জলবায়ু, খাদ্য ইত্যাদির মতো পরিবর্তিত অবস্থাসমূহ একটি সুনির্দিষ্ট প্রণালীতে কতখানি কাজ করেছে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসা খুবই কষ্টকর। বিশ্বাস করার যুক্তি আছে যে স্পষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ দ্বারা প্রমাণ করার তুলনায় কালক্রমে ফলাফল বা। পরিমাণসমূহ বিরাটতর হয়েছে। কিন্তু আমরা নিশ্চিন্তে সিদ্ধান্ত করতে পারি যে সমগ্র প্রকৃতি জীবদের মধ্যে আমাদের দেখা দেহগঠনের অসংখ্য জটিল সহ-অভিযোজনের জন্য এই প্রক্রিয়াটিকেই দায়ী মনে করা যেতে পারে না। নিম্নে বর্ণিত ঘটনাসমূহে পরিবেশ বা অবস্থা সম্ভবত অল্প কিছু সুনির্দিষ্ট ফলাফল সৃষ্টি করেছে : ই, ফরবেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন যে আরও উত্তরে বা আরও গভীর জলে বসবাসকারী একই প্রজাতির খোলকী প্রাণীদের তুলনায় উত্তর সীমান্তে এবং অগভীর জলে বসবাসকারী খোলকী প্রাণীদের দেহের রং উজ্জ্বলতর হয়; কিন্তু এটি নিশ্চয়ই সব সময় ঘটে না। মিঃ গোল্ড মনে করেন সমুদ্রতীরে অথবা দ্বীপসমূহে বসবাসকারী পাখিদের তুলনায় পরিষ্কার আবহাওয়ায়। বসবাসকারী একই প্রজাতির পাখিরা আরও বেশি উজ্জ্বল রঙের হয়, এবং ওলাস্টন স্থিরনিশ্চিত যে সমুদ্রের নিকটে বাসস্থান পতঙ্গদের রংকে প্রভাবিত করে। মকুইন-ট্যান্ডন উদ্ভিদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছেন, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে সমুদ্রতীরে জন্মানো উদ্ভিদের পাতাগুলি কিছু মাত্রায় শাঁসালো, কিন্তু অন্যত্র শাঁসালো নয়। এইসব অল্পভাবে পরিবর্তনশীল জীবরা ততদূর পর্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক, যতদূর অনুরূপ পরিবেশে আবদ্ধ প্রজাতির বৈশিষ্ট্যদের অন্যরূপ বৈশিষ্ট্য উপস্থিত করে।
একটি পরিবৃত্তি যখন কোন জীবের পক্ষে অল্পতমভাবে উপযোগী হয়, তখন এটি প্রাকৃতিক নির্বাচনের সঞ্চয়ীকৃত প্রক্রিয়ার জন্য কতখানি এবং জীবন-পরিবেশের প্রত্যক্ষ প্রক্রিয়ার জন্য কতখানি দায়ী তা আমরা বলতে পারি না। পশম উৎপাদনকারীদের ভালভাবেই জানা আছে যে আরও উত্তরে বসবাসকারী একই প্রজাতির প্রাণীদের ঘন ও উৎকৃষ্ট পশম হয়। কিন্তু এই পার্থক্যের জন্য শুষ্কতম অঞ্চলের অধিবাসীদের বহু বংশপরম্পরা ধরে সংরক্ষিত ও আনুকূল্যপ্রাপ্ত হওয়া কতখানি দায়ী এবং খুব খারাপ আবহাওয়া কতখানি দায়ী, তা কে বলতে পারে? কারণ আমাদের গৃহপালিত চতুষ্পদ প্রাণীদের লোমের ওপর জলবায়ুর একটা প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে বলেই মনে হয়।
জীবনের বহিঃস্থ পরিবেশে একই প্রজাতি থেকে উদ্ভূত একই রূপের ভ্যারাইটিদের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, যেখানে ভিন্নতার বিষয়টি ভালভাবে অনুধাবন করা যায়। পক্ষান্তরে, আপাতঃ একই বহিঃস্থ পরিবেশে সৃষ্ট বিসদৃশ ভ্যারাইটিদের উদাহরণও দেওয়া যেতে পারে। আবার প্রত্যেক প্রকৃতিবিদের জানা অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে প্রজাতিরা সবচেয়ে বিপরীত ভিন্ন জলবায়ুতে বসবাস করলেও সঠিক থাকে বা মোটেই পরিবর্তিত হয় না। এইসব বিচার-বিশ্লেষণের পর পরিবর্তিত হওয়ার প্রবণতার তুলনায় পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রত্যক্ষ ক্রিয়ার ওপর কম গুরুত্ব আরোপ করতে প্রভাবিত হয়েছি আমি, কারণ এইসব কারণগুলি আমাদের অজানা।
