভাবছিল। তবে সেই সঙ্গে এক অজানিত আশঙ্কা মনটাকে পীড়িত করছিল তার।
এইসব ভাবতে ভাবতে আজ সকালে তার কাছে বিদায় নিয়ে যে পথে গিয়েছিল ঈভ সেই পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগল আদম। যেতে যেতে জ্ঞানবৃক্ষের কাছে আসতেই ঈভের দেখা পেয়ে গেল। তখন সবেমাত্র সেই জ্ঞানবৃক্ষের তলা থেকে ফিরছিল ঈভ। তার হাতে ছিল কতকগুলি উজ্জ্বল ফলে ভরা একটি সদ্যভগ্ন শাখা। অমৃতের সুবাস ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে।
ঈভ বলল, আমার দেরি হওয়াতে তুমি হয়ত আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলে। তোমার সাহচর্য হতে বঞ্চিত হওয়ায় তোমার অভাবটাকে দীর্ঘ মনে হচ্ছিল আমার। বিরহের বেদনা আজকের মত আর কখনো অনুভব করিনি। তবে এই শেষ। এ ভুল আর কখনো করব না আমি। বিচ্ছেদের বেদনা আর কখনো অনুভব করতে হবে না কাউকে। আর আমি হটকারিতার সঙ্গে আমার শক্তি পরীক্ষার জন্য আর কোথাও যাব না তোমাকে ছেড়ে।
তবে আমার বিলম্বের কারণটা বড় অদ্ভুত। আশ্চর্য হয়ে যাবে তা শুনে। আমাদের যা বলা হয়েছিল তা কিন্তু সত্য নয়। এই বৃক্ষের ফল আস্বাদন মোটেই বিপজ্জনক নয়। এ ফল ভক্ষণ করলে অজানিত কোন অশুভ শক্তি মুখব্যাদান করে গ্রাস করতে আসে না। বরং যারা এ ফল আস্বাদন করে তাদের দেবতাদের মত জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হয়ে যায়। একটি সর্প এই ফল ভক্ষণ করে মরেনি বরং সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মত জ্ঞান ও কণ্ঠস্বর লাভ করেছে। অথচ আমাদের মৃত্যুভয় দ্বারা শাসানো হয়েছিল।
সর্পটি মানুষের মত যুক্তি খাড়া করে এমনভাবে ফলের গুণ সম্বন্ধে বোঝাতে লাগল যে আমিও এই ফল ভক্ষণ করে দেখলাম তার কথাই ঠিক। আমার জ্ঞানচক্ষু সত্যিই খুলে গেল। মনের তেজ বেড়ে গেল। আমার অন্তর প্রসারিত হলো। আমি দেবতাদের মত হয়ে উঠলাম। তখন তোমার কথা মনে পড়েছিল, কারণ যে সুখে তোমার অংশ নেই, সে সুখ তুচ্ছ আমার কাছে।
সুতরাং তুমিও এ ফল আস্বাদন করো। দুজনের ভাগ্য, আনন্দ, প্রেম এক হোক। আমাদের দুজনের মধ্যে যেন কোন পার্থক্য বা তারতম্য না থাকে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হলে দুজনেই আমরা সমান দুঃখ ভোগ করব।
ঈভ তার গণ্ডদ্বয়কে আনন্দে উজ্জ্বল করে এই কথা বলল। কিন্তু অচিরেই সে গণ্ডদ্বয় ম্লান হয়ে গেল।
এদিকে আদম ঈভের এই মারাত্মক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের কথা শুনে বিস্ময়ে ও বেদনায় অভিভূত হয়ে পড়ল। প্রাণহীন প্রস্তরস্তম্ভের মত শূন্যদৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে রইল সে। এক হিমশীতল ভয়ের স্রোত শিরায় শিরায় বয়ে যেতে লাগল তার। ঈভকে পরাবার জন্য যে মালাটি হাতে ছিল তার, সে মালাখানি মাটিতে পড়ে গেল তার হাত থেকে।
অবশেষে সে সেই অস্বস্তিকর নীরবতা ভঙ্গ করে বলল, হে সকল সৌন্দর্যের রানী, সব বিশ্বের সকল বস্তুর সারভৃতা সত্তা! আজ মুহূর্তের মধ্যে কিভাবে সকল মহিমা হারিয়ে ফেললে তুমি! আজ তুমি সকল সৌন্দর্য ও সকল সম্মান হতে বিচ্যুত হয়ে নিজের মৃত্যুকে নিজেই ডেকে আনলে। আজ তোমার সত্তার সকল মহিমা অপগত! কেমন করে লোভের বশবর্তী হয়ে ভুলে তুমি নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করলে? কেমন করে কোন্ সাহসে ঈশ্বরের নিষেধাজ্ঞা লঙঘন করলে? নিশ্চয় কোন অজাতশত্রু অলক্ষ্যে থেকে প্রভাবিত করেছে তোমাকে। নিজের সঙ্গে সঙ্গে তুমি আমার সর্বনাশ নিয়ে এলে। কারণ তোমার সঙ্গে আমিও মৃত্যুবরণ করার জন্য দৃঢ়সংকল্প।
