সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কণ্ঠ নীরব হতেই অসংখ্য দেবদূতেরা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল। এক বিপুল আনন্দোল্লাসে নিনাদিত সেই দিব্যমধুর কণ্ঠস্বরে আকাশমণ্ডলের প্রতিটি প্রত্যন্তভাগ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। তারা গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তিভরে মাথা নত করল ঈশ্বর ও ঈশ্বরপুত্রের কাছে।
স্বর্গলোকের কাননে অমর জীবনবৃক্ষে প্রস্ফুটিত দিব্য কুসুমমাল্যে সংজড়িত বীণাগুলি হাতে তুলে সেই নিয়ে বীণাবাদন সহযোগে মধুর সঙ্গীতের দ্বারা পরমপিতার জয়গান গাইতে লাগল তারা। তারা মধুর কণ্ঠে স্তব করতে লাগল, হে সর্বশক্তিমান, অনন্ত, অমর, সমগ্র ত্রিভুবনের অধিপতি, তুমিই সকল জীবের স্রষ্টা, সকল আলোর উৎস। চারিদিকের গৌরবময় উজ্জ্বলতার মাঝে তুমি নিজে অদৃশ্য অবস্থায় তোমার সিংহাসনে উপবিষ্ট থাক। সে সিংহাসন এমনই দুরধিগম্য যে কেউ তার নিকটস্থ হতে পারে না। যে দিব্য জ্যোতির দ্বারা তুমি সতত পরিবৃত সে জ্যোতি এমনই যে তার মাঝে পরিদৃশ্য হয় না তোমার মূর্তি। তোমার জ্যোতির তীব্রতা এমনই যে কারো চোখের দৃষ্টি তা সহ্য করতে পারে না। এমন কি সবচেয়ে উজ্জ্বল দেবদূত সেরাফিমও তোমার কাছে যেতে পারে না। তার ডানাদুটি দিয়ে চোখ চেপে রাখে। তুমি তোমার জ্যোতির তীব্রতাকে প্রশমিত না করলে কারো চোখে পরিদৃশ্য হবে না তোমার মূর্তিটি।
এরপর তারা ঈশ্বরপুত্রের স্তব করে বলতে লাগল, হে ঈশ্বরপুত্র, সমস্ত সৃষ্টির মাঝে ঈশ্বরের অবিকল সাদৃশ্যে উৎপন্ন ঈশ্বরের একমাত্র সন্তান তুমি। তোমার নির্দোষ, নির্মল মুখমণ্ডলে যে সর্বশক্তিমান পরমপিতাকে কেউ দেখতে পায় না চোখে সেই পরমপিতা এক মধুর উজ্জ্বলতায় অতিমূর্ত ও পরিদৃশ্য হয়ে আছেন। তার গৌরবের উজ্জ্বলতায় উজ্জ্বল তুমি। তাঁর অমিত শক্তি ও তেজ সঞ্চারিত তোমার মধ্যে। তিনি হচ্ছেন স্বর্গের স্বর্গ। তিনি হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ উচ্চাভিলাষী, সর্বোচ্চ প্রভুত্বস্পৃহার মূর্ত প্রতীক।
একদিন তুমি তোমার পিতার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তোমার দেবদূত সেনাদের নিয়ে পিতার শত্রুদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে নির্গত হও। তোমার জ্বলন্ত রথচক্রনির্ঘোষে বিকম্পিত হয় সমগ্র স্বর্গলোক। কিন্তু স্বর্গচ্যুত মানবজাতির উপর তোমার কোন ক্রোধ বর্ষিত হয়নি। তাদের উপর কোন প্রতিশোধ গ্রহণ না করে বা তাদের ধ্বংস না করে তাদের প্রতি করুণা ও মমতায় বিচলিত হয়ে যাও তুমি। তোমারই এই মমতা ও করুণা থেকেই তোমার পরমপিতা সর্বশক্তিমান ঈশ্বর মানবজাতির সঙ্গে স্বর্গলোকের সব বিবাদ-বিসম্বাদের অবসান ঘটিয়ে ফেলেন।
হে ঈশ্বর, পরমপিতা! তোমার পরেই যাঁর স্থান, তোমার পরেই যিনি ঐশ্বরিক সম্মানের অধিকারী তোমার সেই পুত্র পরম স্বর্গীয় সুখে জলাঞ্জলি দিয়ে শুধু মানবজাতির অপরাধ স্খলনের জন্য নিজে মৃত্যুবরণ করেছেন।
