মেফিস্টোফেলিস : ডানদিকের সেনাদল জোর যুদ্ধ করছে। কিন্তু তাদের সবার মাঝে বুল্লী একা দৈত্যের মতো লড়াই করে শত্রুসেনাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে।
সম্রাট : আচ্ছা আমি প্রথমে যেখানে দেখেছিলাম একটা হাত এখন সেখানে দেখছি এক ডজন হাত। এটা কেমন অস্বাভাবিক নয়?
ফাউস্ট : সিসিলির উপকূলে একধরনের বাষ্পরাশির কথা শুনেছেন? স্পষ্ট দিবালোকে দেখলে বাষ্পের মধ্য থেকে এক মূর্তির আবির্ভাব হয় যা শহরের সব বাড়ি বাগান ওলট-পালট করে দেয়।
সম্রাট : আমাদের পদাতিক দলের বর্শাগুলোর উপরে আমি একটা লোহার ফলক লাগানো বর্শাকে চকচক করতে দেখলাম। সঙ্গে দেখলাম সেই একটা বর্শা যেন। অনেকগুলো হয়ে উঠল।
ফাউস্ট : ক্ষমা করুন মহারাজ, ওগুলো হচ্ছে পোলাস ও ক্যাস্টরের উজ্জ্বল প্রেতাত্মা। বিপদাপন্ন নাবিকরা ওদের স্মরণ করে। ওরা এসেছে আপনাকে সাহায্য করতে।
সম্রাট : তাহলে বলো আমরা কার কাছে ঋণী। প্রকৃতিই কি ঐন্দ্রজালিক শক্তির সহায়তায় আমাদের পরিকল্পনাকে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে?
মেফিস্টোফেলিস : কার কাছে আবার? এক বৃদ্ধ রোমকের প্রেতাত্মাই নিজেকে বিপন্ন করে প্রবল শত্রুস্টৈদের ভয়ঙ্কর বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে আপনাকে।
সম্রাট : আমার অভিযানকালে যাজকরা আমাকে আশীর্বাদ করতে এসেছিল। কিন্তু আমি তাদের পানে তাকাইনি। আমার এই নবলব্ধ শক্তির উৎস কি তারাই?
ফাউস্ট : এবার তাকিয়ে দেখুন, শত্রুরা আর নেই। আমার মনে হয় সেই আত্মা এক সুলক্ষণ পাঠাবে।
সম্রাট : আকাশে একটা ঈগল ডিগবাজি খাচ্ছে। তারপর একটা গ্রিফিন পাখি আসছে।
ফাউস্ট : ভালো করে দেখুন। অনুকূল লক্ষণ মনে হচ্ছে। গ্রিফিন রূপকথার পাখি। সাহস করে এক ঈগলের সঙ্গে দ্বন্দ্বে নেমেছে।
সম্রাট : একবার একটা পাক খেয়ে ওরা পরস্পরকে আক্রমণ করল। মনে হচ্ছে ওদের ঘাড়-দেহ দীর্ণ-বিদীর্ণ হয়ে যাবে।
ফাউস্ট : দেখুন গ্রিফিনরা এবার শান্ত হলো। নিজে ক্ষতবিক্ষত হয়ে শত্রুকে জয় করল ও। তারপর সিংগের মতো ওর দেহটাকে নত করে অদৃশ্য হয়ে গেল কোথায়।
সম্রাট : এবার আমি লক্ষণটার অর্থ বুঝতে পেরেছি।
মেফিস্টোফেলিস : শত্রুসৈন্যরা বাঁদিক থেকে ডান দিকে সরে যাচ্ছে। সেখানেও প্রবল বাধা পাচ্ছে আমাদের সেনাদলের কাছ থেকে। এ যুদ্ধে আমরা একরকম জয়লাভ করে ফেলেছি।
সম্রাট : দেখো দেখো, আমাদের জয়ে সন্দেহ দেখা দিচ্ছে। নিয়তি যেন হঠাৎ মত পরিবর্তন করেছে। শত্রুরা যখন অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে এসে গিরিপথ দখল করে ফেলছে তখন তাদের উপর একটা ঢেলাও ছুঁড়ছে না। পরিশেষে আমাদের সব স্বপ্ন ব্যর্থ হলো। তোমার সব কৌশল মিথ্যা মায়ায় পর্যবসিত হলো।
মেফিস্টোফেলিস : দাঁড়কাকের মতো কুলক্ষণের আভাস পাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে আমাদের অবস্থা খারাপ।
সম্রাট : এই সব ভয়ঙ্কর পাখিগুলো কালো পাখা বিস্তার করে এখানে এসে বসল কেন?
