বংশধর এবং তাদের পিতামাতাদের মধ্যে প্রত্যেক অল্প পার্থক্যের কারণটি যাই হোক–এবং একটি কারণ নিশ্চয় আছে আমাদের বিশ্বাস করার কারণ আছে যে এটি হচ্ছে উপকারী পার্থক্যদের স্থায়ী সঞ্চয় যা প্রত্যেক প্রজাতির স্বভাব সম্পর্কে দেহগঠনের সমস্ত ও আরও গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরসমূহের উদ্ভব ঘটিয়েছে।
০৬. তত্ত্বটির প্রতিবন্ধসমূহ
ষষ্ঠ অধ্যায় – তত্ত্বটির প্রতিবন্ধসমূহ
রূপান্তরের সঙ্গে তত্ত্বটির প্রতিবন্ধকসমূহ–সংক্রমণগত বা উত্তরণমূলক ভ্যারাইটিদের অনুপস্থিতি অথবা বিরলতা–জীবদের স্বভাবের সংক্রমণ বা উত্তরণ–একই প্রজাতির বিচিত্র স্বভাবসমূহ– সাদৃশ্যযুক্ত অন্য প্রজাতিদের তুলনায় কিছু প্রজাতির স্বভাবসমূহের ব্যাপক পার্থক্য–চরম উৎকর্ষতার অঙ্গ সমূহ–সংক্রমণের বা উত্তরণের প্রণালী–প্রতিবন্ধকের ঘটনাসমূহ–প্রকৃতি লক্ষ্য দেয় না–গৌণ গুরুত্বের অঙ্গসমূহ-অঙ্গসমূহ সর্বক্ষেত্রেই নিখুঁত নয়–টাইপের একত্বের ও প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের দ্বারা অবলম্বিত অস্তিত্বের পরিবেশের নিয়ম।
.
আমার গ্রন্থের এই অংশে পৌঁছাবার পূর্বে পাঠক নিশ্চয়ই অনেক প্রতিবন্ধকের সন্মুখীন হয়ে থাকবেন। এদের মধ্যে কয়েকটি এত গুরুতর যে এমনকি আজও খানিকটা বিমূঢ় না হয়ে এগুলির বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে পারি না আমি। তবে আমার মতে, এদের মধ্যে বেশিরভাগই হচ্ছে কেবল বাহ্যত প্রতীয়মান, এবং প্রকৃত প্রতিবন্ধকগুলি, আমার মতে, তত্ত্বটির পক্ষে মারাত্মক নয়।
এইসব প্রতিবন্ধক ও আপত্তিগুলিকে নিম্নলিখিত বিভাগ অনুসারে ভাগ করা যেতে পারে : প্রথমতঃ সূক্ষ্ম ক্রমবিন্যাসের মাধ্যমে প্রজাতিরা যদি অন্য প্রজাতিদের থেকে উদ্ভূত হয়ে থাকে, তাহলে কেন আমরা সর্বত্র অসংখ্য উত্তরণমূলক আকারদের দেখি না? প্রজাতির সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকা সত্ত্বেও, কেন সমগ্র প্রকৃতিতে বিশৃঙ্খলা নেই?
দ্বিতীয়তঃ, এটি কি সম্ভব যে, উদাহরণস্বরূপ, একটি বাদুড়ের দেহগঠন ও স্বভাব সম্বলিত কোন প্রাণী ব্যাপকভাবে পৃথক স্বভাব ও দেহগঠনবিশিষ্ট অন্য কোন প্রাণীর রূপান্তরের দ্বারা সৃষ্ট হয়েছে? আমরা কি বিশ্বাস করতে পারি যে প্রাকৃতিক নির্বাচন, একদিকে তুচ্ছ গুরুত্বের একটি অঙ্গ, যেমন একটি জিরাফের লেজ যা মাছি তাড়ানোর যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এবং অন্যদিকে চোখের মতো এত বিস্ময়কর অঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে?
তৃতীয়তঃ সহজাত প্রবৃত্তিগুলি কি প্রাকৃতিক নির্বাচন মারফৎ অর্জিত ও রূপান্তরিত হয়ে থাকতে পারে? সেই সহজাত প্রবৃত্তিগুলি সম্পর্কে আমরা কী বলব যা মৌমাছিদের কোষ তৈরি করতে প্ররোচিত করে এবং যা বিখ্যাত গণিতজ্ঞদের আবিষ্কারগুলির পূর্বাভাস দিয়েছে?
চতুর্থতঃ, আমরা কেমন করে ব্যাখ্যা করতে পারি যে সঙ্করণের পর প্রজাতি বন্ধ্যা হয় এবং বন্ধ্যা বংশধর উৎপাদন করে, অথচ ভ্যারাইটিরা সঙ্করিত হলে তাদের উর্বরতা অক্ষত থাকে?