হে ঈশ্বরপুত্র, মানবজাতির পরিত্রাতা, তোমার দৃষ্টান্তবিহীন অতুলনীয় ঐশ্বরিক প্রেম শুধু তোমার মাঝেই মূর্ত, এ প্রেম অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। তোমার, নামই হবে আমার সঙ্গীতের একমাত্র বিষয়বস্তু। আজ হতে পরম ঈশ্বরের জয়গানের সঙ্গে সঙ্গে তোমার জয়গান গাইতে কখনই ভুলে যাবে না আমার বীণা।
এইভাবে নক্ষত্রখচিত আকাশমণ্ডলের উর্ধ্বে স্বর্গলোকে দেবতারাঈশ্বর ও ঈশ্বরপুত্রের স্তোত্ৰগান গেয়ে সুখে কালাতিপাত করছিলেন।
এমন সময় চির-আলোকিত স্বর্গলোকের তলদেশে অনন্ত রাত্রির সীমাহীন অন্ধকারে আচ্ছন্ন এক বিশাল জগতে অবতরণ করল শয়তান।নক্ষত্রহীন রাত্রির অন্তহীন অন্ধকারে আবৃত চির-উষ্ণ সে জগৎ সীমাহীন মহাদেশ বলে মনে হচ্ছিল। অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ুর দ্বারা সতত জর্জরিত সে মহাদেশ। সেই বিস্তৃত মহাদেশের একটিমাত্র অংশ স্বর্গের এক প্রাচীর বলে বিচ্ছুরিত স্বল্প আলোকরেখার দ্বারা আলোকিত। সে অংশে ঝড়ের প্রকোপ ছিল কিছু কম। সে অংশে শয়তান একাকী হাঁটতে লাগল।
হিমালয় পর্বতের পৃষ্ঠে অথবা গঙ্গা বা ঝিলামের নদীতটে চারণরত মেষ বা ছাগশিশুদের মাংস ভক্ষণ করার মত কোন মাংসলোভী কুনি যেমন সেই সব জায়গায় ইতস্তত পদচারণা করে তেমনি নিঃসঙ্গ শয়তান কোন জীবিত বা মৃত জীবনের আশায় সেখানে পদচারণা করতে লাগল। অন্য জাতীয় কোন না কোন জীবের দেখা পাবার আশা করছিল সে।
কিন্তু কোন জীবকেই দেখতে পেল না শয়তান। সেই উষর অন্ধকার প্রস্তরভূমি জুড়ে বিচরণ করে বেড়াচ্ছিল শুধু বিদেশী কতকগুলি মানুষের ছায়ামূর্তি। মর্ত্যজীবন যাপনকালে যে সব মানুষ শুধু ইহলোকে বা পরলোকে সুখের আশায় ও অক্ষয় যশের লোভে সব কাজ করে, আত্মস্বার্থসর্বশ্ব সেই সব মানুষের আত্মা মৃত্যুর পর স্বর্গ ও মর্ত্যলোকের মধ্যবর্তী এই স্থানে এসে অনুশোচনার তীব্র জ্বালায় দগ্ধ হতে থাকে প্রকৃতির যে সব কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে যায় পৃথিবীতে অথবা ব্যর্থ হয় কোন কারণে, সেই ব্যর্থ অসমাপ্ত কাজের জন্য এই অঞ্চলে এসে ঘোরাফেরা করতে থাকে।
যে সব সাধুপুরুষদের আত্মা মৃত্যুর পরও স্বর্গগমন করতে পারেননি সেই সব সাধুদের দেবদূত ও মানুষের মাঝামাঝি এক একটি পোশাক পরে ছায়ামূর্তি ধারণ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে।
প্রাচীনকালের ভাগ্যহত মানবসন্তানদের ও কুখ্যাত দানবদের আত্মারাও এখানে ঘুরে বেড়ায়। কত শত ব্যর্থ যুদ্ধবিগ্রহের পর মৃত্যুবরণ করে দানবদের আত্মারাও ছায়ামূর্তি ধরে আসে এখানে। বেবিলনের শূন্য উদ্যানের গর্বিত নির্মাতারাও মৃত্যুর পর এখানে আসে। আর আসে আত্মহত্যার দ্বারা যারা মৃত্যুবরণ করে সেই সব পাপী আত্মারা। গ্রীক দার্শনিক দেবোপম এম্পিডোকলস্ বৃহত্তর জীবনের অভিলাষে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি এটনাতে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন এবং ক্লিওমব্রোস প্লেটোর ফিড্রো পড়ে পরম স্বর্গীয় সুখ উপভোগ করার মানসে সমুদ্রে ঝাঁপ দেন। এইভাবে আত্মহত্যারূপ মহাপাপে নিমগ্ন হয়ে তাদের বিদেহী আত্মারা ছায়ামূর্তি ধরে স্বর্গলাভ হতে বঞ্চিত হয়ে এই ঊষর অন্ধকার দেশে ঘুরে বেড়াতে থাকে। এই দুটি আত্মার ছায়ামৃতি একা একা এল।