ফাউস্ট : আপনি পায়রাদের ডাকবহনের কথা শুনেছেন। দূর-দূরান্ত থেকে তারা খবরাখবর আনত। কিন্তু শান্তির সময়ে সেটা সম্ভব হতো। যুদ্ধের সময় দাঁড়কাকের দৌত্য?
মেফিস্টোফেলিস : পাখিরা আমাদের বিপদের কথা ঘোষণা করছে। অদূরে শত্রুসৈন্যরা পর্বতপ্রাচীরের দিকে এগিয়ে আসছে। গিরিপথ একবার দখল করে নিলে আমাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠবে।
সম্রাট : আমার ভাগ্যে আছে পরাজয় আর প্রতারণা। তোমরাই আমাকে এই অবস্থার মধ্যে টেনে আনলে। তারা আমাকে শৃংখলিত করবে একথা ভাবলেও কম্পন আসছে আমার।
মেফিস্টোফেলিস : সাহস অবলম্বন করুন। এখনও জয়-পরাজয়ের পাশা চূড়ান্তভাবে পড়েনি। ধৈর্য ধারণ করুন। আমাকে সৈন্য পরিচালনা করার আদেশ দিন।
প্রধান সেনাপতি : আপনি যখন যেচে এদের নেতৃত্ব মেনে চলার আদেশ দিয়েছেন তখন থেকেই আমাদের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। বাহুর দ্বারা কোনও সৌভাগ্য লাভ করা যায় না। যুদ্ধে পরাজিত আমরা। যুদ্ধ ওরা শুরু করেছে, ওরাই শেষ করুক। আমার পদ আমি ত্যাগ করছি। এতে আমার আর করার কিছু নেই।
সম্রাট : কার্যভার ত্যাগ করো না এখন। সুদিনের অপেক্ষা করো। (মেফিস্টোফেলিসকে) তুমি এই কার্যভার গ্রহণ করো না। যদিও তুমি এ কাজের যোগ্য নও, তবু দেখো যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে আনতে পার কি না। যা হবার হোক।
(প্রধান সেনাপতিসহ সম্রাটের প্রস্থান)
মেফিস্টোফেলিস : আমাদের এ পক্ষে কোনও সুবিধা হবে না।
ফাউস্ট : এখন কি করতে হবে?
মেফিস্টোফেলিস : যা হবার হয়ে গেছে। এখন হে আমার দাঁড়কাক ভাইরা, তোমরা পাহাড়ে উড়ে যাও। সেখানে পার্বত্য হ্রদের ধারে বসে জলে নিজের দেহের ছায়া দেখে সত্য-মিথ্যার ব্যবধান বুঝতে দেখো। আসল থেকে নকলকে পৃথক করতে শেখো।
ফাউস্ট : আমাদের দাঁড়কাক বন্ধুরা পাহাড়ে গিয়ে দেখবে অসংখ্য জলপ্রপাত আর ঝর্না পাহাড়ের উপর থেকে গড়িয়ে পড়ছে।
মেফিস্টোফেলিস : এ দৃশ্য দেখতে ওরা অভ্যস্ত নয়। সবচেয়ে সাহসী পর্বতারোহণকারীরাও এতে ভয় পায়।
ফাউস্ট : জলস্রোতের পর জলস্রোত গড়িয়ে পড়ছে সুউচ্চ পাহাড় থেকে। তারপর সে জলস্রোত ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকের উপত্যকা ও মালভূমিতে। ফেনায়িত সেই পতনশীল ও প্রসারণশীল জলতরঙ্গের গতিরোধ করার সাধ্য আমাদের নেই।
মেফিস্টোফেলিস : আমি কিন্তু জলের দৃশ্যে কোনও ভয় পাই না; বরং আনন্দ পাই। ঐ দাঁড়কাকগুলো ঐ জলের উপর উড়ছে, স্নান করছে। (দাঁড়কাকগুলো ফিরে এলে) উপরকার মালিকের কাছে তোমাদের কাজের প্রশংসা করব। তোমরা এখন বাতাসে ভাসতে ভাসতে এক বামনের দেশে যাবে। সেখানে বামনরা হাঁপরে লোহা পিটছে মেরনে। সেখানে তাদের আগুন আছে। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকাতে পারে, কক্ষচট্যুত উল্কা পড়তে পারে। কিন্তু জানবে অরণ্যবৃক্ষের কঠিন শাখাপ্রশাখায় বিদ্যুৎ বা বজ্রের আগুন আটকে যায়। উল্কাও কোনও ক্ষতি করতে পারে না। অনুনয়ের কথা না শুনলে তাদের কড়া আদেশ দেবে। (দাঁড়কাকের প্রস্থান) এবার শত্রুদের উপর পড়ছে। রাত্রির কালো যবনিকা। তারা আর এগোতে পারছে না। মাঝে মাঝে হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে তাদের চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। তারা চিৎকার করছে ভয়ে।