প্রথম দুটি বিষয় এখানে আলোচিত হবে। অন্যান্য আপত্তিগুলি পরবর্তী অধ্যায়ে; সহজাত প্রবৃত্তি ও সঙ্করণ পরের দুটি অধ্যায়ে আলোচিত হবে।
সংক্রমণগত বা উত্তরণমূলক ভ্যারাইটিদের অনুপস্থিতি অথবা বিরলতা
কেবলমাত্র উপযোগী রূপান্তরসমূহের সংরক্ষণের মাধ্যমেই প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করে বলে প্রত্যেক নূতন আকার একটি পরিপূর্ণ দেশে তার স্থান গ্রহণ করার চেষ্টা করবে এবং অবশেষে, যাদের সঙ্গে তাকে সংগ্রাম করতে হয় তার এমন নিজস্ব কম উন্নত পিতামাতা আকার এবং অন্য কম আনুকূল্যপ্রাপ্ত আকারদের ধ্বংস করার চেষ্টা করবে। অতএব যদি আমরা এভাবে দেখি যে প্রত্যেক প্রজাতি অন্য কোন অজ্ঞাত আকার থেকে উদ্ভূত হয়েছে, তাহলে পিতামাতা এবং সমস্ত সংক্রমণগত বা উত্তরণগত ভ্যারাইটি উভয়েই নূতন আকারটির উৎপাদন ও নিখুঁত হওয়ার প্রক্রিয়ার দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে থাকবে।
কিন্তু যেহেতু এই তত্ত্ব অনুসারে অসংখ্য সংক্রমণগত বা উত্তরণগত মধ্যবর্তী আকার অবস্থান করে থাকতে পারত, তাহলে কেন আমরা পৃথিবীপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে এদের অসংখ্যকে দেখতে পাই না? ভূতাত্ত্বিক রেকর্ডের অসম্পূর্ণ বিষয়ক অধ্যায়ে এই প্রশ্নটি আলোচনা করতে আরও সুবিধা হবে; এখানে আমি শুধু বলব যে আমার মতে প্রশ্নটির উত্তর মূলতঃ নিহিত আছে এই তথ্যের মধ্যে যে সাধারণভাবে যা মনে করা হয় তার তুলনায় ভূতাত্ত্বিক রেকর্ড অনেক কম নিখুঁত। ভূত্বক হচ্ছে এক বিশাল যাদুঘর, কিন্তু প্রাকৃতিক সংগ্রহগুলি অসম্পূর্ণভাবে এবং দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সংগৃহীত হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন করা যেতে পারে যে যখন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি প্রজাতি একই অঞ্চলে বাস করে, তখন বর্তমানকালে সংক্রমণগত বা উত্তরণগত অনেক মধ্যবর্তী আকার আমাদের নিশ্চয় পাওয়া উচিত। একটি সরল ঘটনা আলোচনা করা যাক : একটি মহাদেশের উত্তর থেকে দক্ষিণে ভ্রমণ করার সময়, কিছু সময় অন্তর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত অথবা প্রতিনিধিত্বমূলক প্রজাতিদের সাধারণতঃ দেখতে পাব আমরা, যারা স্পষ্টত দেশটির প্রাকৃতিক মণ্ডলের প্রায় একই স্থানে বসবাস করে। এইসব প্রতিনিধিত্বমূলক প্রজাতিরা প্রায়শই মিলিত হয় এবং নিজেদের মধ্যে সংবদ্ধ হয়; এবং একটি বিরল থেকে বিরলতর হয় বলে অন্যটিকে আরও বেশি করে বারংবার দেখা যায়, এবং এটি চলতে থাকে যতক্ষণ না একটি অন্যটিকে স্থানচ্যুত করে। কিন্তু যদি এদের একত্রে মেশার জায়গায় এই প্রজাতিগুলিকে আমরা তুলনা করি, তাহলে দেখা যাবে এরা সাধারণত দেহগঠনের প্রত্যেক ক্ষুদ্র অংশেও পরস্পরের থেকে সেইরকম সম্পূর্ণ ভিন্ন হয় যে-রকম তাদের নিজস্ব দেশের নমুনাগুলি পরীক্ষা করলে দেখা যায়। আমার তত্ত্বানুসারে এইসব সম্বন্ধযুক্ত প্রজাতিরা একটি সাধারণ পিতামাতা থেকে উদ্ভূত হয়েছে; এবং রূপান্তর প্রক্রিয়া চলার সময় প্রত্যেকে তার নিজস্ব অঞ্চলের জীবন-পরিবেশে অভিযোজিত হয়েছে এবং তার আদিম পিতামাতা আকার ও তার অতীত এবং বর্তমানের মধ্যে সমস্ত সংক্রমণগত বা উত্তরণগত মধ্যবর্তী ভ্যারাইটিদের স্থানচ্যুত ও ধ্বংস করেছে। সে জন্য প্রত্যেক অঞ্চলে বর্তমানে অসংখ্য সংক্রমণগত বা উত্তরণগত মধ্যবর্তী ভ্যারাইটিদের সাক্ষাৎ পাওয়ার আশা করা আমাদের উচিত হবে না, যদিও এরা সেখানে অবস্থান করে এবং জীবাশ্ম অবস্থায় প্রোথিত হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু মধ্যবর্তী জীবন-পরিবেশ সম্বলিত মধ্যবর্তী অঞ্চলে, কেন এখন আমরা ঘনিষ্ঠভাবে সংযোগকারী ভ্যারাইটিদের দেখতে পাই না? এই অসুবিধাটি দীর্ঘদিন ধরে আমাকে বিমূঢ় করে রেখেছিল। কিন্তু আমি মনে করি বহুলাংশে এটির ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
