সবশেষে, ব্রাহ্মণদের মতো গোপন সত্যিকে নিজেদের মাঝে আঁকড়ে রাখার বদলে অ্যাক্সিয়াল-সাধুগণ তা বাইরে প্রচার করতে চেয়েছেন।[২৬] ইসরায়েলের পয়গম্বরগণ সাধারণ মানুষের উদ্দেশে আবেগপ্রবণ হিতোপদেশ ও চমৎকার অঙ্গভঙ্গির সঙ্গে বক্তব্য রাখতেন। যার সঙ্গে দেখা হতো তাকেই প্রশ্ন করতেন সক্রেটিস। সমাজ পরিবর্তনের প্রয়াসে ব্যাপকভাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন কনফুসিয়াস। দরিদ্র, ক্ষুদ্র ও অভিজাতদের নির্দেশনা দিয়েছেন। এই সাধুরা তাঁদের তত্ত্বকে পরীক্ষা করতে ছিলেন বদ্ধপরিকর। ঐশীগ্রন্থ আর পুরোহিত সমাজের একচেটিয়া সম্পত্তি ছিল না বরং জনপদের কাছে নতুন ধর্মমত প্রচারের উপায়ে পরিণত হয়েছিল। গবেষণা ও বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছিল। যারা সত্য সন্ধানে সংগ্রাম করেছে তাদের কাছে সত্যকে বাস্তবতা প্রমাণ করার প্রয়োজন ছিল। আমরা দেখব, গৌতম কত নিবিড়ভাবে অ্যাক্সিয়াল যুগের মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন এবং কীভাবে মানবীয় টানাপোড়েন সহ্য করার জন্যে আপন অনন্যতা নিয়ে এসেছিলেন।
অবশ্য তিনি যখন কাপিলাবাস্তুর পিতৃগৃহ ত্যাগ করেন, ভারতে তখন অ্যাক্সিয়াল পরিবর্তনের পালা চলছিল। ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিতগণ উল্লেখ করেছেন যে, এই সমস্ত উদ্ভাবনমূলক আদর্শ রাজার এলাকায় সৃষ্টি হয়েছিল, বিসিই ষষ্ঠ শতকে যা নতুন ধরনের কেন্দ্রিকতা অর্জন করে।[২৭] রাজা ও মন্দিরের পুরোনো অংশীদারী হতে বণিকদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হচ্ছিল। এক নতুন ধরনের অর্থনীতি গড়ে তুলছিল তারা। তারা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে না পারলেও, এইসব সামাজিক পরিবর্তন নিশ্চিতভাবে আধ্যাত্মিক বিপ্লবে অবদান রেখেছে। বাজার অর্থনীতি স্থিতাবস্থাকে দুর্বল করেছে: বণিকরা আর অনুগতের মতো পুরোহিত ও অভিজাতদের মানতে পারছিল না। তাদের নিজের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, ব্যবসাক্ষেত্রে নিষ্ঠুর হবার জন্যে তৈরি থাকতে হয়েছে। এক নতুন নাগরিক শ্রেণী বিকাশ লাভ করছিল। নিজের হাতে ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল তারা। এরা ছিল শক্তিমান, সম্মুখবর্তী ও উচ্চাভিলাষী। নতুন উদীয়মান আধ্যাত্মিক রীতিনীতির সাথে স্পষ্টতই সঙ্গতিপূর্ণ। অন্যান্য অ্যাক্সিয়াল অঞ্চলের মতো উত্তর ভারতের গঙ্গা নদীর আশপাশের সমতল ভূমি গৌতমের জীবৎকালে এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। ষষ্ঠ শতাব্দী নাগাদ বহুদিন আগে আর্য আগ্রাসী বাহিনীর হাতে প্রতিষ্ঠিত আবশ্যিকভাবে গ্রাম্য সমাজ নতুন লৌহ-যুগের প্রযুক্তির কল্যাণে পরিবর্তিত হচ্ছিল, যা গভীর বন পরিষ্কার করে চাষাবাদের জন্যে নতুন জমিন বের করতে কৃষকদের সক্ষম করে তুলেছিল। বসতিকারীরা এই অঞ্চলে হাজির হওয়ায় তা ঘনবসতিপূর্ণ ও উচ্চ উৎপাদনশীল হয়ে ওঠে। পর্যটকগণ প্রচুর ফল, শস্য, তিল, জওায়ার, গম, সস্য আর বার্লির বর্ণনা দিয়েছেন, স্থানীয় জনগণের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফলন হতো এসব ফলে তারা বিনিময় করতে পারত।