কোসালা ও মগধ পুরোনো প্রজাতন্ত্রেগুলোর চেয়ে ঢের দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছিল। পুরোনো রাজ্যগুলোয় লাগাতার অন্তর্দ্বন্দ্ব্ব ও গৃহবিবাদ লেগেই ছিল। আধুনিক এই রাজ্যগুলো আমলাতন্ত্র ও সেনাবাহিনীকে সুশৃঙ্খলিত করেছিল যারা সামগ্রিকভাবে গোত্রের কাছে নয়, কেবল রাজার প্রতিই আনুগত্য স্বীকার করত। এর মানে ছিল, প্রত্যেক রাজার নিজস্ব যুদ্ধ- মেশিন ছিল যেটা তাঁকে তাঁর রাজত্বে শৃঙ্খলা আরোপ ও আশপাশের এলাকা অধিকারের শক্তি যুগিয়েছে। আধুনিক এই রাজ্যগুলো নতুন বাণিজ্য পথগুলোও দক্ষতার সঙ্গে পাহারা দিতে সক্ষম ছিল। রাজ্যের অর্থনীতি যাদের ওপর নির্ভরশীল ছিল সেই বণিকদের খুশি করেছিল এটা।[৩১] অঞ্চলটি নতুন ধরনের স্থিতিশীলতা ভোগ করলেও সেজন্যে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। নতুন সমাজের সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতায় অনেকেই অস্বস্তিতে ভুগছিল, যেখানে রাজারা জনগণের উপর তাঁদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারতেন, অর্থনীতি পরিচালিত হতো প্রলোভনে; মহাজন ও বণিকরা পরস্পরের সঙ্গে আগ্রাসী প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকায় পরস্পরকে শিকারে পরিণত করত। প্রচলিত মূল্যবোধ যেন গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল, হারিয়ে যাচ্ছিল পরিচিত জীবন ধারা। সেই জায়গা দখল করে নেওয়া ব্যবস্থা ছিল ভীতিকর, অচেনা। জীবনকে অসংখ্য মানুষের কাছে বোঝা মনে হওয়াটা বিস্ময়কর ছিল না, সাধারণত ‘ভোগান্তি’ হিসাবে যার অনুবাদ করা হয়, তবে ‘অসন্তোষজনক’, ‘ত্রুটিপূর্ণ’ ও ‘কুটিল’ জাতীয় শব্দেই যার অর্থ বেশি বোঝানো যায়।
এমনি পরিবর্তনশীল সমাজে প্রাচীন আর্য-ধর্ম ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্ম ক্রমবর্ধমান হারে বেমানান হয়ে উঠছিল। প্রাচীন আচার প্রতিষ্ঠিত গ্রাম্য সমাজের উপযোগি ছিল, কিন্তু শহর-নগরের অধিকতর গতিশীল জগতে দুর্বহ ও সেকেলে মনে হতে শুরু করেছিল। অবিরাম চলার ওপর থাকায় বণিকেরা আগুন জ্বালিয়ে রাখতে পারত না, উপসোথা দিবসও পালন করতে পারত না। নতুন এই মানুষগুলো গোত্র প্রথায় ক্রমশঃ বেমানান হয়ে যাচ্ছিল বলে অনেকেরই তাদের একটা আধ্যাত্মিক শূন্যতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়েছে। পশুপালন অর্থনীতির চালিকা শক্তি থাকার সময় পশু-বলী তাৎপর্যবহ ছিল, কিন্তু নতুন রাজ্যগুলো কৃষিজাত পণ্যের উপর নির্ভরশীল ছিল। পশু হয়ে উঠছিল দুষ্প্রাপ্য, ফলে বলী অপচয় ও নিষ্ঠুর ঠেকেছে-বর্তমানে জনজীবনকে বৈশিষ্ট্যায়িত করে তোলা সহিংসতার চড়া স্মারক। নাগরিক সমাজগুলো যখন নিজেদের উপর নির্ভরশীল স্বনির্মিত মানুষের প্রভাবে ছিল সেই সময় মানুষ ক্রমবর্ধমানহারে ব্রাহ্মণদের প্রাধান্যের ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ও আধ্যাত্মিক নিয়তি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছে। তাছাড়া, পশু বলী কাজে আসেনি। ব্রাহ্মণরা যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে এইসব আচার অনুষ্ঠান (কম্ম ) মানুষের জন্যে ঐশ্বর্য ও বৈষয়িক সাফল্য এনে দেবে। কিন্তু প্রতিশ্রুত এইসব সুবিধা সাধারণত বাস্তবায়িত হতে পারেনি। নতুন অর্থনৈতিক পরিবেশে নগরবাসীরা সুবিধাজনক বিনিয়োগ বয়ে আনার মতো কাজে মনোনিবেশ করতে চেয়েছে।
