সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর তখন বললেন, হে আমার পুত্র, আমার কোপানলে পতিত অধঃপতিত মানবজাতির মুক্তির জন্য তুমি আত্মোৎসর্গ করতে চেয়ে স্বর্গ ও মর্ত্যের মধ্যে সকল বিবাদ-বিসম্বাদ দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করলে। হে আমার আনন্দ আর আত্মপ্রসাদের মূর্ত প্রতীক, তুমি জান, আমার সকল সৃষ্টি কত প্রিয় আমার কাছে। মানুষ আমার শেষ সৃষ্টি হলেও সেও কম প্রিয় নয় আমার। সেই অধঃপতিত মানবজাতির উদ্ধারকল্পে আমি আমার বক্ষস্থল ও দক্ষিণ পার্শ্ব থেকে কিছুকালের জন্য দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমায়। একমাত্র তুমিই পার তাদের চূড়ান্ত পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে। এই মুক্তির মধ্য দিয়ে তাদের অন্ত:প্রকৃতি যেন তোমার অন্তঃকরণের সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে উঠতে পারে। তোমার মধ্য দিয়ে তারা যেন লাভ করতে পারে এক আশ্চর্য নবজন্ম।
মানবজাতির আদিপিতা আদমের বংশধর তারা। কিন্তু আদমের পাপের জন্যই পতন ঘটে তাদের। কিন্তু তোমার দ্বারা উদ্ধার লাভ করে আবার তারা নবজন্ম গ্রহণ করে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠবে তারা গৌরবের আসনে। তুমি ছাড়া তাদের এ মুক্তি এ নবজন্ম সম্ভব নয়। আদমের দোষে দোষী হয়ে ওঠে তার সকল সন্তান। তোমার মহত্ত্বের গুণে তারা পাপমুক্ত হয়ে সমস্ত অন্যায় ঝেড়ে ফেলে এক নবজীবনের সন্ধান পাবে তোমার মধ্যে। তুমি মানুষ হয়ে জন্মে মানুষের জন্যই মৃত্যুবরণ করবে এবং মৃত্যুর পর পুনরভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাদের সকলকে তুলে ধরবে। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তুমি আনবে সমগ্র মানবজাতির মুক্তি। স্বর্গীয় প্রেমের সুষমা নারকীয় ঘৃণাকে ধ্বংস করে জয়ী হবে।
যদিও তুমি স্বর্গ থেকে অবতরণ করে মর্তে গিয়ে মানবসন্তানরূপে জন্মগ্রহণ করবে, মানবপ্রকৃতি প্রাপ্ত হবে তথাপি তোমার দেবভাব ক্ষুণ্ণ হবে না কিছুমাত্র। কারণ তুমি ঈশ্বরপুত্র হিসাবে স্বর্গে মান-মর্যাদায় ঈশ্বরের সমতুল হয়ে ঐশ্বরিক সুযোগ-সুবিধা সবই ভোগ করেছ। কিন্তু সেই পরম স্বর্গীয় সুখ ত্যাগ করে একটা জগৎকে আসন্ন ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ঈশ্বরের পুত্র হিসাবে জন্মগত অধিকারের থেকে তোমার নিজের গুণের জোরে আরো অনেক বেশি অধিকার লাভ করেছ। তোমার সততা, উদারতা ও মহত্ত্বের জন্য তুমি বেশি যোগ্যতা অর্জন করেছ। তোমার মধ্যে গৌরবের থেকে প্রেমের পরিমাণ বেশি।
মর্তে গিয়ে মানবসন্তানরূপে যে অপমান যে লাঞ্ছনা তুমি পাবে সেই অপমান যেন তোমার প্রকৃতিকে খর্ব বা কলুষিত করতে না পারে। কারণ তুমি মনে রাখবে তুমি আজ ঈশ্বরের সমান মর্যাদায় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছ। ঈশ্বরের মতই পরম সুখ ও ঐশ্বর্য ভোগ করবে। তুমি সব কিছু ত্যাগ করে একটি জগৎকে চরম ধ্বংস হতে উদ্ধার করতে চলেছ। ঈশ্বরের পুত্র হিসাবে তোমার সহজাত গুণের বাইরেও তোমার অনেক গুণ আছে। যেহেতু তোমার অন্তঃকরণ গৌরববোধ থেকে প্রেমবোধের দ্বারা বেশি পরিপূর্ণ, তোমার চরিত্রে মহত্ত্বের থেকে সততা ও উদারতার প্রাধান্যই বেশি। সুতরাং যদি তুমি যে কোন অপমান পাও তাহলে সে অপমান এই সিংহাসনের উপর অধিষ্ঠিত তোমার মানবত্বকে সমুন্নত ও মহিমান্বিত করে তুলবে।