[২৮] গাঙ্গেয় সমতল ইন্দো-সভ্যতার কেন্দ্রে পরিণত হয়। গৌতমের জীবৎকালে মহাদেশের অন্যান্য এলাকা সম্পর্কে সামান্যই জানতে পারি আমরা। ছয়টি মহানগরী শিল্প ও বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়: সাবাস্তি, সাকেতা, কোসাম্বি, বারানসি, রাজাগহ ও চম্পা। নতুন বাণিজ্য পথের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল ওগুলো। নগরীগুলো ছিল উত্তেজনাকর জায়গা: সেগুলোর পথঘাট চমৎকাভাবে রঞ্জিত শকটে গিজগিজ করত, দূর-দূরান্ত থেকে পণ্য নিয়ে আসত সুবিশাল হাতির দল; ছিল জুয়া, থিয়েটার, নাচ, বেশ্যাবৃত্তি ও উচ্ছৃঙ্খল সরাইখানার জীবন। এসব আশপাশের গ্রামবাসীদের প্রবল আঘাত দিয়েছে। ভারতের সকল অংশের এবং সকল গোত্রের বণিকরা বাজারে জড়ো হতো; রাস্তাঘাটে নগর-কেন্দ্র, শহরতলীর বিলাসবহুল পার্কে নতুন দার্শনিক ধ্যানধারণা নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা চলত। শহরগুলো নতুন মানুষ–বণিক, ব্যবসায়ী ও মহাজনদের দখলে ছিল–যারা আর সহজে প্রাচীন গোত্র ব্যবস্থায় খাপ খাচ্ছিল না। তারা ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের চ্যালেঞ্জ করতে যাচ্ছিল।[২৯] এসব ছিল অস্বস্তিকর, আবার উদ্দীপকও। শহরবাসীরা পরিবর্তনের ধার অনুভব করতে পারছিল।
অঞ্চলের রাজনৈতিক জীবনও বদলে গিয়েছিল। গাঙ্গেয় উপত্যকা মূলত ছোট ছোট কিছু রাজ্য ও অল্প কয়টি তথাকথিত প্রজাতন্ত্রের অধীনে শাসিত হতো, যেগুলো আদতে ছিল প্রাচীন ক্ল্যান ও গোত্রীয় ব্যবস্থাভিত্তিক গোষ্ঠী শাসন। প্রজাতন্ত্রগুলোর সবচেয়ে উত্তরের শাক্যয় জন্ম গ্রহণ করেন গৌতম। তাঁর বাবা শুদ্ধোদনা ছিলেন শাক্যের গোত্র ও তাদের পরিবার পরিচালনাকারী অভিজাত গোষ্ঠী সংঘের সদস্য। শাক্যবাসীরা নিদারুণ অহংকারী ও স্বনির্ভর ছিল। তাদের এলাকা বেশ দূরবর্তী ছিল বলে আর্য সংস্কৃতি কখনওই সেখানে শেকড় বিস্তার করতে পারেনি। তাদের গোত্র প্রথাও ছিল না। কিন্তু সময় বদলে যাচ্ছিল। শাক্যের রাজধানী কাপিলাবাস্তু ছিল নতুন বাণিজ্য পথগুলোর একটার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য-কেন্দ্র। বাইরের জগৎ প্রজাতন্ত্রকে আক্রমণ শুরু করার ফলে ক্রমে মূলধারায় যোগ দিচ্ছিল।[৩০] মল্লা, কোলিয়া, বিদেহা, নয়া ও বাজ্জি প্রজাতন্ত্রগুলোর মতো শাক্য দুটি নতুন রাজ্য কোসালা ও মগধের কাছে আক্রান্ত বোধ করছিল। এদুটি রাজ্য গাঙ্গেয় সমতলের দুর্বলতর ও প্রাচীন-পন্থী রাজ্যগুলোকে আগ্রাসী ও নির্মমভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসছিল।