বাজার অর্থনীতি প্রভাবিত আধুনিক রাজ্য ও শহরগুলো গাঙ্গেয় অঞ্চলের জাতিগুলোকে পরিবর্তনের হার সম্পর্কে দারুণ সজাগ করে তুলেছিল। নগরবাসীরা সমাজের দ্রুত বদলে যাওয়ার ব্যাপারটা বুঝতে পারছিল: এর অগ্রগতি পরিমাপ করতে পেরেছে তারা; বছরের পর বছর সবাই একই কাজ করে এমনি গ্রাম্য সমাজের পুনরাবৃত্তিমূলক ছন্দের চেয়ে একেবারে ভিন্ন একটা জীবন ধারার স্বাদ আস্বাদন করতে পারছিল তারা, যে সমাজ পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। শহরের মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করেছিল যে, তাদের কর্মকাণ্ডের (কম্ম) দীর্ঘমেয়াদী পরিণাম রয়েছে যা তারা নিজেরা হয়তো দেখতে পাবে না কিন্তু ঠিকই বুঝতে পেরেছিল যে আগামী বংশধরদের তা প্রভাবিত করবে। অতি সাম্প্রতিক কালে উদ্ভুত পুনর্জন্মের মতবাদ দারুণ প্রাচীন বৈদিক ধর্মের চেয়ে চলমান বিশ্বে অধিকতর জুৎসই ছিল। কম্মের তত্ত্ব বলে যে, নিয়তির জন্যে দায়ী করার মতো কেউ নেই, আমাদের কর্মকাণ্ডই সুদূরবর্তী ভবিষ্যতে অনুরণন তুলবে। একথা ঠিক যে কম্ম মানুষকে ক্লান্তিকর সামসারার চক্র থেকে মুক্তি দেবে না, তবে সৎকম্ম মূল্যবান প্রতিদান বয়ে আনবে কেননা তা পরের জীবনে আরও বেশি উপভোগ্য অস্তিত্ব নিশ্চিত করবে। কয়েক প্রজন্ম আগেও পুনর্জন্মের মতবাদ দারুণ বিতর্কিত ছিল, অল্প কিছু লোকের জানা ছিল তা। কিন্তু গৌতমের সময়ে মানুষ যখন একেবারে নতুনভাবে কাজ ও কারণের ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠেছিল, তখন সবাই তা বিশ্বাস করেছে-এমনকি খোদ ব্রাহ্মণরাও।[৩২]
কিন্তু অন্যান্য অ্যাক্সিয়াল দেশের মতো উত্তর ভারতের জনগণ অন্যান্য ধর্মীয় ধ্যানধারণা ও আচার-আচরণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিল যেগুলো তাদের পরিবর্তিত অবস্থায় বেশ প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। গৌতমের জন্মের অল্প আগে গাঙ্গেয় সমতলের পশ্চিম এলাকার একদল সন্ন্যাসী প্রাচীন বৈদিক ধর্ম বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গোপন বিপ্লব সংগঠিত করেছিলেন। তাঁরা এক ধারাবাহিক টেক্সট সৃষ্টি শুরু করেছিলেন যেগুলো গুরু থেকে শিষ্যের কাছে গোপনে হস্তাস্তরিত হতো। নতুন এই ধর্মগ্রন্থগুলোর নাম ছিল উপনিষদ, এ নামটি বিপ্লবাত্মক লোক-জ্ঞানের নিগূঢ় প্রকৃতির ওপর জোর দিয়েছে; কেননা তা সংস্কৃত উপ-নি-সাদ (নিকটে উপবেশন) হতে নেওয়া। উপনিষদগুলো বাহ্যত প্রাচীন বেদের উপর ভিত্তি করে রচিত হলেও সেগুলোকে পুনর্ব্যাখ্যা করে অধিকতর আধ্যাত্মিক ও অন্তর্গত তাৎপর্য দিয়েছে। এখানেই অ্যাক্সিয়াল যুগের অন্যতম প্রধান ধর্মমত বর্তমানে হিন্দুধর্ম নামে পরিচিত ধর্মের সূচনা স্থির হয়েছিল। সন্ন্যাসীদের আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের লক্ষ্য ছিল মহাবিশ্বের নৈর্ব্যক্তিক মূল সুর এবং অস্তিত্বমান সমস্ত কিছুর উৎস ব্রহ্মার পরম সত্তা। কিন্তু ব্রহ্মা স্রেফ একজন দূরবর্তী ও দুর্ভেয় সত্তা নন; সর্বব্যাপী সত্তাও যা জীবিত সমস্ত কিছুকে আবৃত করে আছে। আসলে উপনিষদীয় অনুশীলনের কল্যাণে একজন শিক্ষাব্রতী আপন সত্তার গভীরে ব্রহ্মার উপস্থিতি দেখতে পাবে। ব্রাহ্মণদের শিক্ষানুযায়ী পশুবলীতে মুক্তি নিহিত নয়, বরং এই উপলব্ধিতে যে দেবতাদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ পরম, চিরন্তম সত্তা ব্রহ্মা মানুষের গভীরতম সত্তার (আত্মা) অনুরূপ।[৩৩]