এখানে তুমি ঈশ্বরের মানবতারূপে অধিষ্ঠিত থেকে দেবতা ও মানবদের উপর রাজত্ব করবে। তুমি হবে একাধারে ঈশ্বরপুত্র ও মানবপুত্র। সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বররূপে অভিষিক্ত হবে তুমি। আমি তোমাকে সমস্ত ক্ষমতা দান করলাম। তুমি সেই ক্ষমতাবলে চিরকাল রাজত্ব করবে। স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালের যেখানে যত রাজা-রাজড়া আছে তাদের সমস্ত রাজক্ষমতা তোমার সার্বভৌম ক্ষমতার অধীনস্থ হয়ে থাকবে। তোমার ক্ষমতার কাছে খর্ব হয়ে থাকবে। এটাই আমার বিধান। তুমি যখন মহিমায় গৌরবোজ্জ্বল মূর্তিতে আকাশে আবির্ভূত হবে তখন স্বর্গ, মর্ত ও পাতালের সকলেই নতজানু হয়ে তোমার অকুণ্ঠ বশ্যতা স্বীকার করবে। তোমার অধীনস্থ দেবদুতেরা তোমার কঠোর আইনকানুনগুলি সর্বত্র ঘোষণা করে বেড়াবে। সেই সব আইনকানুন যুগপৎ সমানভাবে বলবৎ হবে জীবিত ও মৃতদের জগতে।
মৃতদের শেষ বিচারের ক্ষণটি বজ্রগর্জনে নির্ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অতীত সকল যুগের মৃতদের আত্মারা তাদের চিরনিদ্রা হতে উখিত হয়ে ছুটে আসবে তোমার কাছে। তুমি সাধু-সম্ভদের আত্মার সঙ্গে সম্মিলিত হয়ে সকলের পাপপুণ্যের চূড়ান্ত বিচার সকলকে কর্মানুরূপ ফল দান করবে। কর্মের দ্বারা তাদের মধ্যে কে সাধু কে শয়তান তা নির্ণয় করবে। সৎ ও সাধুদের স্বর্গে এবং পাপীদের নরকে প্রেরণ করবে। পাপীদের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে নরকদেশ। পাপীরা বিচারকালে ভয়ে সঙ্কুচিত হয়ে পড়বে তোমার সামনে।
ইতিমধ্যে পাপপূর্ণ পৃথিবী অগ্নিদগ্ধ হয়ে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। তখন তার সেই ভস্মতূপ থেকে এক নূতন বিশুদ্ধ স্বর্গ ও বিশুদ্ধ মতের উদ্ভব হবে যেখানে নিয়ত বিরাজ করবে শুধু সত্য আর ন্যায়পরায়ণতা। সকল সৎ সাধু ব্যক্তিরা তাদের সুদীর্ঘকালীন দুঃখকষ্টের অবসানে দেখতে পাবে এক নূতন স্বর্ণযুগের আগমন। পুণ্যাত্মক কর্মের সুবর্ণ ফলে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে পৃথিবী। অনাবিল আনন্দ, মহতী প্রেম আর সুন্দর সত্যের জয় প্রতিষ্ঠিত হবে সর্বত্র।
তখন আর তোমার রাজদণ্ডের প্রয়োজন হবে না। ঈশ্বরই হবে সর্বময় কর্তা। ঈশ্বরের ন্যায়রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবে স্বর্গ ও মর্ত্যলোকে। কিন্তু হে দেবতাবৃন্দ, তোমরা আমার পুত্রকে বরণ করে নাও। আমার এই পুত্র ন্যায় ও সত্যের জয় প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই মৃত্যুবরণ করবে। তোমরা আমার মতই তাকে সম্মান দান করো।