পরোক্ষ অর্থে বলা যেতে পারে যে জীবন-পরিবেশগুলি হয় প্রত্যক্ষভাবে অথবা অপ্রত্যক্ষভাবে কেবলমাত্র বিভিন্নতাই ঘটায় না, বরং এভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনকেও অন্তর্ভুক্ত করে, কারণ জীবন-পরিবেশই এই বা ঐ প্রজাতিটি বাঁচবে কিনা তা নির্ধারণ করে। কিন্তু মানুষ নিজে যখন নির্বাচনী এজেন্ট, তখন আমরা স্পষ্টত দেখি যে পরিবর্তনের দুটি উপাদানই ভিন্ন; পরিবর্তনশীলতা বা বিভিন্নতা কোনো পরিস্থিতিতে সক্রিয় হয়, কিন্তু, এটাই মানুষের ইচ্ছা বা পরিবৃত্তিসমূহকে বিশেষ দিকে পুঞ্জীভূত করে, এবং এটাই হচ্ছে পরের মাধ্যম যা প্রকৃতিতে যোগ্যতমের উদ্বর্তনের প্রশ্নটির উত্তর প্রদান করে।
প্রাকৃতিক নির্বাচন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অঙ্গসমূহের বর্ধিত ব্যবহার ও অব্যবহারের পরিণামসমূহ
প্রথম অধ্যায়ে উল্লিখিত তথ্যসমূহ থেকে সন্দেহের কোন অবকাশ থাকে না যে। আমাদের গৃহপালিত প্রাণীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার কোন কোন অঙ্গকে শক্তিশালী ও বৃদ্ধি করেছে এবং অব্যবহার এদের হ্রাস করেছে এবং এইসব রূপান্তরসমূহ আনুবংশিক বা বংশগত হয়েছে। মুক্ত প্রকৃতিতে তুলনা করার জন্য আমাদের কোন মানদণ্ড নেই, যার দ্বারা অবিরাম ব্যবহার ও অব্যবহারের ফলাফলসমূহ বিচার-বিশ্লেষণ করা যায়, কারণ পিতামাতা আকারদের সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না; কিন্তু অনেক প্রাণী এমন সব দেহগঠনের অধিকারী যেগুলিকে অব্যবহারের ফলাফল হিসেবে ভালভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যেমন অধ্যাপক ওয়েন মন্তব্য করেছেন যে-কোন একটি পাখি উড়তে পারে না, এর থেকে বড় অংসগতি প্রকৃতিতে নেই; তথাপি কতিপয় পাখি এই অবস্থায় রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার মোটা মাথাওয়ালা পাতিহাঁসরা জলের উপরতলে কেবল ডানা ঝাঁপটাতে পারে, এবং গৃহপালিত আইলেসবুরি পাতিহাঁসের মতো এদের ডানাগুলি প্রায় একই অবস্থায় রয়েছে। এটি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা যে মিঃ কানিংহামের মতানুসারে তরুণ পাখিরা উড়তে পারে, কিন্তু বয়স্করা এই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। যেহেতু মাটিতে খাদ্যভক্ষণকারী বৃহৎ পাখিরা বিপদ থেকে আত্মরক্ষার সময় ছাড়া কদাচিৎ ওড়ে, সেহেতু এটি সম্ভবপর যে কতিপয় সামুদ্রিক দ্বীপে এখন বাস করে বা পূর্বে বাস করত এবং যেখানে শিকারী পাখিরা দখল নেয়নি এমন কতিপয় পাখির ডানাহীন অবস্থা অব্যবহারের ফলেই ঘটেছে। বাস্তবিকই উটপাখিরা মহাদেশসমূহে বসবাস করে এবং বিপদ থেকে আত্মরক্ষার জন্য উড়ে পালাতে পারে না, বরং অনেক চতুষ্পদ প্রাণীদের মতো দক্ষতার সঙ্গে শত্রুদের পদাঘাতের দ্বারা আত্মরক্ষা করতে পারে। আমরা বিশ্বাস করতে পারি যে, উটপাখি গণের পূর্বপুরুষদের স্বভাব বাস্টার্ড গণের পূর্বপুরুষদের মতো ছিল এবং বংশপরম্পরায় এদের শরীরের আয়তন ও ভর বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে এদের পাগুলি বেশি ও ডানাগুলি কম ব্যবহৃত হয়েছিল, এভাবে চলেছিল যতদিন পর্যন্ত না এরা উড়তে অসমর্থ হয়েছিল।
